• শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:১৫ দুপুর

গল্প: কোনো এক আষাঢ়ী পূর্ণিমা রাতে তার মরিবার হলো সাধ

  • প্রকাশিত ১০:৪০ রাত জুলাই ৭, ২০২০
শাহ মোহাম্মদ দীদার
শাহ মোহাম্মদ দীদার সৌজন্য

প্রথম লাইনটা পড়েই ঢক করে হুইস্কির প্রথম পেগটা চালান করে দিলেন। কিন্তু তিনি পরের বাক্যে আর যেতে পারলেন না

খুব যত্ন করে শরীরে জড়িয়ে নিলেন সেলাইবিহীন দুধ জ্যোছনার মতন ধবধবে শাদা – ইহরামের কাপড়। এটা তার বাবা সর্বশেষ হজ্ব থেকে ফিরে এসে তাকে উপহার দিয়েছিলেন। কিন্তু তার আগে তিনি বাথটাবের উষ্ণ জলে কালো গোলাপের পাপড়ি ঢাললেন, কর্পূর ছিটালেন। আর বাথরুমে জ্বালিয়ে দিলেন মুতরাহ সুউক থেকে কিনে আনা লোবান। পৃথিবীর সর্বশেষ মারিজুয়ানা স্টিকে আগুন লাগিয়ে আয়েশ করে পড়তে লাগলেন আত্মহত্যা বিষয়ক দরকারি কিছু তথ্য। জনাব তোরাব আলীর সিকদার আত্মহত্যার জন্য হোটেল ওশান প্যারাডাইসের ছয়শ’ ছেষট্টি নাম্বার কক্ষের সুসজ্জিত বাথরুমের সুবিশাল বাথটাবটা বেছে নিলেন।

তিনি আত্মহত্যা বিষয়ক পঠন-পাঠনের জন্য কিছু নথিপত্রের মুদ্রিত সংস্করণ সাথে করে নিয়ে এসেছেন। হুইস্কিতে বরফ কুচি ঢেলে– প্রথম যে লাইনটা তিনি পড়লেন– ‘‘Suicide is a major public health concern’’। প্রথম লাইনটা পড়েই ঢক করে হুইস্কির প্রথম পেগটা চালান করে দিলেন। কিন্তু তিনি পরের বাক্যে আর যেতে পারলেন না। তার মনে অনেকগুলো প্রশ্নের উদয় হলো। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য– তাহলে আত্মহত্যাকারীকে কিংবা আত্মহত্যাকারীর পরিবারকে কেন দুর্বিষহ অপমান, অবহেলা আর নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়? তিনি পরের পেগ ঢাললেন। কিন্তু চালান করলেন না। এবং তিনি পড়তে শুরু করলেন– 

এমিল ডুর্খেইম আত্মহত্যাকে একটি সামাজিক ঘটনা হিসেবে মত দিয়েছেন। তিনি তাঁর ‘‘সুইসাইড’’ গ্রন্থে অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানীদের প্রদত্ত আত্মহত্যার জৈবিক, মনস্তাত্বিক, ভৌগোলিক কারণসমূহকে যৌক্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করে বরং সামাজিক  কারণসমূহকেই দায়ী করেছেন। যেমন– তিনি সামাজিক সংহতি এবং সামাজিক সচেতনতার সাথে আত্মহত্যার মধ্যেকার সম্পর্ককেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি আত্মহত্যাকে  শ্রমবিভাজনের   নেতিবাচক  দিক  হিসেবে   ব্যাখ্যা করেন যা  সামাজিক  সংহতির   সঙ্গেই  অধিকতর সম্পৃক্ত। আত্মহত্যা প্রসঙ্গে ডুর্খেইম এর মত হচ্ছে– যারা সমাজের সাথে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত তারা আত্মহত্যা করেন। আবার যারা সমাজ থেকে অতিমাত্রায় বিচ্ছিন্ন তারাও আত্মহত্যা করেন। তিনি আত্মহত্যাকে– আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যা, পরার্থমূলক আত্মহত্যা, নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা এবং নিয়তিবাদী আত্মহত্যা এই চারভাগে ভাগ করেছেন।

যে কারণে জনাব তোরাব আলী সিকদার আত্মহত্যার স্থির সিদ্ধান্তটি নিলেন– তার সাথে পাঠের মধ্যে কোনোরূপ সংযোগ ঘটাতে ব্যর্থ হলেন। তিনি পৃষ্ঠা ওল্টালেন– 

আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ডুর্খেইম এর মত হচ্ছে– ব্যক্তি যখন মনে করেন– তিনি এই সমাজের কেউ না কিংবা এই সমাজে তার জন্য কোনো জায়গা নেই অথবা এই সমাজে তিনি নিতান্ত বিচ্ছিন্ন একটা অংশ, ফলে তার বেঁচে থাকাটা একেবারে অর্থহীন। কার্যতঃ তীব্র একাকীত্ব কিংবা অতিরিক্ত অবসাদ থেকে মুক্তির জন্য এ ধরনের আত্মহত্যা করে থাকেন। জনাব তোরাব আলী সিকদারের আত্মহত্যার জন্য যে সব কারণ তিনি ভেবেছেন– তার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই। তিনি নিজেকে কখনোই যুদ্ধের মাঠে খোঁড়া ঘোড়া হিসেবে দেখেননি।

গেলাসে নতুন করে হুইস্কি ঢাললেন। লোবান শেষ হয়ে যাওয়ায় হরে কৃষ্ণ ব্রান্ডের এক গোছা আগরবাতি জ্বালিয়ে দিলেন।

পরার্থমূলক আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ডুর্খেইম বলেন– ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের অতিমাত্রায়  সংহতির   কারণে এধরণের আত্মহত্যা সংঘটিত হয়। এধরণের আত্মহত্যায় ব্যক্তি নিজের জীবনকে সামগ্রিক গোষ্ঠীর প্রয়োজনের কাছে তুচ্ছ মনে করেন। 

জনাব তোরাব আলী সিকদার এবার হাঁটু ভাঁজ করে বুকের দিকে টেনে নিলেন। ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ায় বাথটাবে নতুন করে জল ছেড়ে দিলেন। ডুর্খেইমের এই বক্তব্যের সাথে নিজের আত্মহত্যার কিছুটা সংযোগ ঘটাতে সক্ষম হলেও– পুরোপুরি ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারলেন না। আবার পড়তে শুরু করলেন– 

নৈরাজ্যমূলক আত্মহত্যা। সাধারণত বড় কোনো ধরনের দুর্যোগ, অতিমারী এমন কী বড় ধরনের কোনো বিপ্লব বা পরিবর্তনের পর এ ধরনের আত্মহত্যা সঙ্ঘটিত হয়। ব্যক্তি যখন মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি, নৈরাশ্য, মানষিক পীড়নের মধ্যে থাকেন তখন এসব কিছু থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসেবে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

এবার জনাব তোরাব আলী সিকদার বাথটাবে পাশ ফিরে শু’লেন। হুইস্কিটা চালান করে দিলেন। কিন্তু তিনি ভাবতে লাগলেন–  তিনি বিবাহিত, তাদের ঘরে ফুটফুটে সুন্দর একটা শিশু আছে, যার চোখের দিকে তাকালে দুনিয়ার তাবৎ বিষণ্ণতা বিলীন হয়ে যায় এক লহমায়। কিন্তু– এমিল ডুর্খেইম বললেন– 

সচরাচর  যে সকল   সমাজে  সামাজিক সংহতি কম থাকে সে সকল সমাজে আত্মকেন্দ্রিক আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। ডুর্খেইম তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখান যে – তুলনামূলকভাবে বিবাহিতদের চেয়ে অবিবাহিতদের মধ্যে, নারীদের চেয়ে পুরুষদের মধ্যে, গ্রামবাসীদের তুলনায় নগরবাসীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি।

সুতরাং জনাব তোরাব আলী সিকদার তার পাঠে আবারও মনোনিবেশ করলেন– 

নিয়তিবাদী আত্মহত্যা। সমাজের নিয়ম-কানুনের অতি কড়াকড়িতে মানুষের জীবন যখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, ব্যক্তি যখন নিজের ক্ষোভ, রাগ, অভিমান প্রকাশ করতে বাধাগ্রস্ত হন কিংবা ব্যক্তির উপর যখন প্রত্যাশার চাপ বাড়ে তখন মুক্তির অনন্য উপায় হিশেবে আত্মহত্যাকেই বেছে নেন। এবার জনাব তোরাব আলী সিকদার তাঁর স্থির সিদ্ধান্তটাতে স্থির হবার মোক্ষম যুক্তি পেলেন। তিনি সর্বশেষ কবে তার রাগ অভিমান আনন্দ বেদনা হাসি কান্না প্রকাশ করতে পেরেছেন মনে করতে পারেন না। তাঁকে সর্বশেষ কবে কথা বলতে দেয়া হয়েছে সঠিক মনে করতে পারেন না।

তিনি খেয়াল করলেন যে– টাকা থাকলেও চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না, টাকা না থাকলেও না। টাকা থাকলেও তিনি খাদ্যের যোগান দিতে পারছেন না। টাকা না থাকলেও না। তিনি আরো ভেবে দ্যাখলেন যে– গ্রামে ফিরে গিয়ে চাষবাস করার উপায় নেই। জমিসব ইট ভাটা আর বড় বড় দালানের নিচে চাপা পড়ে গ্যাছে। 

