• সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:১১ রাত

গল্প- ঝুলন গাওয়ের কুমীরেরা

  • প্রকাশিত ১০:০৮ রাত জুলাই ৪, ২০২০
রাজু অনার্য
রাজু অনার্য সৌজন্য

যদি জীবজন্তু, পোকামাকড়ের কোনো ক্ষতি না করে একরাতেই কালাবগি পার হয়ে বুকের জলে শিবসা ছুঁতে পারে তাকে তবেই হবে এ বিয়ে; নচেৎ না

বুকে বালুচর জমিয়ে দিনদিন ক্ষীণ হওয়া শিবসা আর প্রমত্তা ভদ্রা নদীর মাঝখানে বিশাল বিস্তৃত কালাবগি মাঠের বুকচিরে বয়ে চলা সুতার মত আঁকাবাঁকা খালের নাম সুতাখালি। খালের সরুত্ব আর সুতার মতো এঁকেবেঁকে চলার জন্যই বোধকরি তার এরূপ নাম। অবশ্য খালের ঠিক মাঝামাঝি বড় বাঁকটার কূলঘেঁষে গড়ে ওঠা কালাবগি গ্রামের বয়স্করা গান কবিতায় মিশিয়ে বলেন ভিন্নকিচ্ছা। তাদের মতে, যৌবনে ভীষণ সুন্দরী ছিল ভদ্রা; মনের আনন্দে কুলকুল প্রবাহিত জলে যখন খুশি হাসির হিল্লোলে জাগাতো ঢেউ। শাওন-ভাদরের একদুপুরে পুব পবনের  পরশ পরতেই সেই ভদ্রার যৌবনে লাগে দোলা। দস্যি মেয়ের শোঁ শোঁ হাসিতে উথলে ওঠা ঢেউজল ছরাৎ ছরাৎ আওয়াজ তুলে আছরে পরে মাটিতে। তার আঘাতে কেঁপে ওঠে কালবগি চক। মাটির কাঁপনে ঘুম ভাঙে চকের পশ্চিমের জমিঘেঁষা শিবসা'র। ঘটনা কী জানার জন্য পবনের সাথে দোস্তি পাতায় সে। পরাণের দোস্ত পবনের মুখে ভদ্রা'র রূপ-যৌবনের কথা শুনে ভদ্রা'র সাথে নিজের বিয়ের দূতিয়ালি করার জন্য তার কাছে আব্দার করে শিবসা। পবনও ফেলতে পারেনি বন্ধুর কথা। পশ্চিমের ফেরত যাত্রায় সে ভদ্রা'কে বলে,

"তুমি ভদ্রা সাজ কন্যা, শিবসা বিয়ের সুত।

বন্ধুর হাতে হাতটি রাখো, বলছে পবন দূত।।"

শিবসা'র প্রস্তাবে রাজি হয়ে শর্ত দেয় ভদ্রা। যদি জীবজন্তু, পোকামাকড়ের কোন ক্ষতি না করে একরাতেই কালাবগি পার হয়ে বুকের জলে শিবসা ছুঁতে পারে তাকে তবেই হবে এ বিয়ে; নচেৎ না। খবর পেয়ে বুকের জলে বাসকরা মাছ, কাঁকড়া ও অন্যান্য প্রাণিদের সঙ্গে নিয়ে মহাখুশিতে কাজে নামে শিবসা। কালাবগির মাঠ চিরে রাতারাতি কাটতে থাকে সরু খাল। আর ভদ্রাও তার প্রিয়তমকে দেখার লোভ সামলে না পেরে নারীর বেশে লাল শাড়ি পড়ে কালাবগি চকে এসে হবু স্বামীকে দেখে। খাল কাটা প্রায় শেষ, শিবসা'র জল যখন ভদ্রা'কে ছুঁইছুঁই করছে ঠিক তখন দেখা গেল সামনে দিয়ে এক লাল শাড়িপড়া নারী ত্রস্ত পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। জলে ডুবে মরবে না তো ও নারী! আতঙ্কিত হয় সবাই। শিবসা তার কাছে গিয়ে জোড়হাত করে বলে,

"মাগো, তুমি ছাড়হ পথ, না ডুবিও জলে।

না করিব কাহার ক্ষতি, এহি চলার কালে।।"

তখন হায় হায় করে ওঠে নারীরূপি ভদ্রা, তুমি এ কী বললে শিবসা? আমাকে তুমি মা বলে ডাকলে? এ মুখ আমি আর কখনো তোমাকে দেখাবো না। ততক্ষণে শিবসার সঙ্গী-সাথিরা খালের জল ভদ্রা'র বুকে নামিয়ে দিয়ে এসে দেখে নির্জীব পরে আছে শিবসা।

"কী লিখন লিখিলা বিধি দিয়া নিঠুর কালি।

মরিয়া বিয়ার সুত খাল হইলা সুতাখালি।।"

শিবসা'কে হারিয়ে শান্ত বয়ে চলা ভদ্রা'র বুক প্রিয় হারা বেদনায় আবার বিক্ষুব্ধ করেছে গত ভাদ্রের পুবালি বাতাস। প্রিয়তমকে হারিয়ে সংক্ষুব্ধ ভদ্রা'র সমস্ত রাগ যেন কালাবগির সুতাখালি খালের উপর।  তাই বিপুল বিক্রমে পাহাড়সম এক একটা ঢেউ তুলে আছরে পরেছে ভদ্রা প্রান্তে খালের মুখে। কালাবগির কৃষকের পাটপঁচানি জলে ছোট ছোট টেংরা-পুঁটি মাছের অবাধ বিচরণ নিয়ে বয়ে চলা সরু জলের খালের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হয়নি ওপারে সুন্দরবন থেকে ছুটে আসা ভদ্রা'র ঢেউয়ের ধারাল দাঁতের সুতীব্র ধকল। একটা একটা করে বুকের পাঁজর হারানোর মত সে হারিয়েছে কালাবগি মাঠ এমনকি খালের বাঁক ঘেঁষে জন্ম নেওয়া গ্রামের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত জমির চাপ চাপ মাটি। মাত্র কয়েকদিনের তাণ্ডবে বাপ-দাদার বসতভিটে, ফসলের জমি হারিয়ে নিঃসম্বল ভুমিহীন হয়েছে কালাবগি গায়ের মানুষ। বর্ষা ঋতুর বিদায়ে পানি নামার সাথে কমেছে নদীর বেগ।

এতদিন সুতাখালির কোলঘেঁষা অন্যের জমিতে ছাউনি তুলে কোনরকমে বসত করা কালাবগির মানুষের ভাবনা এখন নয়াবসতের। গাঁশস্যি'র রাত পোহালেই ওপারের কৃষকেরা মুগ, মটর, মাষকলাইয়ের চাষ দিতে আসবে তাদের জমিতে। তার আগেই জমি খালি করা চাই। এর মধ্যে একদিন কালিবগির দস্যি ছেলে-মেয়েদের একদল নদীর ভাঙনে গ্রাম বিলীন হয়ে প্রসারিত খালে হলুই-ডুব খেলতে খেলতে আবিস্কার করে, থই মেলে তাদের পুরাতন ভিটায়; কোথাও পানি নেমে কোমর সমান। সবার আগে মালেকা'র বারো বছরের মেয়ে রাবেয়া চিৎকার করে জানায়, "মা, মারে..এ..আমাগো ভিটায় থাই পাওয়া যায়। খাড়াইলে আমার গলা পানি অয়।" রাবেয়া'র এ চিৎকারে যেন বল ফিরে পায় কালাবগি'র মানুষ। শিবসা'র ওপারে বন্দরহাটে হাট মেলে শনিবার। সেখান থেকে শ'য়ে শ'য়ে বাঁশ কিনে চালাবেঁধে নদীপার করে আনে কালাবগির মানুষেরা। তারপর পুরাতন বাসভূমে সাবেক বর্ষায় ওঠা পানি থেকেও উচ্চতা মেপে পোঁতা বাঁশের খুঁটির উপর মাচাবেঁধে তৈরি করে ঝুলন্ত ঘর। আর এসময় তাদের বড় সহায় হয়ে উপস্থিত হয় শিবসা'র ওপারে বন্দর হাটের কাসেম মহাজন। বাওয়ালি-মৌয়ালদের নৌকা-পুঁজি দেওয়া, বাঁদার কাঠচোরাই সহ হাজারো কারবারের মধ্যে সুদের ব্যবসা তার সম্পদের একটা উৎস। কালবগি'র যে চেয়েছে তাকেই হাসিমুখে টাকা দিয়েছে সে। বলেছে, "ট্যাহা যা লাগে নেও। টাইম মতো সুদ দিবা। কাম না পাইলে আমার নায়ে বাঁদায় যাইবা। আমারে দিয়া ট্যাহা কামাইয়া আমারে আবার ফেরত দিবা। না পুশাইলে নিও না। কোন জবরদস্তি নাই মিয়ারা।" তারপর দম নিয়ে আবার বলেছে, "যারা ট্যাহা নিছো, তাগো তাগাদায় আমার মাইঝ্যা পুলা সবজেল আইসপো,অর কাছে সুদের ট্যাহা দিয়্যা দিবা।" কাসেম মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা এনে টিন-বাঁশ কিনে বাকিটা বাপের বাড়ি থেকে এনে স্বামী ও একজন ঘরামি নিয়ে কয়েকদিনেই একটি ঘর তুলে মালেকা। তারপর স্বামীকে নিয়ে সে ঘরের বারান্দার একপাশে রান্নার জায়গা ও অন্যপাশ ছালার বস্তা কেটে ঘের দিয়ে টাট্টিখানাও বানিয়ে নেয় কোনরকমে। তারপর শুকনো জমি থেকে একটা বাঁশের পুলে সংযোগ দেয় ঘরের। কালবগি গ্রামের সব বাড়িরই অবস্থা এখন এক। ঝুলন্ত অবস্থায় বাস করতে করতে কয়েকদিনেই গ্রামের নাম কালাবগি হারিয়ে যায় ঝুলনপাড়া'র আড়ালে।

