• শনিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:২১ দুপুর

সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ আইসল্যান্ড

  • প্রকাশিত ০৬:৩০ সন্ধ্যা জানুয়ারী ১০, ২০২০
আইসল্যান্ড
আইসল্যান্ড এএফপি

আইসল্যান্ডে প্রতি বছর শতকরা ০-১.৫% খুনের ঘটনা দেখা যায়। এছাড়া কোনো বড় অপরাধ তো দূরের কথা, ছোটখাটো চুরিও সেখানে বিরল ঘটনা। তাই পুলিশের বেশি একটা দরকার পড়ে না

গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা বিশ্ব শান্তি সূচকের (জিপিআই) হিসেব অনুযায়ী, গত ১১ বছর ধরে পৃথিবীর সবচাইতে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রথম স্থান অধিকার করে আসছে আইসল্যান্ড। ২০০৮ সাল থেকে এই অবস্থান ধরে রেখেছে ইউরোপের অন্যতম ক্ষুদ্র দেশটি। 

শুধু তাই নয়, তালিকায় থাকা শীর্ষ ৪টি দেশের তুলনায় কম সামরিক শক্তিসম্পন্ন এই দেশটি। আইসল্যান্ডের পরেই অবস্থান- নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, পর্তুগাল ও ডেনমার্কের।

আইসল্যান্ড ইউরোপ মহাদেশের একটি প্রজাতান্ত্রিক দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানী রেইকিয়াভিক। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই দ্বীপটি গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব ও উত্তর মেরুরেখার ঠিক দক্ষিণে মধ্য আটলান্টিক পর্বতমালার ওপর দিকে অবস্থিত।

আইসল্যান্ডে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত ও অন্যান্য ভূ-উত্তাপীয় কর্মকাণ্ড নৈমিত্তিক ঘটনা। দ্বীপটির প্রায় ১১% হিমবাহ আবৃত। প্রায় ২০% এলাকা ব্যবহার করা হয় পশুচারণের জন্য আর মাত্র ১% এলাকায় কৃষিকাজ হয়। ৯০০ খ্রিস্টাব্দে মনুষ্য বসতি স্থাপনের আগে দ্বীপটির প্রায় ৩০-৪০% বৃক্ষ-আচ্ছাদিত ছিল। বর্তমানে কেবল কিছু বার্চ গাছের জঙ্গল ছাড়া আর তেমন বনভূমির অস্তিত্ব নেই।

প্রায় ১০০০ বছর আগে খ্রিস্টীয় ৯ম শতকে ভাইকিং অভিযানকারীরা আইসল্যান্ডে বসতি স্থাপন করে। আইসল্যান্ডবাসী তাদের ভাইকিং ঐতিহ্য নিয়ে বেশ গর্ব করে। আইসল্যান্ডের রিকজাভিক বিশ্বের সার্বভৌম রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তরপশ্চিমের শহর।

যেসব কারণে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় প্রথমে আইসল্যান্ড: একটি দেশ কতটা শান্তির তা পর্যালোচনা করার জন্য সেই দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রের অবস্থা, যেমন- সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং এরকম সকল ক্ষেত্রের অবস্থাই দেখতে হবে।

আইসল্যান্ডে নেই কোনো শ্রেণিভেদ: দেশটির অধিবাসীদের মধ্যে ধনী-গরিবের কোনো ভেদাভেদ নেই। সেখানকার ৯৭% নাগরিক নিজেদের মধ্যবিত্ত বলেই আখ্যায়িত করে। অর্থাৎ তাদের মধ্যে আর্থিক কোনো অস্থিতিশীলতা নাই। তারা তাদের সন্তানদের একই ধরনের স্কুলে পাঠান এবং খুব সাধারণ জীবনযাপন করেন। আবার তাদের মধ্যে ধর্মীয় কোনো বিষয় নিয়েও উত্তেজনা নেই। দেশটির ৮০% নাগরিকই ইভানজেলিকাল “লুথেরান” ধর্মে বিশ্বাসী। প্রায় দশ হাজার মুসলিমও রয়েছে আইসল্যান্ডে। এছাড়া রয়েছেন অন্যান্য ধর্মের মানুষও।

নেই লিঙ্গ বৈষম্য: ‘‘ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম ফর জেন্ডার ইকুয়ালিটি’’ এর তালিকা অনুসারে, আইসল্যান্ড পর পর ৭ বছর ধরে লিঙ্গ সমতার দিক থেকে এক নম্বরে রয়েছে। ১৪৪টি দেশের তালিকায় এই ছোট দেশটি শিক্ষা ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের অবস্থানটি বেশ পোক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের প্রায় শতকরা ৬৬ ভাগ নারী উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত।

