• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৭ রাত

বিশ্বকাপ ও পতাকার লড়াইয়ে ঢাকা

  • প্রকাশিত ০১:০৬ দুপুর জুলাই ১, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট ০৩:৫৬ বিকেল জুলাই ১, ২০১৮
unnamed-1530266450041-1530428593409.jpg
একটি পতাকা যাকে নিজের ভাবা যায়। ছবি: সৈয়দ জাকির হোসাইন

ক্ষিণ এশিয়দের প্রয়োজন এক ভিন্ন রাষ্ট্রের -- এক জয়ী রাষ্ট্রের 

কোনো বিদেশী নাগরিক যদি এই মুহূর্তে ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখতে আসেন, তবে তার মনে হতেই পারে যে, ভুল করে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলে চলে এলেন নাতো? 

কেবল এই দু’টি দেশেরই নানান আকৃতির, নানান মাপের, লক্ষ লক্ষ পতাকা উড়ছে এখন এই ঢাকার আকাশে। 

বাংলাদেশে আপনাকে সু-স্বাগতম, যেখানে স্বদেশের পতাকা তেমন একটা উড়ানো হয় না, যেখানে স্বদেশকে সমর্থনের বিষয়টি এতো ফলাও করে ঘোষণা করা হয় না, দেখা মেলে না নিজ মাতৃভূমির প্রতি আবেগের এমন উম্মাদনাময় বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু বুঝতে হবে, এখন তো সময় বিশ্বকাপের।   

একদল সমর্থক তাদের পতাকা নিয়ে জটলা করবে, নিজ দলের জন্য হর্ষধ্বনি করবে, অবশ্যই এটা ব্যক্তিত্বের এক সরল বহিঃপ্রকাশ।   

কিন্তু বাংলাদেশ সহ অন্যান্য দরিদ্র দেশে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, এই আবেগ অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছেছে আর এদের উত্তেজনার পারদ মাত্রারিক্ত!    

এটা একেবারেই স্পষ্ট যে, বিশ্বকাপ জয় তাদের দৈনন্দিন জীবনের সর্বশ্রেষ্ট অর্জনের মধ্যে একটি, এ খেলা শুধু খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর আবেদন অন্য সবকিছুকে ছাপিয়ে যায়, বাকি সবকিছুকে ম্লান করে দেয়।

সম্ভবত একারণেই এই আবেগের প্রতি আরও বেশী মনোযোগী হয়ে বিষয়গুলো বুঝে নেয়া প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে।  

খেলাধুলা মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তি, পশু শিকারের স্মৃতিকে উষ্কে দেয়, কিন্তু বিষয়টা কেমন ঠেকে যখন আমরা এমন কারও জন্য গলা ফাঁটাতে ব্যস্ত যারা আমাদের নিজ গোত্রের বা স্বজাতির কেউ নন?  

কেবল একটি দেশের প্রতি আনুগত্যের দিন কি তবে শেষ? 

একটা সময় ছিলো যখন মানুষ একটি দেশে পুরো জীবন কাটিয়ে দিতো, তাও অত্যন্ত সুখে-শান্তিতে। ভ্রমণ ছিলো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য আর তারচেয়েও দুরূহ ছিলো বিদেশ বিভূঁইয়ে নিজের জীবিকা অর্জন করে টিকে থাকার লড়াই।  

সাম্প্রতিক যুগের মতো সে যুগে মানুষ এভাবে অভিপ্রয়াণের সাথে পরিচিত ছিলো না, না ছিলো এতোটা উন্নত প্রযুক্তি। টেলিভিশন, কম্পিউটার বা মুঠোফোনের ছোট্ট পর্দার মাঝে পুরো জগতের দূরত্বটাও যেনো হারিয়ে গেছে। বাস্তবিক জগতে পৃথক হলেও ‘ভার্চুয়াল’ জগতে সব মিলেমিশে একাকার। এমতবস্থায় কেবল মাত্র একটি দেশের প্রতি আনুগত্য রেখে চলা কি আদতেও সম্ভব? 

গ্লোবালাইজেশনের এই যুগে, একটি দেশ কোথায় শেষ হয়েছে আর শুরুটাই বা কোথায় তা পরিষ্কার করে নির্ণয় করা খুব কঠিন। এমনকি, আদৌ কোনো একটি দেশের পরিচয়ের স্বাতন্ত্র আছে কি না, এমন প্রশ্নেও অবাক হবার কিছু নেই। তবে সমস্যাটা হচ্ছে, এই গ্লোবালাইজেশন যখন আমাদের চরম বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেসময়ে সবাই একমাত্রায় গ্লোবালাইজড হচ্ছেন না!  