গ্রামের নাম বদলের মতো জমিজমা হারানো ঝুলনপাড়া'র মানুষের পেশাও বদলে যায় সহজেই। কেউ মাছ ধরে ভদ্রা'র বুকে জাল ফেলে, কেউ শিবসা'র ওপারে বন্দরঘাট থেকে রিকসা-ভ্যানে যাত্রী বা মাল নিয়ে চলে যায় খুলনা-দাকোপ, কেউবা কাজ নেয় কৃষাণ-মজুরের। আবার কারো পেশা হয় অঘ্রাণ-পৌষে ভদ্রা'র ওপারে সুন্দরবনের খাঁড়ি-খালে কাঁকড়া-চিংড়ি ও চৈত্র-বৈশাখ-জৈষ্ঠে মধু-মোম-গোলপাতা আহরণ। শেষের দলে বনে-বাঁদায় ঝুঁকি আছে; তাই কামাইও বেশি। মালেকা'র নিষেধ তার স্বামীকে শীতে   কাঁকড়া-চিংড়ি'র নায়ে উঠতে না দিলেও ফেরাতে পারেনি চৈত্রের মৌয়াল দল থেকে। বন্দর হাটের কাসেম মহাজনের নৌকার মাল্লা হয়ে  রওনা সে দিয়েছেই বাঁদার পথে।

মৌচাক ভেঙে স্বামীর ঠিকঠাক ফিরে আসায় স্বস্তিতে যে নিঃশ্বাস ফেলেছিল মালেকা তা খুব বেশি দীর্ঘ হতে পারেনি। নৌকা-চালানের ভাগ কাসেম মহাজনকে দিয়েও নিজের ভাগে বেশ টাকা পেয়েছে তার স্বামী। মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া সুদের টাকার একটা অংশ দিয়েও অনায়সে কয়েক মাস চলতে পারবে ওরা। কিন্তু ক'দিন পরেই মহাজন খবর পাঠায়, "জৈষ্টি মাসে নাও ভাসামু, ইবার গোলপাতার খ্যাপ। রেডি থাইকো।" গ্রামের কার কাছে যেন মালেকা শুনেছে, বাঁদায় বাঘ ঘুরে এসময় খুব, গরমের দিন হওয়ায় তার মেজাজও থাকে তিরিক্ষি। একবার সামনে পরলে আর রক্ষা নাই। তাই স্বামীকে ফেরাতে নানা ফন্দিফিকির করেছে সে, বারবার বলেছে, "আমাগো তো একটা মাইয়্যা, এত কামই'র চিন্তা করো ক্যাঁ? তুমি গেরামে কামলা দেও। তাতেই দিন যাইবো। দরকার পরলে আমি মাটি কাটুম ওপারের রাস্তায়। তাও তুমি যাইও না।" তাতেও ফেরেনি তার স্বামী; ফেরার উপায়ও তার ছিল না। সবজেল এসে শাসিয়ে গেছে, "যারা বাঁদায় যাইব্যা না, তারা এই বাইশষ্যা আসার আগেই সব ট্যাহা দিয়্যা দিবা। চাইলে যাও, নাইলে না যাও।"

