Friday, May 24, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সোলায়মানি হত্যা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে?

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সোলায়মানি হত্যা, শতাধিক বছর আগে ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ড খুনের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচন-সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ১০:২৮ পিএম

ইরাকে মার্কিন হামলায় শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) ইরানি জেনারেল কাসেম সোলায়মানি নিহত হয়েছেন। তাকে বলা হতো ইরানের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বে ক্ষমতাযুদ্ধে ইরানকে অনেকটা সামনের দিকে নিয়ে যান সোলায়মানি। ফলে তার মৃত্যুতে ইরানের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। আর সামরিক এই নেতার হত্যাকাণ্ডের কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি করেছে ইরান।  

সোলায়মানির মৃত্যুতে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অবস্থা আরও বিশৃঙ্খল হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে। 

এদিকে সোলায়মানির মৃত্যুর পর উঠে এসেছে শতাধিক বছরের পুরোনো আরেকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। আজ থেকে ১০৫ বছর আগে ১৯১৪ সালের জুন মাসে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ডকে হত্যার জের ধরে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।  সোলায়মানি হত্যা একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে-এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। 

কে এই সোলায়মানি 

ইরানে ১৯৭৯ সালে আয়াতোল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ রাজতন্ত্রের পতনের পরপরই কাসেম সোলায়মানি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস বাহিনীতে (আইআরজিসি) যোগ দেন।খোমেনির ঘোষিত ইসলাম প্রজাতন্ত্রে নতুন কোনো অভ্যুত্থান ঠেকাতে সে সময় বাহিনীটি গঠন করা হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে নিজের দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে আইআরজিসির প্রধান হন তিনি।

সোলায়মানি ইরানের প্রেসিডেন্টের চেয়েও ক্ষমতাধর ছিলেন। তিনি সরাসরি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে ছিলেন। এমনকি তাকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট হিসেবেও ধারণা করতেন ইরানের নাগরিকরা।

ইরানের প্রভাবশালী এই জেনারেলের পরিচিতি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। তার নিয়ন্ত্রিত আইআরজিসি বা "কুদস্‌ ফোর্স"এর কর্মকাণ্ড ইরান ছাড়াও দেশটির বাইরে বিস্তৃত ছিল। মূলত বাহিনীটির কাজ ছিল দেশের বাইরেও ইরানের প্রভাব বিস্তার করা, আর গত দুই দশকে এ বিষয়ে তিনি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন।

ইরানের বাইরে-লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী হেজবুল্লাহের শক্তি বৃদ্ধি, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের সময় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতায় ধরে রাখতে ইরানের সিদ্ধান্ত, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়তে ইয়েমের হুথিদের সমর্থন, ইরাকে শিয়া বিদ্রোহীদের উত্থান-এসব ঘটনার পেছনে হাত রয়েছে কুদস ফোর্সের, যে বাহিনীটির প্রধান ছিলেন সোলায়মানি।

তবে যুক্তরাষ্ট্র সোলায়মানি ও তার কুদস্‌ ফোর্সকে "সন্ত্রাসী" হিসেবে দেখতো। মধ্যপ্রাচ্যে শত শত মার্কিন সেনাসদস্যের মৃত্যুর জন্য তাকেই দায়ী করে আসছে দেশটি। কাসেম সোলায়মানি। এএফপি

ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ড হত্যা 

১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার সারাজেভো'তে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ডকে তার স্ত্রীসহ হত্যা করা হয়। তিনি অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকারী ছিলেন। 

বসনিয়া আর্চডিউক দখল করে নিতে পারেন এই আশঙ্কা থেকে দেশটির ১৯ বছর বয়সী এক তরুণ তাকে হত্যা করেন। এ ঘটনার জের ধরে তৎকালীন ক্ষমতাধর দেশগুলো দুটি পক্ষে ভাগ হয়ে যায়। আর এরই এক পর্যায়ে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। 

শতাধিক বছর আগের ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও সোলায়মানি হত্যাকে মেলাচ্ছেন অনেকে।    

১৯১৪ সালের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার আগের দিনে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ড। এএফপি

আলোচনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই শুক্রবার জেনারেল সোলায়মানিকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। হত্যাকাণ্ডের ঘটনা গণমাধ্যমগুলোতে আসার পর টুইটারে মার্কিন পতাকার একটি ছবিও প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। 

এমন একটি অভিযানের পর ট্রাম্প টুইট করবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের পুরোনো কয়েকটি টুইট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। 

২০১২ সালের যুক্তরাষ্ট্রের ৫৭তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে জয়লাভ করে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বারাক ওবামা।   

নির্বাচনের আগের বছর ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর একটি টুইট করেন ট্রাম্প। ওই টুইটে তিনি লেখেন, "নির্বাচিত হওয়ার জন্য বারাক ওবামা ইরান আক্রমণ করবেন।" যার অর্থ, ওই সময়ে নির্বাচনে জেতার জন্য ইরান আক্রমণকে একটি কৌশল হিসেবে দেখেছেন ট্রাম্প। যদিও তেমন কোনো আক্রমণ চালানো হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে।

গত ২০১৬ সালে ৫৮তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিতে হোয়াইট হাউসে ঠিকানা গড়েন ট্রাম্প। চলতি বছরেই মেয়াদ শেষ হচ্ছে তার। দেশটিতে পরবর্তী নির্বাচনের দিন ঠিক করা হয়েছে এ বছরে ৩ নভেম্বর। তাই নির্বাচনের বছরে ইরানের বিরুদ্ধে এমন হামলাকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ  বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে সোলায়মান হত্যাকাণ্ডের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানই উস্কানি দিয়েছে বলে মনে করছেন বিবিসি'র সংবাদদাতা ফ্রাঙ্ক গার্ডনার। তার মতে, কয়েকদিন আগে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা চালায় বিক্ষোভকারীরা। ইরানের মদদেই ওই বিক্ষোভকারীদের ইন্ধন দিয়েছিলেন ইরাকের কয়েকটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতারা। মার্কিন মেরিন সেনারা সেদিনের বিক্ষোভ দমন না করতে পারলে তারা দূতাবাস দখল করে নিতো-এমন ঝুঁকি ছিলো।এটি আজকের হামলার কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছেন ফ্রাঙ্ক।  

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের শঙ্কা? 

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে সোলায়মানি হত্যা, শতাধিক বছর আগে ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্ড খুনের মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচন-সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে এমন আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। 

এবিষয়ে বিবিসি'র ফ্রাঙ্ক বলেন, ইরান অবশ্যই প্রতিশোধ নেবে। এর মধ্যেই তারা এমন হুঁশিয়ারিও দিয়েছে। সঠিক সময় আসলে তারা এটা করবেই। 

এই সাংবাদিক আরও বলেন, এখন পরিস্থিতি বেশ উত্তেজনাকর। ইরান তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে। শোক পালনে প্রচুর মানুষের জমায়েত হবে। সেখানে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস কামনা করে স্লোগান দেবে। হয়তো এই কামনা থেকে যুক্তরাজ্যও বাদ পড়বে না। 

তাহলে প্রশ্ন জাগে, প্রতিশোধটা কীভাবে আসবে? ইরান কি সরাসরি পশ্চিমাদের ওপরেই আক্রমণ করবে? নাকি ইরাকে অবস্থিত পশ্চিমাদের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার মধ্য দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে? ফ্রাঙ্ক বিশ্বাস করেন, প্রতিশোধের ক্ষেত্রে হয়তো দ্বিতীয় পন্থাটিই বেছে নেবে ইরান।  

তিনি বলেন, "ইরানের কাছে গাড়ি বোমার প্রযুক্তি রয়েছে। এছাড়া ড্রোন প্রযুক্তিও তারা আয়ত্তে এনেছে। আমি মনে করি, ইরান যদি এই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের হত্যা করা শুরু করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সামনে তা একটি বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ফলশ্রুতিতে, তিনি পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করতে পারেন।"  

সূত্র: বিবিসি, তেহরান টাইমস

About

Popular Links