তবে দেশটিতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় বেশি। পার্লামেন্টের ৬২টি আসনের মধ্যে ৩০টি আসনই নারীদের অধীনে অর্থাৎ শতকরা ৪৮ ভাগ ক্ষমতা নারীদের হাতে। এছাড়াও দেশটির ৮০ ভাগ নারীই বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে জড়িত। পারিবারিক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনের অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য বাধ্যতামূলক পিতৃত্বকালীন ও মাতৃত্বকালীন ছুটি দেওয়া হয়। ১৯৮০ সালে ভিগদিস ফিনবোগাদোত্তির শুধু আইসল্যান্ডের নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম নারী রাষ্ট্রপতি হিসেবে ক্ষমতায় আসেন।

নেই কোনো সেনাবাহিনী বা পুলিশ: এই দ্বীপরাষ্ট্রটির জনসংখ্যা মাত্র তিন লাখ ৩৪ হাজারের কাছাকাছি এবং সবাই-ই বেশ শান্তিপ্রিয়। এই দেশ রাজনৈতিকভাবেও বেশ নিরপেক্ষ। তাই তাদের নিরাপত্তার জন্য বেশি কষ্ট করতে হয় না। তবে তারা এখনও একটি ছোট উপকূলীয় বাহিনী বহাল রেখেছে যেখানে তিন থেকে চারশ' সৈনিক, ৪টি যুদ্ধবিমান এবং ৩টি পেট্রোল মজুদ করা জাহাজ আছে।

এছাড়া, তারা নিরাপত্তার জন্য ন্যাটোর সদস্য হিসেবেও সই করেছে। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের একটি চুক্তিও আছে। সে অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র কখনও আইসল্যান্ডে হামলা করবে না। ১৯৪৪ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই ৭৪ বছরে এভাবেই দেশটি আছে এবং এই অবস্থা কেউ পরিবর্তনের চেষ্টাও করেনি।

আইসল্যান্ডের পুলিশ সাধারণত বন্দুক, পিস্তল বা এ ধরনের কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে না, যদিও প্রশিক্ষণের সময় তাদেরকে এগুলো চালানো শেখানো হয়। সেখানে সাধারণ কোনো জনগণ চাইলেই নিজের কাছে কোনো অস্ত্র কিনতে বা রাখতে পারে না এবং অবৈধ পন্থায় সেখানে তা কেনার কোনো সুযোগও নেই। আরো একটি ব্যাপার হলো আইসল্যান্ডের পুলিশদের প্রশিক্ষণের ধরণ।

অন্য একটি বিষয় হলো আইসল্যান্ডবাসীর মধ্যে খুন করার প্রবণতাও অনেক কম। প্রতি বছর শতকরা ০-১.৫% খুনের ঘটনা দেখা যায়। এছাড়া কোনো বড় অপরাধ তো দূরের কথা, ছোটখাটো চুরিও সেখানে বিরল ঘটনা। তাই পুলিশের বেশি একটা দরকার পড়ে না।

বিশ্বের চতুর্থ সুখী দেশ: গত বছরের তুলনায় এক ধাপ পিছিয়ে গেলেও এখনও আইসল্যান্ড বিশ্বের শীর্ষ ৫টি সুখী দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। চতুর্থ অবস্থানে থাকা আইসল্যান্ড যেসব ইতিবাচক দিকগুলোর জন্য এই অবস্থান অর্জন করেছে সেগুলোর মধ্যে আছে- তুলনামূলক কম আয়কর, বিনামূল্যে শিক্ষা এবং চিকিৎসা সেবা ইত্যাদি। মূলত কোনো দেশের নাগরিকদের মধ্যে ৬টি নির্দেশকের উপস্থিতির ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি হয়। যেমন- মাথাপিছু জিডিপি, সুস্থভাবে জীবনযাপনের আয়ুষ্কাল, সামাজিক সহায়তা, বিশ্বাস, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া বা স্বাধীনতা এবং উদারতা।

এছাড়াও অনেক কারণ রয়েছে যার জন্য আইসল্যান্ড বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হতে পেরেছে। তাদের কাছ থেকে যদি অল্প কিছুও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি তাহলে হয়তো বাংলাদেশও “বিশ্ব শান্তি সূচক” এর ১৬৩টি দেশকে নিয়ে তৈরি তালিকার ১০১তম  অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সামনে অগ্রসর হতে পারবে। ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রটি সারা বিশ্বের জন্য শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের এক অনন্য উদাহরণ।