Wednesday, May 29, 2024

সেকশন

English
Dhaka Tribune

বিলুপ্তির পথে সিন্ধুর ঐতিহাসিক উল্কি প্রথা

পাকিস্তানের সিন্ধু রাজ্যের বেশ কয়েকটি হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আছে এই উল্কির প্রচলন

আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০২৩, ১২:১৬ এএম

ঋতুচক্র শুরু হলে শরীরে “উল্কি” আঁকেন পাকিস্তানের সিন্ধু রাজ্যের বেশ কয়েকটি হিন্দু জনগোষ্ঠী। ঋতুচক্র শুরুর দিনে প্রথমবার কিশোরীর শরীরে “উল্কি” বা বিশেষ চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়। 

এই জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, উল্কির মাধ্যমে কিশোরী একটি নতুন পরিচয় পান। আর এই চিহ্ন মৃত্যুর পরও তাকে পরিচিত করাবে।  মৃত্যুর পর একমাত্র উল্কিগুলোই তার সঙ্গে যাবে।

সিন্ধু রাজ্যের ৫৫ বছর বয়সী নারী রত্নি; ১৩ বছর বয়সে তার শরীরে আঁকা হয়েছিল উল্কি। তার ঘাড়, গাল, বাহু, কব্জি এবং তার হাতের তালুর পেছনে অংশে আলাদা আলাদা উল্কি আঁকা রয়েছে, যার প্রত্যেকটির একটি আলাদা গল্প আছে।

তার সঙ্গে কথা বলেছে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন। তিনি ডনকে বলেন, “মেয়েদের বিয়ের দিনেও উল্কি এঁকে দেওয়া হয়। বংশ পরম্পরায় এসব চলে এসেছে।”

প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপ করার সময় তার পাশেই বসেছিল থাকা ১৩ বছর বয়সী ছোট্ট মেয়ে কমলি মেওয়াসি। রত্নি তার দিকে ইশারা করে বলেন, কমলি এখনও বেশ ছোট। তাই সে কেবল দুটি উল্কি আঁকিয়েছে। তবে সে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মতো তার শরীরে আরও উল্কি আঁকাবে।

তিনি বলেন, ‘‘এই উল্কিগুলোই একমাত্র জিনিস যা মৃত্যুর পরও আমাদের সঙ্গে থাকে। পৃথিবীর বাকি সবকিছুই মৃত্যুর পর রেখে যেতে হবে। আমরা আমাদের শরীরে অনেক উল্কি আঁকতে চাই। যেন আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে ভিন্ন ভিন্ন চিহ্নের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন স্মৃতি নিয়ে আমরা মারা যেতে পারি। এটা সৃষ্টিকর্তার পাশাপাশি আমাদের আত্মাকে খুশি করতে পারে। আমরা সত্যিই উল্কি ছাড়া নিজেদের অসম্পূর্ণ মনে করি।’’

সিন্ধুর হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীদের জন্য শরীরে উল্কি আঁকানো প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ।  কচি, যোগী, মেওয়াসি, রাবারি, কোলহি ও দক্ষিণ সিন্ধুর আরও অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা শতাব্দী ধরে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তবে ধীরে ধীরে এ ঐতিহ্য বিলীন হওয়ার পথে।

উল্কির ইংরেজি ‘‘ট্যাটু’’। শব্দটি এসেছে পলিনেশিয়ান শব্দ, ‘‘টাটাউ’’ থেকে এসেছে। ট্যাটু করার সময় তৈরি করা টুলের ট্যাপিং শব্দ থেকে এর উৎপত্তি। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নাগরিকরা একে বিভিন্ন নামে ডাকেন। যেমন, গোন্ডনা, ট্রাজভা ও ট্রাজোয়া।

সিন্ধি হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে, কিছু উল্কি তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবেও মনে করা হয়। আবার কিছু কিছু উল্কি  একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, বর্ণ বা গোষ্ঠীর অন্তর্গত পরিচয়ের প্রতীক মনে করা হয়। কেউ কেউ তাদের নিজস্ব সম্পত্তি যেমন, গয়না, অর্থ, প্রেম বা ঘৃণার মতো আবেগ বা প্রকৃতির সাথে উল্কি আঁকেন।

