Monday, May 27, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম অস্ত্র ও এর ঝুঁকিগুলো

এই অস্ত্রটি নিয়ে এরইমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল, কিন্তু কেন এই উদ্বেগ?

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০৬:১২ পিএম

সামরিক সহায়তার অংশ হিসেবে ইউক্রেনে বিতর্কিত ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ ট্যাংকের শেল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে পেন্টাগন। এই পদক্ষেপকে অপরাধমূলক কাজ বলে অভিহিত করেছেন রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা।

এই অস্ত্রটি নিয়ে এরইমধ্যে উদ্বেগ জানিয়েছে বিভিন্ন মহল। কিন্তু কেন এই উদ্বেগ?

ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম-সমৃদ্ধ শেল কি?

পরমাণু চুল্লি বা পারমাণবিক অস্ত্রে ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার সময় একটি ঘন উপজাত তৈরি হয়, এটিকেই ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম বলা হয়।

সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের চেয়ে বেশ কম শক্তিশালী এই ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম। ফলে এগুলো পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করতে পারে না। ডিপ্লিটেড ইউরেনিয়ামের ঘনত্ব অনেক বেশি। এটা এতই ঘন যে প্রচণ্ড গতিবেগ ধরে রাখতে পারে। ফলে এটি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যানে সুরক্ষার জন্য যে বর্ম ব্যবহার করা হয়, তা ভেদ করে যেতে পারে। আর এটা এত গরম হয় যে আগুন ধরে যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসির ওক রিজ অ্যাসোসিয়েটেড ইউনিভার্সিটিজের (ওআরএইউ) মিউজিয়াম অব রেডিয়েশন অ্যান্ড রেডিওঅ্যাক্টিভিটির মতে, একটি ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম যখন লক্ষ্যে আঘাত করে, তখন সেই লক্ষ্যবস্তুটির তাপমাত্রা বেড়ে যায়।

লক্ষ্যবস্তুটির তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে যায়। যখন ইউরেনিয়ামের পাইরোফোরসিটি গাড়ির জ্বালানি এবং/অথবা গোলাবারুদের সংস্পর্শে আসে তখন সেটির বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।

এর মানে হলো- এই ধরনের গোলাবারুদ একটি ট্যাংকের ওপর যখন আছড়ে পড়ে, তখন এটি ধূলিকণা ও ধাতুর জ্বলন্ত মেঘ সৃষ্টি করে ও বিস্ফোরিত হওয়ার আগে চোখের পলকে নরক তৈরি করে ফেলে। একইসঙ্গে ট্যাংকের ভেতরের জ্বালানী এবং গোলাবারুদ বিস্ফোরিত করে।

কার কার কাছে এই অস্ত্র আছে?

ইউরেনিয়াম অস্ত্র নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম পারমাণবিক অস্ত্র হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ নয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং পাকিস্তান এই অস্ত্র উৎপাদন করে। তবে এছাড়াও আরও ১৪ দেশের কাছে এই অস্ত্রের মজুত আছে।

এই অস্ত্রের ঝুঁকি কি?

লন্ডন ভিত্তিক বিজ্ঞানীদের একটি ফেলোশিপ রয়্যাল সোসাইটি অনুসারে, ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম অস্ত্রের ধ্বংস করার ক্ষমতা নিয়ে অনেক গবেষণা ও বিতর্ক রয়েছে।

১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ও ১৯৯৯ সালে যুগোস্লাভিয়ার ন্যাটো বোমা হামলায় এই ধরনের যুদ্ধাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় প্রায় ৩৪০ টন ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম যুদ্ধাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল।

১৯৯০ র দশকের শেষের দিকে বলকানে আনুমানিক ১১ টন ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল।

ইউরেনিয়াম, এমনকি ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের সংস্পর্শে এলে শ্বাস নেওয়া বিপজ্জনক। এটি রেনাল ফাংশনকে বিঘ্নিত করতে পারে ও বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।

ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন টু ব্যান ইউরেনিয়াম ওয়েপন্স জানায়, এই ধরনের অস্ত্রের কারণে ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটিও বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে।

গত মার্চ মাসে ব্রিটেন বলেছিল, তারা ইউক্রেনে এই ধরনের যুদ্ধাস্ত্র পাঠাবে। এমনকি তারা এটিও বলেছিল, যেখানে এই অস্ত্র আঘাত হানবে সেখানের ধূলিকণায় ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম ছড়িয়ে পড়বে ও শ্বাস নেওয়া কষ্ট হবে।

বিজ্ঞান কি বলে?

২০২২ সালে রয়্যাল সোসাইটি একটি প্রতিবেদনে বলেছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়াম অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সৈন্য ও সংঘর্ষের এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। 

রয়্যাল সোসাইটি বলেছে, এই অস্ত্র সৈন্যদের কিডনি এবং ফুসফুসের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

সংস্থাটির মতে, পরিবেশগত দূষণ হেরফের হতে পারে। তবে এতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি আছে। উচ্চ স্থানীয় মাত্রার ইউরেনিয়াম খাদ্য বা পানিতে মিশলে কিডনির অসুখ তৈরি করবে।

আইএইএ বলছে, উপসাগরীয় যুদ্ধের সৈন্যদের শরীরে ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের অকার্যকর টুকরো রয়েছে। তাদের প্রস্রাবের মাধ্যমে ক্ষতিকর পদার্থ বের হয়।

সৈন্যদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় দেখা যায়, এই ঘটনার কারণে সৈন্যদের মৃত্যুর পরিমাণ বেড়েছে।

তবে সার্বিয়া এবং মন্টিনিগ্রোতে ক্ষয়প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামের প্রভাব সম্পর্কে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির প্রতিবেদনে, কোনো উল্লেখযোগ্য, ব্যাপক দূষণের প্রমাণ মেলেনি বলে জানানো হয়।

কিছু সার্বিয়ান রাজনীতিবিদ এই বিষয়ে বিতর্ক করেছেন ও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার থেকে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন।

রাশিয়া কি বলেছে?

রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ বলেন, “এই ধরনের অস্ত্র সরবরাহ করে, ওয়াশিংটন ইউক্রেন সংঘাতকে বাড়িয়ে তুলছে।”

তিনি বলেন, “এটি কেবল একটি বর্ধিত পদক্ষেপ নয়। একটি যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরণের গোলাবারুদ ব্যবহারের পরিবেশগত পরিণতির প্রতি ওয়াশিংটনের আক্রোশজনক অবহেলার প্রতিফলন। এটি আসলে একটি অপরাধমূলক কাজ।”

About

Popular Links