জ্যৈষ্ঠের শুরুতেই বানের জলে প্লাবিত হয়েছে ভদ্রা-শিবসা'র দু'কূল। মালেকা'র ঘরের নিচ দিয়ে সারাক্ষণ কলকল শব্দকরে বয়ে চলে সুতাখালির পানি।এরমাঝেই একদিন বনবিবি'র পূজা দিয়ে বদর বদর ধ্বনি তুলে বাঁদাবনের পথে সারিবেঁধে কাসেম মহাজনের নাও ভাসিয়েছে মাঝি-মাল্লা'রা। সবাই বলাবলি করছে এবারের মতো এতগুলো নৌকা আর কোন বছরই একসাথে বাঁদাবনে পাঠাতে পারেনি মহাজন। প্রায় পুরুষশূণ্য ঝুলনপাড়ায় যখন তখন লুঙ্গি গুটিয়ে হেঁটে বেড়ায় সবজেল। দুপুরের রান্না শেষে দাওয়ায় দাড়িয়ে দৃষ্টির প্রান্তসীমায় ভদ্রা'র ওপারে সুন্দরবনেরর দিকে তাকিয়ে থাকে মালেকা; আবার কোনদিন তাকায় পশ্চিমে শিবসা'র দিকে। ছোট হতে হতে এক দৌড়ের পথের সমান চওড়া শিবসা'র বুকে চলা খেয়া নৌকায় চড়ে স্কুলফেরত মেয়েকে দেখে তার বুকে স্বপ্ন জাগে। মেয়েকে সমিতি'র দেওয়া স্কুলের সাদা স্যালোয়ার কামিজে দেখলেই মালেকা'র স্বপ্নগুলো রঙিন হয়ে ওঠে মুহূর্তেই।

সমিতি থেকে টাকা নিয়ে কয়েকটা হাঁসের বাচ্চা কিনেছিল মালেকা। ওগুলো এখন ডিম দেওয়ার উপযুক্ত হয়েছে। প্রায়ই খালের পানিতে ভাসতে ভাসতে পাড়ার শেষমাথায় চলে যায়। সেদিন হাঁস আনতে পাড়ার শেষ মাথায় গেলে তাকে দুইটি খবর শুনিয়েছে ফুলি'র মা। দুটোই রক্ত হিম হবার মতো: সুতাখালির পানিতে কুমীর দেখা গেছে,অন্যটি আরো ভয়াবহ; সবজেলের চরিত্রে দোষ আছে। "গ্যাছে  বিষ্যুদবার দুপুর অক্ত হ্যাষে যহন গোটা পাড়ার ঝিমানির ধরে সবজেল হেইসুম গেছিল দাদন শ্যাকের বাড়ি। দাদন গ্যাছে গোলপাতার খ্যাপে। হুন্যা বাড়িতে নয়া বউডা বাঁশের মাচাঙে ঘুমাইতে ছিল বিভোর হইয়্যা। ফাকা বাড়ি পাইয়্যা সবজেল চড়াও হইছে বউ'র উপ্রে। দুইজনের ধস্তাধস্তির বেগে পাশের ঘরের হাকু বুইড়্যা আগাই গেলে দৌড়ে পলাই গেছে সবজেল। আর বউডার যে কি কান্দন গো বু।" ফুলির'মা প্রায় ফিসফিসিয়ে বিশদ বলে তাকে। তারপর আর সেখানে দেরি করেনি মালেকা। হাঁসগুলো তাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত ঘরে ফিরেছে সে।

আষাঢ় মাসের অর্ধেক প্রায় শেষ। গোলপাতা বোঝাই দিয়ে একটা-দু'টো করে ফিরতে শুরু করেছে কাসেম মহাজনের নৌকা। মালেকা'র স্বামী ফেরেনি এখনও। ওর হাঁসগুলো প্রতিদিন দশ-বারোটা ডিম দেয়। এইভাবে প্রতিদিন ডিম পাড়লে ডিমবেঁচেই মহাজনের সুদের কিস্তি দিতে পারবে সে। ঘরের মাচাঙের নিচে হাঁসের খাবারের মালসায় খুঁদ-কুঁড়া মাখিয়ে দিয়ে চুলায় ভাত চড়িয়ে মালেকা ভাবে, 'কোনরকমে মহাজনের ঋণটা শোধ হলেই স্বামীকে আর বনে যেতে দেবে না সে। বাড়িতে থেকে স্বামীর যা আয় হবে তার সাথে তার হাঁসের ডিমবেঁচা টাকা মিলিয়ে অনায়সেই সংসার চলবে। মেয়ের পড়া বন্ধ করবে না কিছুতেই। স্কুল পার হয়ে কলেজ, কলেজ পাশ করে আর ভাবতে পারে না সে। মেয়ে যতদূর চায় ততদূর পড়াবে।  নিজেদের জীবন তো গেছেই, মেয়ের যেন কষ্ট না হয়।' হঠাৎ ঘরের নিচের হাঁসগুলোর প্যাঁক প্যাঁক চিৎকারে রান্নাঘর থেকে মেয়েকে ডাকে মালেকা, "ও রাবেয়া, দ্যাখছে আসের কী অইল? গুই হাপে ধরল নাকি।" মায়ের কথায় ঘরের নিচে উঁকি দিয়ে কোন কথা বলতে পারে না রাবেয়া। খালি একবার কোনরকমে বলে, "মা, দ্যাহ কী অইছে।" রান্না চুলায় রেখেই দৌড়ে আসে মালেকা। ঘরের নিচে তাকিয়ে রক্ত হিম হয়ে আসে ওর। দলের ধবধবে সাদা হাঁসটাকে কুমীরে ধরেছে; বাকিরা চিৎকার দিয়ে ছুটছে দিগ্বিদিগ। ঘাড়-গলা কামড়িয়ে ধরে কুমীরটা যতই পানির নিচের দিকে টানছে, হাঁসটাও ডানা ঝাপটাচ্ছে প্রাণপণ। টকটকে লাল রক্তে মাখামাখি হয়ে গেছে হাঁসের সাদা পশম; আশপাশের পানি।

দুই.

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলছে। পাড়ায় কেমন একটা নিস্তব্ধতা। রাবেয়া স্কুল থেকে ফিরেই বসেছে খেতে। মালেকা কতবার বলেছে, "জামা-কাপুর বদলাইয়া আতমুখ ধুইয়া বয়।" কিন্তু মেয়ে শোনেনি তার কথা। "ক্ষিদা লাগছে" বলেই থালায় ভাত নিয়ে বসেছে সে। হঠাৎ মালেকা'র খেয়াল হয় তার হাঁসগুলির খোঁজ নাই অনেকক্ষণ। ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার দিয়ে, "আয়, আয়, চই চই," করেও কোন সাড়া পায় না সে। হাঁসগুলোকে ডাকতে ডাকতে পাড়ার পুব মাথায় এসে দেখা পায় দলের।  ওর গলার আওয়াজ পেয়েই শব্দকরে ডেকে ওঠে হাঁসেরা। হাঁসগুলি তাড়িয়ে ফেরার সময় ফুলির মা আবার শোনায় সবজেলের কুকীর্তির কথা। দিন-রাত দাদনের ঘরের আশপাশ দিয়ে ঘুরঘুর করে সে। আজও একবার এসেছে ঠিক দুপুরে। তারপর কোথায় যেন হাওয়া হয়েছে, একলা ঘরে দাদন শেখের নয়া বউটার আর দু'দণ্ড শান্তি নাই। হাঁস নিয়ে বাড়ির কাছে আসতেই মালেকা দেখে লুঙ্গি উল্টোকরে হাঁটুর উপর উঠিয়ে দ্রুত বেড়িয়ে যাচ্ছে সবজেল। হঠাৎ কী হয় তার! হাঁস তাড়ানো বাদ দিয়ে এক দৌড়ে ঘরের ভিতর প্রবেশ করে মেয়েকে দেখেই "রাবেয়া, মা রে," বলে চিৎকার দেয় সে। বাঁশের মাচাঙের উপর তক্তার বিছানায় পরে কাতরাচ্ছে রাবেয়া। সারা মুখে আঁচরের দাগ। পড়নের সাদা পাজামা ছিড়ে দলা পাকিয়ে রয়েছে শরীরের নিচে। তাতে টাটকা রক্তের দাগ। এরকম রক্ত মালেকা দেখেছিল তার হাঁসের পশমে।

০৮ এপ্রিল, ২০২০। ফরিদপুর।


লেখক পরিচিতি: 

রাজু অনার্য কবি, গল্পকার ও লোকসাহিত্য গবেষক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে সেখানেই পিএইচ,ডি গবেষণা করছেন লোকসাহিত্য বিষয়ে। প্রকাশিত গ্রন্থ- কাব্য: লাশের মিছিল, অসামাজিক পদাবলী। গল্প: বোকাই চাচার ঘোড়া ভাড়া। সম্পাদনা: শাহ আজাহার ও তাঁর গান, বাউলতত্ত্ব ও ওস্তাদ মফিজ দেওয়ানের গান। গবেষণা: বাউলতত্ত্ব ও বাউল শব্দকোষ। ছড়া: স্বর্ণার ভুটকো ছাগল, ইত্যাদি।



51
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail