Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সোলায়মানি: সাধারণ কিশোর থেকে প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা

সোলায়মানি ইরানের প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন 

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ০৪:৫৪ পিএম

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানি। শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ভোররাতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়।

সোলায়মানির বেড়ে ওঠা

ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতা সোলায়মানির জন্ম ১৯৫৭ সালে ইরানের পূর্ব অঞ্চলের রাবোর শহরে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাকে পার্শ্ববর্তী একটি শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে শিশু বয়সেই তাকে বাবার ঋণের অর্থ পরিশোধের জন্য কাজ করতে হয়েছে। সেসময় ইরানে ক্ষমতায় ছিল শাহ রাজতন্ত্র। ১৯৭৯ সালে আয়াতোল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ সরকারের পতন হয়। এরপরপরই তিনি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীতে যোগ দেন। খোমেনির ঘোষিত ইসলাম প্রজাতন্ত্রে নতুন কোনো অভ্যুত্থান ঠেকাতে সে সময় বাহিনীটি গঠন করা হয়।    

আইআরজিসি'তে যোগদানের দুই বছরের মধ্যে তাকে ইরাক-ইরান যুদ্ধে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি নিজের কৃতিত্বের পরিচয় রাখেন। একারণে তাকে একটি ব্রিগেডের প্রধান করা হয়েছিল। এসময় তিনি আরও এক দিক দিয়ে লাভবান হয়। সেটি হলো-যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন বিদেশি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয়। এরপর থেকেই বাহিনিটিতে তার প্রভাব বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে আইআরজিসি'র প্রধান হন তিনি। 

ইরানের প্রভাবশালী এই জেনারেলের পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তার নিয়ন্ত্রিত আইআরজিসি বা "কুদস্‌ ফোর্স"এর কর্মকাণ্ড ইরান ছাড়াও দেশটির বাইরে বিস্তৃত ছিল। মূলত বাহিনীটির কাজ ছিল দেশের বাইরেও ইরানের প্রভাব বিস্তার করা, আর গত দুই দশকে এবিষয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন বলে জানা যায়। 


আরও পড়ুন-খোমেনি: ‘কঠোর প্রতিশোধ’ অপেক্ষা করছে


মধ্যপ্রাচ্যে সোলায়মানির প্রভাব

২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক অভিযান ও ২০১১ সালে সিরিয়ায় বিপ্লবের মধ্যদিয়ে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে আরও শক্তিশালী করার সুযোগ দেখেন কাসেম সোলায়মানি। এসময়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান বিশৃঙ্খলার ওপর ভর করে এ অঞ্চলের দেশগুলোতে ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী ও বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা চালান তিনি। 

ইরানের বাইরে-লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হেজবুল্লাহের শক্তি বৃদ্ধি, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে ইরানের সিদ্ধান্ত, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে ইয়েমের হুথিদের সমর্থন, ইরাকে শিয়া বিদ্রোহীদের উত্থান-এসব ঘটনার পেছনে হাত রয়েছে কুদস ফোর্সের, যে বাহিনীটির প্রধান ছিলেন সোলায়মানি। 

ধারণা করা হয়, ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশ-যারা  ইরানের স্বার্থের বিপরীতে যায় সেখানে ছদ্মযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে সোলায়মানির কুদস্‌ ফোর্স। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব তেলক্ষেত্রে গুপ্ত হামলা এমন যুদ্ধের অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।

নিউইয়র্কভিত্তিক থিংক ট্যাংক সেঞ্চুরি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা দিনা এসফ্যানদিয়ারের মতে, সোলায়মানি ইরানের প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। তিনি সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে ছিলেন। দেশে, বিদেশে, সরকার এবং সরকারের বাইরে তার ফোর্সের লোক ছিলো। 

ইরাকে সোলায়মানির প্রভাব ছিলো ব্যাপক। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের পতনের সময় সোলাইমানি কুদস্‌ ফোর্সের প্রধান ছিলেন। এ সময় তিনি ইরাকের বিভিন্ন শিয়া বিদ্রোহী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতা করেন বলে অভিযোগ আছে। এই গোষ্ঠীগুলো ইরাকের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ এবং ইরাকের সেনাদের হত্যা করে। সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সোলাইমানি মার্কিন বাহিনীকে যুদ্ধে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেন। তবে পরে তার অনেক কাজ মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের চক্ষুশূল হন তিনি। 


আরও পড়ুন-ট্রাম্পের নির্দেশেই জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যা


মধ্যপ্রাচ্যে সোলায়মানির কুদস্‌ ফোর্স কতোটা ক্ষমতাধর ছিল তা জানা যায় ২০০৭ সালে মার্কিন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাইয়াসকে তার পাঠানো এক বার্তায়। সেখানে তিনি লেখেন, "আপনার জানা উচিৎ যে আমি, কাশেম সোলায়মানি ইরানের নীতি নির্ধারণ করি। একই সঙ্গে ইরাক, লেবানন, গাজা এবং আফগানিস্থানের নীতিগুলোও আমিই নির্ধারণ করি। ইরাকের বাগদাদে বর্তমান দূত একজন কুদস্‌ ফোর্স সদস্য এবং আগামীতেও তার জায়গা যিনি নেবেন তিনিও একজন কুদস্‌ ফোর্স সদস্য হবেন।"   

২০০৮ সালে ওই মার্কিন কমান্ডার সোলায়মানিকে আবার "শয়তানি চরিত্র" বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া ইসরায়েলও সরাসরি তাকে প্রধান হুমকি হিসেবেই দেখতো। 

সম্প্রতি সামনে আসা বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ইরাকে জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে যুদ্ধে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন সোলায়মানি। দেশটিতে অবস্থান করা কুদস্‌ ফোর্স সদস্যরা এতোটাই ক্ষমতাধর যে, ইরাকের তৎকালীন এক পরিবহন মন্ত্রীর ওপর চাপ প্রয়োগ করে দেশটির আকাশসীমা দিয়ে সিরিয়ার জন্য অস্ত্রবাহী ইরানি বিমান চলাচলের অনুমতি নেয়। ইরাকের বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গেও সোলায়মানি সময় কাটাতেন বলে জানা গেছে। এমনকি তাকে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবেও মনে করতেন ইরানের বাসিন্দারা। 

ইরানের প্রতিক্রিয়া

মেজর জেনারেল কাসেম সোলায়মানির নিহত হওয়ার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা বলেন, বিশ্বের কুচক্রী ও শয়তানি শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে বহুবছর ধরে একনিষ্ঠ ও বীরোচিত জিহাদ চালিয়ে গেছেন জেনারেল সোলায়মানি। তিনি দীর্ঘদিন ধরে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করার যে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন শেষ পর্যন্ত সেই উচ্চ মর্যাদায় তিনি অধিষ্টিত হয়েছেন; তবে তার রক্ত ঝরেছে মানবতার সবচেয়ে বড় দুশমন ও সবচেয়ে জালিম শাসক আমেরিকার হাতে। তবে সোলায়মানির চলে যাওয়ায় তার রেখে যাওয়া পথ বন্ধ হবে না।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ সোলায়মানি নিহত হওয়ার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই হত্যাকাণ্ডকে “মারাত্মক বিপজ্জনক” ও “বোকামি” বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমেরিকার ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হঠকারী হামলার যেকোনো পরিণতির দায় ওয়াশিংটনকে বহন করতে হবে। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এখন যে সিদ্ধান্ত নেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।


আরও পড়ুন-মার্কিন হামলায় ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি নিহত


সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান






About

Popular Links