শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষক সংকট নিরসন, দীর্ঘ পড়াশোনার সময়সূচি ও শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা দূর করার দাবিতে ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশজুড়ে ৭০০টির বেশি বিদ্যালয়ে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা। বিক্ষোভ দমাতে দাঙ্গা পুলিশ মাঠে নামলে রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার এক দিনেই ১,৭৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ। গত সপ্তাহে প্যারিস অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনটি মার্সেই, নঁত, রেন, স্ট্রাসবুর্গসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় আবর্জনার কন্টেইনারে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলে ভাঙচুর চালিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে। শুক্রবার প্রায় ৪০০টি হাই স্কুল বন্ধ ছিল এবং আরও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হয়।
দেশটির বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ বলেছেন, পরিস্থিতি এখন আর কেবল শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তার ভাষ্য, এটি জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দিকে গড়িয়েছে। তিনি জানান, ফ্রান্সের ৩ হাজার ৭০০টি হাই স্কুলের মধ্যে ৭৩৫টি কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
শুক্রবার রাতে ফরাসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক টিএফ১-কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনিয়েজ বলেন, "পরিস্থিতি দাঙ্গা ও সহিংসতার দিকে গড়াচ্ছে। এটি দমাতে আমরা সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।"
এদিকে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বহিরাগতরা যুক্ত হয়েছে। বিএফএমটিভিকে তিনি বলেন, "শিক্ষকরা আমাদের জানিয়েছেন তাদের সামনে যারা সহিংসতা চালাচ্ছে, তারা স্কুলের শিক্ষার্থী নয়।"
সহিংসতার একটি ঘটনা ঘটেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেলফোরে। সেখানে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে তাড়া করে মাটিতে ফেলে মারধরের পর হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফ্রান্সের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সহিংসতায় অন্তত ৬৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন।
প্যারিসের উপশহর পঁতাঁতে পুলিশের ওপর ঢিল ছোড়া হলে কাঁদুনে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে পুলিশ। বিভিন্ন বিক্ষোভস্থল থেকে পেট্রোল বোমা, কুড়াল ও শক্তিশালী পটকা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
নঁত শহরের নেলসন ম্যান্ডেলা হাই স্কুলে আগুনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। এদিকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্কুলে আগুন দেওয়া, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অন্যান্য সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে।
তবে পুলিশের ধরপাকড়ের মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৬ বছর বয়সী লোলা একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে বলেন, "আমাদের দিক থেকে আমরা জিতেছি। আজ সকালে আমাদের স্কুল বন্ধ।"
পুলিশের ভূমিকা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও দাবি করেন তিনি। লোলা বলেন, "আমাদের পেটানোর, আমাদের ওপর কাঁদুনে গ্যাস ছোড়ার কোনো অধিকার পুলিশের নেই। এটা ক্ষোভ আরও উসকে দিয়েছে।"
প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে শিক্ষা খাতে মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হারে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনাও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের অন্যতম প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খসড়া বাজেটে শিক্ষক পেনশন বাদে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১.৭% বাড়িয়ে ৬৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ইউরো করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এদিকে সংঘাতের তীব্রতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবকেরা। বিচারমন্ত্রী দারমানাঁ বলেছেন, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ঘটানো ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের সভা-সমাবেশের অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শ্রমিক ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর একটি অংশ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে। কয়েকটি ট্রেড ইউনিয়ন শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে কর্মসূচি দিয়েছে এবং পুলিশি পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।



