Wednesday, May 22, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

মাত্র ১৪ মাসেই সম্পূর্ণ কোরআনের ক্যালিগ্রাফি

তিনি মনে করেন, সুযোগ থাকলে প্রতিটি মানুষেরই উচিত তিনি যে পেশা পছন্দ করেন তা বেছে নেওয়া এবং সেজন্য কঠোর পরিশ্রম করা

আপডেট : ০৭ নভেম্বর ২০২১, ০৭:৪৭ পিএম

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা এবং ক্যালিগ্রাফির প্রতি বিশেষ ঝোঁক ছিল ভারতীয় তরুণী ফাতিমা সাহাবার। সেই ঝোঁককে তিনি পরিবর্তন করেছেন দক্ষতায়। মাত্র ১৪ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ কোরআনের ক্যালিগ্রাফি করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ১৯ বছর বয়সী এই ভারতীয় তরুণী।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ কথা জানা যায়।

ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে ফাতিমার কোরআনের প্রতিলিপি তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের আগস্টে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি এই কাজ শেষ করেন। ক্যালিগ্রাফিতে সম্পূর্ণ কোরআনের প্রতিলিপি তৈরিতে ফাতিমা মোট ৬০৪টি পাতা ব্যবহার করেছেন।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই লিপিবিদ্যা বা ক্যালিগ্রাফির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে থাকেন ফাতিমা। ভালোবাসা থেকেই প্রায় প্রতিদিনই ক্যালিগ্রাফিতে হাত পাকাতেন তিনি।

ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে কোরআনের প্রতিলিপি তৈরির কারণ প্রসঙ্গে ফাতিমা জানান, কোরআন শরিফ এবং তার আয়াতগুলো তাকে বরাবরই মুগ্ধ করতো। তাই সেরা ক্যালিগ্রাফ লিপি দিয়ে তিনি কোরআনের প্রতিলিপি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।

ফাতিমা বলেন, “আমার খুব শখ ছিল ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে আমার প্রিয় কোরআনের প্রতিলিপি তৈরি করব। গত বছর কোরআনের একটি অধ্যায়ের প্রতিলিপি করে আমি আমার বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধবদের দেখাই। তারা খুবই খুশি হয়। আমি তাদের বলেছিলাম ক্যালিগ্রাফি ব্যবহার করে আমি পুরো কোরআনের প্রতিলিপি করতে চাই। তারা আমাকে খুব উৎসাহ দেয়। তবে বলে যে কাজটা সহজ হবে না।”

কোরআনের ক্যালিগ্রাফির কাজে হাত দেয়ার আগে ফাতিমা সাহাবার বাবা একজন মাওলানার সঙ্গে কথা বলেন। তিনি জানতে চান, ফাতিমা কোরআনের প্রতিলিপি করতে পারেন কি-না। মাওলানা জানান, এ ব্যাপারে কোনো ধর্মীয় বিধিনিষেধ নেই।

ফাতিমা বলেন, “প্রথম দিকে একটা বা দুটো আয়াত নকল করতাম। মা-বাবা খুব প্রশংসা করতেন। আয়াতগুলো ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখতাম। কিছুদিন পর দেখা গেল আমার পরিচিতজনেরা সে সব ফ্রেম কিনে নিচ্ছেন। আর আমি মনের আনন্দে তাদের জন্য আঁকতে থাকলাম। এতে করে আমার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। আমিও যে কিছু একটা করতে পারি, কিছু একটা আমার জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এটা আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি।”

ফাতিমা আরও বলেন, “আমি বাবাকে বললাম আমাকে কালো বল পয়েন্ট কলম আর ছবি আঁকার কাগজ কিনে দিতে। কাছের একটি দোকান থেকে বাবা সব জোগাড় করলেন। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে আমি একটু বিশ্রাম নিতাম। তারপর মাগরিবের নামাজ পড়ে আমি কোরআন নকলের কাজে হাত দিতাম।”

নিজের কাজটি যে কত বড় তা ফাতিমা জানতেন। তাই তাড়াহুড়ো করে যেনতেনভাবে তিনি কাজটি শেষ করতে চাননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার ভয় ছিল যে আমি হয়তো কোরআন নকলের কাজে কোন একটা ভুল করে ফেলব। ছবি আঁকার সময় আমার মা তাই আমার পাশে বসে থাকতেন এবং কোথাও কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখলে সেটা ধরিয়ে দিতেন।”

ভুল এড়াতে ফাতিমা প্রথমে পেন্সিল দিয়ে ক্যালিগ্রাফের নকশা তৈরি করতেন। কোথাও কোনোরকম ভুল না থাকার বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি কলম দিয়ে নকশাগুলোকে পাকা করতেন।

ফাতিমা বলেন, “আমার শুধু মনে হতো এত বড় এবং কঠিন একটা কাজ কি আমি শেষ করতে পারব? আমার নিজের ক্ষমতা নিয়েও মাঝে মধ্যে সন্দেহ তৈরি হতো। কিন্তু দেখা গেল প্রতিদিন কাজটি করতে গিয়ে আমি বেশ আনন্দই পাচ্ছি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় যে কোনদিক থেকে কেটে যেতো তা টেরই পেতাম না।”

তিনি আরও বলেন, “শুরুর দিকে কাজগুলো ভালোই ছিল। কিন্তু পরের দিকে কাজ আরও ভালো। করতে করতে হাতের কাজ আরও সুন্দর হতে থাকে।”

ফাতিমার মা নাদিয়া রউফ বলেন, “আল্লাহ্‌র রহমতে ফাতিমা তার সব কাজ শেষ করতে পেরেছে। আমরা সবাই খুবই গর্বিত তার জন্য। সে খুবই পরিশ্রমী এক মেয়ে। সে যাই করুক খুব মন দিয়ে তা করে।”

শুধু আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবই নন, ফাতিমার এই সাফল্যের কথা শুনে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অপরিচিতজনরাও।

দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সময় ফাতিমা সাহাবা তার পরিবারের সঙ্গে ওমানে থাকতেন। বর্তমানে এক ছোট বোন এবং এক ছোট ভাই আর মা-বাবার সঙ্গে ভারতের কান্নুর জেলার কোডাপারমবা শহরে থাকেন তিনি।

স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর ফাতিমার ইচ্ছে ছিল কলেজে ছবি আঁকা শেখার। তাই তিনি ইন্টিরিয়ার ডিজাইন পড়া শুরু করেন। এখন কান্নুরের কলেজেই তিনি ইন্টিরিয়ার ডিজাইন পড়ছেন। তার ইচ্ছা ক্যালিগ্রাফির শিক্ষক হওয়ার।

তিনি মনে করেন, সুযোগ থাকলে প্রতিটি মানুষেরই উচিত তিনি যে পেশা পছন্দ করেন তা বেছে নেওয়া এবং সেজন্য কঠোর পরিশ্রম করা।

About

Popular Links