• বুধবার, জুলাই ১৭, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩৬ রাত

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় ক্রাইস্টচার্চের বিভীষিকা

  • প্রকাশিত ০৮:২৫ রাত মার্চ ১৫, ২০১৯
ক্রাইস্টচার্চে বন্দুক হামলা
বন্দুক হামলার পর আল নূর মসজিদের সামনে নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তকর্মীদের অবস্থান। ছবি: এএফপি (ফাইল ছবি)

'আজ যা দেখেছি তাতে আমার নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা'

শুক্রবার ক্রাইস্টচার্চের নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৯ জনে পৌঁছেছে। সেন্ট্রাল ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে প্রার্থনারত মুসলিমদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন কালো পোশাক পরিহিত এক বন্দুকধারী।

বিবিসি জানায়, গুলির শব্দ শুনে নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে ছুটতে শুরু করেন মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সাধারণ মানুষ।

হামলার সময় মসজিদে প্রার্থনারত ছিলেন বাংলাদেশি প্রবাসী মোহন ইব্রাহীম। হামলার সময় তিনি বড় মসজিদে থাকায় পালিয়ে আসতে সক্ষম হন।

তিনি বিবিসিকে বলেন, "আমার পরিচিত অনেকে, যাদের সাথে মসজিদে নামাজ পড়তে আসলেই দেখা হত।  তারা এখন আর নেই। এটা আমি মেনে নিতে পারছিনা কোনভাবেই"।

"আজ যা দেখেছি তাতে আমার নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা। আমি এই দেশে এমন ঘটনা কখনও আশা করিনি। আমি এই দেশে ৫ বছর ধরে আছি। এতদিন নিউজিল্যান্ডকে পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ দেশ হিসেবে উল্লেখ করা হত। তবে, এই ঘটনার পর আমি সত্যিই আতঙ্কিত। আমার চোখের সামনে এমন ঘটনা ঘটবে তা আমি কখনও কল্পনাও করিনি", যোগ করেন মোহন ইব্রাহীম।

হামলা থেকে কোনওক্রমে বেঁচে যাওয়া নাম না জানা এক ব্যক্তি মসজিদ থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি হাম্লাক্রীকে সরাসরি এক ব্যক্তির বুকে গুলি করতে দেখেছেন। গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময়ও ওই ব্যক্তির জামায় রক্ত লেগে ছিল।

তিনি নিউজিল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম টিভিএনজেডকে বলেন, "প্রায় ২০ মিনিট ধরে গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসী। ওই সময় আমি শুধু অপেক্ষা করেছি এবং আল্লাহ'র কাছে প্রার্থনা করেছি যেন হামলাকারীর গুলি শেষ হয়ে যা্চের। 

ক্রাইস্টচার্চের বন্দুক হামলায় হতাহতদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডকে কিভাবে হামলা থেকে রক্ষা পেয়েছেন তার বর্ণনা দিয়েছেন হামলার সময় মসজিদে অবস্থানকারী নূর হামজা (৫৪)।

তিনি বলেন, "গোলাগুলি শুরু হবার পর আমি এবং আশপাশের অন্য সবাই দৌড়ে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসি। মসজিদ থেকে বেরিয়ে আমরা ডিনস এভিনিউ মসজিদের পিছন দিকের পার্কিংয়ে রাখা গাড়িগুলোর পেছনে লুকিয়ে পড়ি"।

"এরপর অভিযান চালিয়ে মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নেয় পুলিশ। এরপর মসজিদের দিকে এগিয়ে গেলে মসজিদের প্রধান ফটকেই আমি বেশ কয়েকটি লাশ পড়ে থাকতে দেখি। মসজিদের জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখি 'লাশের স্তূপ' পড়ে আছে। নিউজিল্যান্ডের জন্য এটি একটি বড় বিপর্যয়ের। এটি এদেশের ইতিহাসের একটি কালো দিন", যোগ করেন তিনি। তিনি যখন এই কথাগুলো বলছিলেন তখনও তার জামা দিয়ে হামলায় আহতদের সাহায্য করার সময় লেগে থাকা রক্তের দাগ লেগেছিল", যোগ করেন তিনি।

হামজা বলেন, "আমি কখনও চিন্তাও করিনি যে আমাকে এমন কোন ঘটনার মুখোমুখি হতে হবে কোনদিন। এই ধাক্কা কাটাতে আমার অন্তত ২-৩দিন সময় লাগবে"।

হামলাকারী যখন গুলি করতে করতে তখন মসজিদের অজুখানায় অজু করছিলেন আনোয়ার আল সালেহ। তিনিই লুকিয়ে থেকে জরুরী সাহায্যের জন্য অনুরোধ পাঠান।

তিনি জানান, যখন গুলি চলছিল তখন তিনি বেশ কয়েকবার পুলিশের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। পরে তিনি একটি জরুরী অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন এবং তাদেরকে মসজিদে হত্যাযজ্ঞ চলছে বলে জানান এবং দ্রুত সাহায্য এবং পুলিশকে খবর দিতে বলেন।

তিনি বলেন, "হামলা শুরুর ২০ মিনিট পর পুলিশ আসে। এর মধ্যে হামলাকারীরা কোন বিরতি ছাড়াই গুলি চালিয়েছে। এই হামলাকারীরা সন্ত্রাসীদের থেকেও খারাপ। এরা সবাই ঠান্ডা মাথার খুনী ছাড়া আর কিছুই না"।

পরবর্তীতে মসজিদ থেকে বেরনোর সময় তিনি নারী শিশুসহ বেশ কয়েকটি লাশ পড়ে থাকতে দেখেন বলেও জানান সালেহ।

উল্লেখ্য, ক্রাইস্টচার্চের এই বিভীষিকাময় সন্ত্রাসী হামলায় ৪৯ জন প্রাণ হারানোর পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত আরো ২০ জন। নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্দা আর্ডেন এই হামলাকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।