অনেক নারীরা তাদের শরীরে আঁকানো উল্কির আসল অর্থ বা তাৎপর্য না জেনেই তারা তা ধারণ করছেন। বেশিরভাগ উল্কি শিল্পী বয়স্ক হওয়ায় তারা কেউ কেয় উল্কির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন না। অনেক নারী বিশ্বাস করেন, শরীরে উল্কি আঁকলে তাদের সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে।

উল্কিগুলো নারীদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আঁকা হয়। যেমন, কপাল, মুখ, হাত, বাহু, ঘাড়, চিবুক, ঠোঁট, তালু, পা এবং পায়ে। উল্কির নকশার মধ্যে রয়েছে পশু, পাখি, ফুল ও গাছের চিত্র থেকে শুরু করে সামাজিক কার্যকলাপের প্রতীক।

যোগী ও মেওয়াসিরা সম্প্রদায়ের নারীরা সাধারণত কপালে উল্কি আঁকান। এগুলো মূলত তাদের পরিচয় বহন করে। কাছি ও কোলহি সম্প্রদায়ের নারীরা তাদের গালে একটি ছোট ক্রস উল্কি আঁকিয়ে থাকেন। এই ক্রসটি ‘‘রনখরি’’ নামেও পরিচিত। এটি তাদের পরিচয় বহন করে।

মেওয়াসি নারীরা তাদের ভ্রুর মাঝখানে কপালে একটি চাঁদ আঁকিয়ে থাকেন। এটি শিবের তৃতীয় চোখের প্রতিনিধিত্ব করে।

যোগী নারীদের পরিচয়বহনকারী চিহ্নকে ‘‘মাখরি’’ বলা হয়। এই উল্কি অন্যদের তুলনায় বড়। ‘‘মাখরি’’ হল কপালের মাঝখানে টানা একটি বড় পঙ্গপালের চিত্র। যোগীরা বিশ্বাস করেন, সাপ ও বিচ্ছুদের উল্কি তাদের মারাত্মক প্রাণীদের থেকে রক্ষা করে।

সিন্ধুর উমেরকোটের অন্যতম বিশিষ্ট উল্কি শিল্পী সুখান জোগান। সেধো যোগী কলোনীর বাসিন্দা এই নারী দীর্ঘ দিন ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত।

তিনি বলেন, ‘‘তার করা প্রতিটি উল্কির অর্থ ও তাৎপর্য রয়েছে। তিনি তার সম্প্রদায়ের অন্যান্য নারীদের মধ্যে এই শিল্পকর্ম প্রচার করছেন।’’

‘‘আমি যেকোনো উল্কি একবার দেখেই আঁকতে পারি। মাখারি উল্কিগুলো সবচেয়ে জটিল নকশার মধ্যে অন্যতম। আমি এই এলাকার প্রায় প্রতিটি নারীকে মাখারি ও অন্যান্য অনেকগুলো উল্কি আঁকানো শিখিয়েছি। এর ফলে এলাকার প্রতিটি নারী এখন উল্কি আঁকায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘উল্কি শিল্পীরা বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেন। কালি, কাঠের কয়লা, ছাগলের দুধ ও পানির মিশ্রণ তৈরির পর একটি সুই দিয়ে উল্কি আঁকা হয়। সব উল্কি কালো রঙের হয়। নকশা আঁকার আগে, আমরা প্রথমে একটি ম্যাচস্টিক দিয়ে নকশা তৈরি করি। আমরা অনেকেই এটি সরাসরি ত্বকে আঁকার আগে প্রথমে মাটিতে হুবুহু এঁকে নেই।’’

সুখান আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘‘উল্কি আঁকানোর প্রক্রিয়াটি কষ্টের। কিশোরীরা বেশি ভয় পায়। তারা প্রায়ই সূঁচের ভয়ে কেঁদে ফেলে। উল্কি আকাঁনোর সময় তাদেরকে কেউ ধরে রাখেন।’’

