পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার ঘোষণার পর আবারও ইরানের সাইবার হামলা শুরুর আশঙ্কা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ তাদের মিত্ররা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরকার ও বেসরকারি খাতে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
ট্রাম্পের ওই ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইরানের সাইবার কর্মকাণ্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিরাপত্তা সংস্থা ক্রাউডস্ট্রাইকের গবেষকরা। ইরানের হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের কূটনীতিক, টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানির কর্মীদের কাছে ভাইরাসবাহী ই-মেইল পাঠাচ্ছে। এর মাধ্যমে তাদের কম্পিউটার ব্যবস্থায় ঢুকতে চাচ্ছে হ্যাকাররা।
নিরাপত্তা গবেষকরা দেখেছেন, গত দুই মাস ধরে ইরানি হ্যাকাররা ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ইন্টারনেট অ্যাড্রেস খোঁজার চেষ্টা করছে। মূলত তারা গোয়েন্দা তথ্য যোগাড় করার জন্য এই কাজ করে থাকে। গবেষকরা প্রকাশ্যে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলছেন না কারণ তারা এখন সতর্কতা অবলম্বর করছেন।
কয়েক বছর আগেও ইরানি হ্যাকারদের অনেক সাইবার হামলার ঘটনা ছিল। কিন্তু পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে তারা পশ্চিমা বিশ্বে তেমন কোনও তৎপরতা চালায়নি। এরপর থেকে তারা মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিবেশিদের লক্ষ্য করেই কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন স্থানে ইরানি হ্যাকারদের আক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছিল।
২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ জোরদার করার পর এমন চালানো হয়। ওই সময় ইরানের রাষ্ট্র প্রতিপালিত হ্যাকাররা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় সবগুলো বড় ব্যাংকের ওয়েবসাইট হ্যাক করে। ওই হামলার সময় লাখ লাখ গ্রাহক তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ডে ঢুকতে পারেননি। ওই হামলায় ৪৬ ব্যাংক আক্রান্ত হয়েছিল। ২০১৬ সালে ঘটনা বিস্তারিত প্রতিবেদনে সরাসরি ইরানি হ্যাকারদের দায়ী করা হয়।
২০১৪ সালে ইরানি হ্যাকাররা লাস ভেগাস স্যান্ডস কর্পোরেশনে সাইবার হামলা চালায়। ওই সময় তারা ওয়েবসাইট থেকে সব তথ্য মুছে দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মালিক সেলডন অ্যাদেলসন ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ছবি রেখে দিয়েছিল। তবে পরমাণু চুক্তির পরে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের সাইবার হামলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিপক্ষদের ওপর মাঝে মাঝেই হামলা চালানো অব্যাহত রাখে দেশটি।
সাইবার নিরপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলা চালাতে পারে ইরান। আর সম্প্রতি সিরিয়ায় ইরানি সেনাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর এই আশঙ্কা আরও তীব্র হয়েছে।
ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক ও ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা জেমস লেবিস বলেন, ‘আজ পর্যন্ত ইরান বাধ্যগত ছিল’। তিনি আরও বলেন, ‘চুক্তিটি ভঙ্গ করার বৈধতা দেওয়ার সুযোগ না দিতে দেওয়ার জন্য তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত ছিল। চুক্তি বাতিল হওয়ার পর তারা অবধারিতভাবে প্রশ্ন তুলবে, তাদের হারানোর কী আছে?’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বেশ কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তাও লেবিসের সতর্কতার পুনরাবৃত্তি করেছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক পরিচালক জেনারেল কেইথ আলেক্সান্ডার বলেন, পরমাণু চুক্তি ভেস্তে যাওয়ায় আমাদের জাতি ও মিত্রদের আগে দেখা কর্মকাণ্ডের জন্য আবারও প্রস্তুত হওয়া উচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সাবেক জেনারের কাউন্সেল ম্যাট ওলসেন বলেন, ইরান বিশ্লেষকদের ধারণার চেয়ে দ্রুতগতিতে এই খেলা চালু করছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিপক্ষদের মধ্যে ইরান এখন সবচেয়ে বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন জাতিরাষ্ট্র। আমরা অনুমান করতে পারি, তাদের এই সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। সূত্র: দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড।
মতামত দিন