• মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:০২ বিকেল

কে এই মুরসি?

  • প্রকাশিত ১২:৩৩ দুপুর জুন ১৮, ২০১৯
মুরসি
মু্ক্তির দাবিতে আয়োজিত এক বিক্ষোভে মুরসির ছবি হাতে কান্নারত এই নারীর ছবিটি বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলে। ছবি: সংগৃহীত

এ সুযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই দেশটির তৎকালীন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও বন্দি করে।

মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি মারা গেছেন।

স্থানীয় সময় ১৭, জুন সোমবার দেশটির একটি আদালতে শুনানি চলাকালে বক্তব্য দেওয়ার সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান মুরসি।

মিশরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরার খবরে বলা হয়, আদালতে শুনানির সময় মুরসি দীর্ঘ বক্তব্য দিচ্ছিলেন মুরসি। প্রায় ২০ মিনিট বক্তব্য দেওয়ার পর এজলাস কক্ষেই হঠাৎ তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এ সময় মুরসিকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মুরসিকে মৃত ঘোষণা করে।

৬৭ বছর বয়সী মুরসি গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে করা একটি মামলায় হাজিরা দিচ্ছিলেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ এনে ওই মামলাটি করা হয়েছিল। এর আগে, নির্বাচনে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে করা অপর একটি মামলায় মুরসিকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মুরসি দেশটির রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা এবং মিশরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। ২০১২ সালে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি।


কে এই মুরসি?

মুরসির পুরো নাম  মোহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত। তিনি ১৯৫১ সালের ২০ আগস্ট মিশরের শারক্বিয়া প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯৭৫ সালে কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ও ১৯৭৮ সালে একই বিষয়ে সাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করে ওই বছরই উচ্চ শিক্ষার্থে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান মুরসি।

১৯৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে  মোহাম্মদ মুরসির প্রকৌশল বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন এবং তিনি ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থরিজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে মুরসি শারকিয়া প্রদেশের জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে মিশরে চলে আসেন।

২০০০ সালে  মোহাম্মদ মুরসি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাংগঠনিক ভাবে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য হলেও হোসনি মুবারাকের শাসনামলে মুসলিম ব্রাদারহুড মিশরের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ছিল। তাই তিনি সতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। সাংসদ হিসেবে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মিশরের সংসদে বহাল ছিলেন মুরসি। এ সময়ে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

ফিলিস্তিনের ন্যায়সংগত আন্দোলনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন মুরসি। ছবিতে আল আকসা মসজিদের সামনে মুরসির ছবিতে চুমু দিচ্ছে এক ফিলিস্তিনি কিশোর। ছবি: সংগৃহীত

২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গণবিক্ষোভের মুখে হোসনি মোবারকের পতন হয়। এরইমধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় দলটির প্রত্যক্ষ সমর্থনে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ (এফজেপি) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হলে মুরসি তার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। ২০১২ সালে মে ও জুনে দুই পর্বের নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল জনসমর্থনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মুরসি। এ সময় মুসলিম ব্রাদারহুড ও এফজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে  মোহাম্মদ মুরসিকে ‘মিশরের সর্বস্তরের মানুষের রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

তবে ক্ষমতাগ্রহণ করেই দীর্ঘ সামরিক শাসনের যাতাকলে ক্ষয়িষ্ণু মিশরকে পতনের হাত থেকে রক্ষার জন্য দ্রুত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি মুরসি।

সমালোচক ও বিরোধীদের ভাষ্য, মুরসি দেশের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সঙ্কট মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়েছিলেন। একইসঙ্গে তিনি দেশের স্বার্থের চেয়েও মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামপন্থি কর্মসূচিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র এক বছরের মধ্যেই মুরসি সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নামে মিশরের জনগণ। এরই সুযোগ নিয়ে মুরসির বিরুদ্ধে ওই গণবিক্ষোভ ও অভ্যুত্থানে সমর্থন দেয় সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েলের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো। সরকারিভাবে বিবৃতি দিয়ে মুরসি সমর্থকদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে সৌদি আরব।

কারাবন্দী নিঃসঙ্গ মুরসি। ছবি: রয়টার্স 

বাস্তবতা এই যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ান মুরসি। দখলদার ইসরায়েল অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য মিশরের সীমান্ত খুলে দিয়ে জেরুজালেম ও আল আকসা মসজিদের ওপর ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টাও করেন। তার এ দুটি পদক্ষেপই কাল হয়ে দাঁড়ায়। মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আদাজল খেয়ে মাঠে নামে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও ইসরায়েল। অভিযোগ রয়েছে মুরসির বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ উস্কে দেওয়ার জন্য এই তিনটি দেশ বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছিল।

২০১৩ সালের ৩০ জুন মিশরজুড়ে রাস্তায় রাস্তায় মুরসির সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এ সুযোগে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই দেশটির তৎকালীন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও বন্দি করে।

ব্যক্তি জীবনে মোহাম্মদ মুরসি তার চাচাতো বোন নাজলা মাহমুদকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুই জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মসূত্রে তারা মার্কিন নাগরিক।