উমেরকোটের গোলাম মোহাম্মদ মারি গ্রামের বাসিন্দা রত্নী কাছি কচি ও মেওয়াসি সম্প্রদায়ের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে

রত্নি বলেন, “এই গ্রামে শুধুমাত্র নারীরা শরীরে উল্কি আঁকান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের মেয়েরা বিয়ের আগে তাদের শরীরে উল্কি আঁকান। কনের শরীরে উল্কি না থাকলে শ্বশুরবাড়ির মানুষজন তার সমালোচনা করে তাকে ‘উট’ বলে ডাকে। সাধারণত ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে আমরা মেয়েদের শরীরে উল্কি আঁকানো শুরু করি। আমরা যদি এই বয়সের আগে উল্কি আঁকাই তাহলে সেগুলো বাড়ন্ত শরীরে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উল্কিগুলো ভেঙ্গে যাবে এবং বিলীন হয়ে যাবে। উল্কি আকাঁনোর এটাই উপযুক্ত বয়স।”

তিনি আরও বলেন, “রত্নীর গ্রামে কোনো নারী উল্কি শিল্পী নেই। এ কারণে, তাদের বিভিন্ন গ্রাম এবং শহর থেকে পুরুষ উল্কি আঁকিয়ে শিল্পীদের উপর নির্ভর করতে হয়। তারা উৎসবের সময় বা বিশেষ সময় উল্কি আঁকতে গ্রামে আসেন। তারা প্রতিটি উল্কির জন্য ২০০ থেকে ৩০০ রুপি নেন।”

ড. রফিক ওয়াসান একজন নৃবিজ্ঞানী। বর্তমানে সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-তত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। তিনি জানান, নৃ-বিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিকভাবে উল্কি আঁকানো শিল্পকে বডি আর্ট হিসেবে লালন করেছেন। নৃ-বিজ্ঞানে বডি আর্টস শিক্ষা আলংকারিক বস্তু ও নন্দনতত্ত্বকে তুলে ধরে। নৃতাত্ত্বিকদের কাছে শিল্প শুধু গান-বাজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বলেন, “উল্কি শরীরের আলংকারিক শিল্পের অংশ। এটি জীবনের সংস্কৃতির অভিব্যক্তির একটি উপায়। নৃ-বিজ্ঞানীরা উলকি শিল্পের সংস্কৃতিকে একটি প্রতীকী পদ্ধতির মাধ্যমে দেখেন যা নির্দিষ্ট অর্থ ধারণ করে। প্রতিটি সংস্কৃতির প্রতীক রয়েছে যা তার রীতিনীতি, ঐতিহ্য এবং ধর্মকে প্রতিফলিত করে। নৃতাত্ত্বিকরা বুঝতে পারেন, মানব সমাজে বিভিন্ন ধরণের প্রতীক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং অর্থের সাথে যোগাযোগ করে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সচ্ছল পরিবারগুলো ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্য ছেড়ে যাচ্ছেন।’’

এ বিষয়ে কাচ্চি সম্প্রদায়ের রামশি কাচ্চি বলেন, “আমরা আমাদের মেয়ের শরীরে আর উল্কি আঁকাই না। আমাদের পরিবারে, শুধুমাত্র আমার মায়ের শরীরের একটি উল্কি আছে। আমরা এখন অন্যান্য ধর্মের লোকেদের সাথে বাস করি। তারা উল্কি পছন্দ করেন না। আমরা তাদের বিবাহ এবং অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে যাই এবং তাদের আচার-অনুষ্ঠানেও যোগ দেই। তাই আমরা এই ঐতিহ্য ত্যাগ করছি। আমরা মনে করি এই সমাজে উল্কি আঁকানো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমরা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করছি না, আমরা কেবল এই ঐতিহ্য ত্যাগ করছি।”

উল্কির গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রাচীন ঐতিহ্য ও শিল্পের এই ধরণটি হারিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার এই ধরনের প্রথা বন্ধ করে দিয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের পদচিহ্ন এখনও সিন্ধুর দক্ষিণ অঞ্চলে বিদ্যমান। এটিকে ভুলে যেতে দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন ড. রফিক।

About

Popular Links