কিছু অংশ এই প্রক্রিয়াটিকে পরিচালনা করছেন আর বাকিরা কেবল তা অনুসরণেই ব্যস্ত। অনেক ক্ষেত্রে এই অনুসরণকারীরা কেবল আংশিক অনুকরণেই তৃপ্ত। এটি একটি একতরফা প্রক্রিয়া; যার একদিকে কিছু মানুষ নিজের অস্তিত্ব, শেকড় আর আত্মপরিচয় থেকে একচুল নড়তেও নারাজ, আর বাকিরা মানসিক নিরাপত্তার সন্ধানে ও অস্তিত্ব সংকট থেকে উত্তরণের চেষ্টায় একের পর এক আত্মপরিচয়ে নিজেকে অভিযোজিত করতে ব্যস্ত।  

জাতির সম্পদ ও দারিদ্র্য

এক সময়ের জনপ্রিয় ১ম বিশ্ব, ২য় বিশ্ব আর ৩য় বিশ্বের বিভাজন ধারণা জাতি ও রাষ্ট্রের সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্বৃদ্ধির বাস্তবচিত্র প্রকাশ করতো।  

সেই ধনী, মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র রাষ্ট্রেরা স্ব-স্ব অবস্থানেই আটকে আছে। সুতরাং, এটা জলের মতোই পরিষ্কার যে এক দেশের সাথে অন্য দেশের বৈষম্য রয়েছে। বিশেষ করে বলতে গেলে, সুযোগ সুবিধাগুলো বিশ্ব বা রাষ্ট্র দু’ক্ষেত্রেই কিছু নির্দিষ্ট অংশের মধ্যেই কুক্ষিগত থেকে যায়।   

আর এই ছোট ও নিম্নবিত্তের দেশগুলোর ভেতরেই ভিন্ন নতুন পতাকার পরিচয় বহন করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। অপরদিকে, ধনী রাষ্ট্রগুলোর মাঝে তা প্রায় অনুপস্থিত।  

যদিও এশিয়ার কিছু দেশও এই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছে, তবে জাপান বা কোরিয়ান পতাকা ঢাকায় নজরে আসবে না। কারণ, এই আনুগত্য এলাকাপ্রীতি বা ভুখন্ডের নৈকট্যের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেনি।  

এমনকি স্বদেশপ্রেমের জন্য সুনাম কুড়ানো ভারত, যারা অন্য দেশকে “দুসরা দেশ” বলতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করে, তাদের অবস্থাটাও প্রায় একই রকম, কারণ আবেগ অত্যন্ত প্রখর এবং গুরুত্ববহ। প্রতিকী পতাকার সেই রাষ্ট্রের প্রতি এই আনুগত্য স্বদেশের মতোই প্রবল আর ভালোবাসা অফুরন্ত!   

সমর্থকরা চট করেই বলে দিতে পারেন যে এটা কেবলই নির্মল আনন্দের খোড়াক, এর সাথে রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের কোনো সংশ্রব নেই। কথা টা মিথ্যা নয় সত্য, তবে পুরোপুরি সত্যও নয়, আংশিক সত্য!

ধরে নিন যে পতাকাগুলো স্বদর্পে উড়ছে, তা যদি ভারত বা পাকিস্তানের , তবে জনসাধারণ এবং সরকারের প্রতিক্রিয়াটা কেমন হতো?

জনমনে বিরাজ করে ‘জয়ী রাষ্ট্র’ না পাবার শূন্যতা 

এমন প্রপঞ্চ ইউরোপিয় দেশগুলোয় দেখতে পাবেন না। পেলেও ৩য় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোর মতো এতোটা প্রবলভাবে নয়।

আজ যখন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট অনেক দেশের অভিবাসী ও পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাকে সমর্থন করছে, চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধে জড়াচ্ছে , এমনকি ইউরোপিয়ো ইউনিয়নও এধরনের আচরণ করছে, তখন একদেশে ভিন্ন কোনো দেশের পতাকা ওড়াবার সুযোগটা কোথায় থাকে? 

শত্রুর পতাকা ওড়ানো যাবে না, এটাই চূড়ান্ত। শত্রু চিহ্নীত করতে দ্বিধা থাকতে পারে, কিন্তু কঠোরভাবে কিছু নিয়মাবলী আরোপ করা প্রয়োজন। অন্যরাষ্ট্রের পতাকাকে আপন করবার ইচ্ছা, সে যে দেশেরই হোক না কেনো, যারই প্রতিনিধিত্ব করুক না কেনো, এমন ইচ্ছা উন্নত কোনো দেশে দেখতে পাবেন না। আসলে এই ইচ্ছাটাই অপ্রয়োজনীয়।

যদি চীনে কেউ অন্য দেশের পতাকা উড়াতো, তবে তাদেরকে জেলে বন্দী করা হতো বা তার চেয়েও কঠোর কোনো শাস্তি দেয়া হতো।

কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অংশ স্বরূপ বাংলাদেশও একটি ভিন্ন রাষ্ট্র চায়, একটি জয়ী রাষ্ট্র।

সে রাষ্ট্র আমাদের ভৌগলিক এলাকার অংশ নয় এবং এই রাষ্ট্রের উপর কোনো আস্থা করা যায় না, এদের নেই কোনো সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়। এদের কেবল একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় আছে, সে পরিচয় তারা জয়ী রাষ্ট্রের! 

পৃথিবীতে বিজয়ের স্বাদ্গ্রহণ দুষ্কর, তাই প্রত্যেকেই জয়ীদের কাতারে দাঁড়াতে চায়। আর জয়ী হবার জন্য পূর্ণ আবেগ দিয়ে লড়াই চালিয়ে যায়।

আপাত দৃষ্টিতে এই পতাকাগুলো কোনো ক্ষতি করছে না। তবে স্রোতের নিচের জল মানুষের আকাঙ্খাকে প্রকাশ করছে, না পাবার কাতরতাকে প্রকাশ করছে, আর সে আকাঙ্খাগুলোর প্রতি আমাদের বিশেষ মনোযোগী হতে হবে।