এবং তিনি তার আত্মহত্যার জন্য সম্ভাব্য যৌক্তিক কারণসমূহ আবারও পড়তে শুরু করলেন – তিনি সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন, তিনি কোভিড টেস্টের রেজাল্টের অপেক্ষায় আছেন এবং তিনি নিশ্চিত তিনি আক্রান্ত, তিনি কোন মতে তিন মাস চলতে পারবেন কিন্তু এরপরের দিনগুলো নিয়ে ভীষণ চিন্তিত, তিনি এতোদিন ধরে নিয়মিত আয়কার প্রদান করে এসেছেন কিন্তু তাঁর জন্য আজকে কোনও সোশ্যাল সেফটিনেট নেই। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সন্তানের অসহায় মুখ দ্যাখার জন্য যথেষ্ট সক্ষম নয় বলে মনে করলেন। তিনি তার পরিবারের কারও কথা ভাবতে পারলেন না। তবে অদ্ভুতভাবে মায়া’র কথা ভাবলেন এবং সন্তানের মুখ দ্যাখতে পেলেন। কিন্তু পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবতে সক্ষম হলেন– যে, কারো জীবনই কারো বাঁচা-মরার উপর নির্ভরশীল নয়। জীবন থেমে থাকার বিষয় না।

আত্মহত্যার সমস্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে– আত্মহত্যার ঠিক আগের মুহূর্তে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিলেন– ‘‘প্রতিটি আত্মহত্যাই একেকটা হত্যা এবং এই প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ডের পেছনে সমাজের অনৈতিকতা, অরাজকতা, অনিয়ম ও সংঘবদ্ধ দূর্নীতিই দায়ী, ফলে এই দেশে যত আত্মহত্যা সংগঠিত হয়েছে এবং আমার আত্মহত্যা তার প্রত্যেকটার জন্য নৈরাজ্যমূলক শাসন ব্যবস্থায়ই দায়ী।’’

ওশান প্যারেডাইসের ম্যানেজার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন মাঝরাতে, পরনে তার নাইট গাউন, তখনো তার হাতে লেগে আছে কনডমের গন্ধ; তিনি হোটেল বয়দের ডেকে বললেন ছয়শ’ ছেষট্টি নাম্বার রুমে কোন গেস্ট; একজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি, তারে তোরা রুম ভাড়া দিছস কোন সাহসে? হোটেলের বুকিং ম্যানেজার– বললেন – স্যার, কোথাও ভুল হচ্ছে। আমরা তাকে গত তিন বছর ধরে চিনি এবং তিনি একজন অমায়িক ভদ্রলোক, মূলত একজন এনজিওকর্মী।

- রাখ তোর এনজিওকর্মী; শুয়োর।

জনাব তোরাব আলী সিকদার আত্মহত্যা করেন, সেই রাতে– এবং সেই রাতে সমুদ্রের দিক থেকে ঢেউয়ের শব্দের সাথে একটা কু-ডাক পাখিও ডেকেছিল। পরদিন– পত্রিকায় খবর ছাপা হলো – ‘‘শহরের ফোর স্টার হোটেলের বাথরুমে একজন এনজিওকর্মীর গুলিবিদ্ধ লাশ, আত্মহত্যা বলে ধারণা,’’ কিন্তু আত্মহত্যা করার জন্য তোরাব আলী সিকদার পিস্তল নিয়ে যাননি, এমনকি তিনি জীবনে কোনোদিন অস্ত্রের ব্যবহার তো দূরে, দেখেনওনি। তিনি মূলত শিরায় ফাঁকা ইনজেকট করে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। তোরাব আলী সিকদারের ফরেনসিক রিপোর্ট কেউ পাননি। তার পরিবারও না। তবে– অনেকেই বলে থাকেন যে, সে রাতে হোটেল ওশান প্যারাডাইসের আশেপাশে শান্তিরক্ষাকারী বাহিনীর একটা কালো কাঁচের গাড়ি হুইসেল বাজিয়েছিল। এবং সেদিন পত্রিকায় আত্মহত্যা বিষয়ক সংবাদের পাশে এক কলামের ছোট্ট একটা রিপোর্ট ও ছাপা হয়েছিল – ‘‘শান্তিরক্ষাকারী বাহিনীর সাথে বন্দুকযুদ্ধে একজন মাদক কারবারী নিহত।’’


শাহ মোহাম্মদ দীদার পেশায় একজন উন্নয়ন সংগঠক। প্রবীণদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন তিনি। জেরিয়াট্রিক হেলথ, প্রবীণবান্ধব সমাজ ব্যবস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।



52
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail