Thursday, May 23, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

সেনাবাহিনী: সংঘাত থেকে বাঁচতে মণিপুর ছেড়েছে ২৩,০০০ মানুষ

১৯৫০ সালের দিকে মণিপুরে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে সংঘাতে অন্তত ৫০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে

আপডেট : ০৭ মে ২০২৩, ০৮:০৭ পিএম

ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে সংঘাতে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অন্তত ২৩,০০০ মানুষ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে।

রবিবার (৭ মে) দেশটির সেনাবাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে।

বুধবার একটি উপজাতি গোষ্ঠীর বিক্ষোভ মিছিল সহিংস হয়ে ওঠে। পরে সেখানে হাজার হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়।

রাজ্যের বহু এলাকায় ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট আরোপ করেছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে গুলিরও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশ এএফপিকে জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে নতুন করে সহিংসতার পর পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর আগে, বৃহস্পতিবার ইম্ফলে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিক্ষোভকারীদের অনেকেই সরাসরি যানবাহন ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়।

রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় সার্বক্ষণিক কারফিউ আরোপের কারণে রাস্তা খালি দেখা গেছে। অনেক জায়গায় পোড়া যানবাহন পড়ে থাকতে গেছে।

প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা শুক্রবার বলেছেন, রাজ্যের সড়ক ও আকাশপথে অতিরিক্ত সেনা আনা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার মণিপুরে দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর ওইদিন রাতেই ভারতীয় সংবিধানের ৩৫৫ ধারার আওতায় উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এই রাজ্যটিতে বেশ কয়েক কোম্পানি রিজার্ভ সেনা পাঠায়।

৩৫৫ ধারার প্রয়োগ অনেকটা জরুরি অবস্থা জারির মতো। তবে ভারতের গত ৭৫ বছরের ইতিহাসে এই ধারার প্রয়োগ খুবই বিরল।

যা বলছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা

২৯ বছর বয়সী এল সাংলুন সিমতে স্থানীয় কুকি জাতির সদস্য। রাজ্যের রাজধানী ইম্ফলের বিমানবন্দরের বাইরে একটি এলাকায় পরিবারের ১১ সদস্যসহ ক্যাম্পিং করে থাকছেন তিনি। সহিংসতার ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করেছেন এই ব্যক্তি।

তিনি এএফপিকে বলেন, “আমরা নিরাপত্তার জন্য পালিয়ে এসেছি। পরিস্থিতি ঠিক নেই। তারা আমাদের কুকিদের ওপর হামলা করছে।”

সিমতে জানান, “বৃহস্পতিবার তার ৪৯ বছর বয়সী চাচাতো ভাই জনতার হামলায় নিহত হন। তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

“হামলাকারীরা বলে আমরা বহিরাগত এবং ইম্ফল ছেড়ে যেতে হবে। তারা যখন আমাদের উপর হামলা করেছিল, তখন স্থানীয় পুলিশ সাহায্য করেনি।

সিমতে এরইমধ্যে প্রতিবেশী ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় যেতে ফ্লাইট বুক করেছেন। তিনি জানান, “নিরাপত্তার উন্নতি হলেই তিনি ফিরে আসবেন।”

তিনি বলেন, “আমরা এখনও নিরাপদ বোধ করছি না।”

ইম্ফলের একটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের কর্মকর্তা ৪৫ বছর বয়সী লালপু সুয়ানতাকও কুকি সম্প্রদায়ের। তিনি জানান, “আশপাশের কিছু বাড়ি ও গির্জায় আগুন দেওয়ার পরে তিনি পরিবারের ১২ সদস্যকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান।”

তিনি এএফপিকে বলেন, “আমার বাড়িতে এখনও হামলা হয়নি। কিন্তু আমাদের এলাকায় একটি জনতা যখন একটি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় তখন ভয়ে ছিলাম।”

বর্তমানে যে অবস্থা

রবিবার সেনাবাহিনী জানায়, নতুন করে কোনো বড় অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে ঘটনার কেন্দ্রস্থল চুরাচাঁদপুর জেলায় সকাল ৭-১০টার দিকে কারফিউ তুলে নেওয়া হয়।

এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সেনাবাহিনী বিমান নজরদারি, ইউএভির চলাচল ও সেনা হেলিকপ্টার দিয়ে টহল দিচ্ছে।

এখন পর্যন্ত ২৩,০০০ বেসামরিক নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তর করা হয়েছে।

দ্য প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া বলছে, রাজ্যের রাজধানী ইম্ফল ও দক্ষিণে চুরাচাঁদপুর জেলার হাসপাতালের মর্গ দুই জায়গায় মিলিয়ে ৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে পিটিআই জানিয়েছে, মৃতের মধ্যে চুরাচাঁদপুর জেলা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে ১৬ মরদেহ ও ইম্ফল পূর্ব জেলার জওহরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সে ১৫টি মরদেহ রাখা হয়েছে।

ইম্ফল পশ্চিম জেলার ল্যামফেলের আঞ্চলিক ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস ২৩ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে।

সংঘাতের ইতিহাস

বিভিন্ন জনজাতি অধ্যূষিত রাজ্য মনিপুরের সংখ্যাগুরু জাতিগোষ্ঠী মেইতেই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের তফসিলি উপজাতি বা এসটি তালিকাভুক্ত হওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের বসবাস মূলত ইম্ফল উপত্যকায়।

এদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করেন যে আদিবাসীরা, তাদের একটা বড় অংশ মূলত নাগা, কুকি, চিনসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মানুষ।

মেইতেইরা যদি তফসিলি উপজাতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান, সেক্ষেত্রে রাজ্যের পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষজন বঞ্চিত হবেন—এই আশঙ্কা আগে থেকেই ছিল।

তবে ৩ মে, মণিপুর হাইকোর্ট মেইতেইদের তফসিলি উপজাতি হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি সরকারকে বিবেচনা করতে বলে।

বুধবার হাইকোর্ট এই সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরপরই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে, আর সেই থেকেই সূত্রপাত এই জাতিগত দাঙ্গার।

মেইতেইরা মণিপুরের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৪%। মণিপুর রাজ্য বিধানসভার ৬০টি আসনের ৪০টিই মেইতেইদের, যদিও তাদের বসবাস রাজ্যের মাত্র ১০% জমিতে।

মেইতেইদের অধিকাংশই হিন্দু এবং একটা বড় সংখ্যায় বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। তাদের মধ্যে কিছু মুসলমানও রয়েছেন। হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেইরা নিজ ধর্ম অনুসরণের পাশাপাশি চিরাচরিত প্রকৃতি পূজাও করে থাকেন।

অন্যদিকে পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী নাগা-কুকি-চিনসহ অন্যান্য উপজাতিদের একটা বড় অংশ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। রাজ্যটির ৯০% ভূমিতে এরকম অন্তত ৩৩টি জনজাতিগোষ্ঠীর বাস।

১৯৫০ সালের দিকে মণিপুরে প্রথম বিদ্রোহ শুরু হওয়ার পর থেকে সংঘাতে অন্তত ৫০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

About

Popular Links