• শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৩ রাত

ক্ষমতাসীনের বিরোধিতা করার প্রবণতা এখন পুরাণে

  • প্রকাশিত ১১:৫৮ রাত জুলাই ১, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট ১২:২৪ দুপুর জুলাই ৩, ২০১৮
pm-sheikh-hasina
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: রয়টার্স

ক্ষমতাসীনের বিরোধিতা নয়, ধারাবাহিকতাই আমাদের উন্নয়নের পথে চালিত করতে পারে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ক্ষমতাসীনের বিরোধিতা’ করা দীর্ঘদিনের পুরোনো আর প্রভাবশালী এক প্রবণতা। সহজ ভাবে বলা যায়, প্রতি পাঁচ বছর পর পর ক্ষমতাসীন দলকে ভোটের শক্তির কাছে কুপোকাত করে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দেন, তা সে দল যতই পরিবর্তন আনবার প্রতিশ্রুতি করুন না কেনো, আর পুরো পদ্ধতিটা সংষ্কারের অঙ্গীকার দিন না কেনো! এই ‘বিরোধিতা’ চর্চার শেকড়টা নিহিত আরও উন্নত রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে। বিশেষত উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে এটি মানানসই, কেননা এদের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি এবং রাজনীতির সংস্কৃতি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত।  

তবে এই সুসংবদ্ধ প্রবণতা একটি সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ, এই প্রক্রিয়ার বিপরীতে কিছু দেশের জনগণ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে একই রাজনৈতিক দলকে একাধিকবার সুযোগ দেয়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এটি লক্ষ্য করা যায়। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা যায়, গত এক দশকের রাজনৈতিক চিত্র সেই ভিন্ন প্রক্রিয়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। 

সুনির্দিষ্টভাবে, এই বিশেষজ্ঞ আর স্ব-ঘোষিত পন্ডিতরা ‘ক্ষমতাধারীদের বিরোধিতা’র প্রবণতাকে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে মেলাবার যে চেষ্টা করেন, তাকে ভুল প্রমাণ করতে তিনটি কারণ আছে বলে আমি মনে করি।

প্রথমত, গত দুই বছরের নির্ভরযোগ্য সমস্ত জরিপে প্রমাণ পাওয়া যায় যে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং জননেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গ্রহণযোগ্যতা তাদের প্রধান বিরোধী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও এর নেতা খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের থেকে অনেক বেশি। একই জরিপে দেখা গেছে ক্রমবর্ধমানভাবে মানুষ মতামত দিয়েছে, এই সরকারের আমলে দেশ উন্নয়নের সঠিক ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে।

২০১৭ সালের মার্চে ইনডিপেন্ডেন্ট-আরডিসি, একই বছরের এপ্রিল মাসে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকেশন ইনিস্টিটিউট (আইআরআই), আর ২০১৬ সালের অক্টোবরে করা ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) এর করা ভিন্ন ভিন্ন জরিপের প্রত্যেকটিতেই উঠে এসেছে প্রায় এমন তথ্য, যেখানে আওয়ামী লীগ ও এর দলপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি ও এর নেতৃত্বদানকারী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের থেকে যথেষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার বিচারে।

ইনডিপেন্ডেন্ট-আরডিসি’র জরিপে উত্তরদাতাদের ৭২.৩ শতাংশ মতামত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভালো’ ভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। বিপরীতে মাত্র ২৬.৬ শতাংশ উত্তরদাতা বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার উপর আস্থা রাখতে আগ্রহী। একই জরিপে ৫৬.৯% উত্তরদাতা আওয়ামী লীগের পক্ষে ‘ভালো’ মন্তব্য করেছেন, অন্যদিকে মাত্র ১৮.৫% ‘ভালো’ বলেছেন বিএনপি’কে। তাদেরকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছে, সেই মুহূর্তেই যদি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তবে কোন দলের সাথে থাকবেন। এমন প্রশ্নে মাত্র ৩.৫% বিএনপি সমর্থনের বিপরীতে ৩৬.১% উত্তরদাতাই আস্থা রেখেছেন আওয়ামী লীগের উপরে। (ইনডিপেন্ডেন্ট; ৯ জুন, ২০১৭) 

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের করা জরিপে বলছে, পূর্ববর্তী জরিপের চেয়ে ১২% বৃদ্ধি পেয়ে ৭০% উত্তরদাতাই মতামত দিয়েছেন যে দেশ সঠিক দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আর ঐ দিনেই তাৎক্ষণিক নির্বাচন প্রসঙ্গে ৩৮% উত্তরদাতা আওয়ামী লীগ ও মাত্র ৫% উত্তরদাতা বিএনপি’র পক্ষে সমর্থন দেন।

২০১৭ সালের এপ্রিলে করা আইআরআই’র আরেক জরিপে প্রকাশ করা হয়েছে ৭৫% বাংলাদেশী মনে করেন দেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৫ সালের নভেম্বরে পাওয়া ৭৭%, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারির জরিপে পাওয়া ৮০%, আর ২০১৭ সালের এই জরিপে ৮৩%; গ্রহণযোগ্যতার এই ক্রমবর্ধমান হার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই কথা বলছে।

দ্বিতীয়ত, বিগত দুই বছরে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় প্রত্যেকটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা কেবল জয়ীই হননি, তাদের ভোটের পরিমাণও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয় লাভ করেছেন। যদিও নির্বাচন বিষয়ে কিছু অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিলো, তবে পরিসংখ্যান বিবেচনায় দেখা গেছে এতে ফলাফলের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারতো না। 

২০১৬ সালের ডিসেম্বরের প্রথমদিকে অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী সেলিনা হায়াত আইভি নিকটতম বিএনপি প্রতিদ্বন্দ্বীর থেকে ৮০ হাজার বেশি ভোটে জয়লাভ করেন। সমসাময়িক রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির কাছে পরাজিত হলেও বেশিরভাগ কাউন্সিলর পদে জয়লাভ করে। 

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সংসদীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী ৫০ হাজার ভোটে জয় লাভ করে। যে নির্বাচনে কোনো অনিয়ম বা সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি বা অভিযোগও ওঠেনি। গাইবান্দা জেলার সুন্দরগঞ্জে জাতীয় পার্টি প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও এর ব্যবধান ছিলো মাত্র ১০ হাজার ভোট।

গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে; আঞ্চলিক পর্যায়ে দলের ঐক্য আর সাংগঠনিক দক্ষতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের এ জয়ের মূলমন্ত্র হলো সঠিক প্রার্থী মনোনয়ন, যারা তরুন ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রতিধ্বনিত করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিএনপি, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান থেকে আওয়ামী লীগ এবং এর দলনেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধিক জনপ্রিয়তা। এর সাথেই আমার তৃতীয় ও শেষ কারণটিও আলোচনায় এসে যায়।

সাধারণ জনগণের মধ্যে এই দলটি সম্পর্কে নেতিবাচকের চেয়ে ইতিবাচক ধারণা ক্রমশ বর্ধমান যার প্রমাণ এই বিজ্ঞানসম্মত গবেষণাগুলো। ২০১৭ সালে আইআরআই’র ‘ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন’ (এফজিডি) পদ্ধতিতে করা গবেষণা ২০১৮ এপ্রিলে প্রকাশ পেলে তা থেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে খুব চিত্তাকর্ষক কিছু বিষয় উঠে এসেছে।

এই এফজিডি রিপোর্ট বলছে, অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীই স্বাধীনতা আন্দোলনে ও বর্তমান উন্নয়নকে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কে ইতিবাচক মন্তব্য ও প্রশংসা করেছেন। এই আলোচনা থেকে বলা হয়েছে বর্তমান সরকারী দল, আওয়ামী লীগ সাম্প্রতিক এ উন্নয়নে অবদান রাখা ও তাদের নেত্রীর জনপ্রিয়তার কারণেই শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে ২০১৮ জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে।

অপরপক্ষে, বিএনপি, এর চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া এবং জামাত-এ-ইসলাম সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো নেতিবাচক। এর কারণ এই দু’টি দলের “সহিংসতা, একগুঁয়েমি এবং ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতি সমর্থন।” প্রত্যাখ্যানের কারণ হিসেবে আলোচনায় আলোকপাত করা হয়েছে তারেক রহমানের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির উপর।  

এটা সহজেই ধারণা করা যায় যে, আদালতে খালেদা জিয়ার বিপক্ষে রায়ের ফলে ও তারেক রহমানকে বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত প্রধান করার কারণে এই গ্রহণযোগ্যতা আরও তলানীতে চলে গেছে। যার আলামত পাওয়া গেছে গত দুই মেয়র নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগের একপেশে জয়ে। আর অদূর ভবিতব্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা শেখ হাসিনা ও জনপ্রিয়তাহীন তারেক রহমানের মধ্যে নিজের পছন্দকে বেছে নিতে খুব একটা বেগ পেতে হবে না জনসাধারণের।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের কাছে গুরুত্ব আরোপ করে বলবার মতো বিষয় রয়েছে; এর মধ্যে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কেননা অতীত ইতিহাস বলে এদেশে সরকার পরিবর্তন ঘটলে আগের সরকারের রেখে যাওয়া উন্নয়ন কার্যক্রম স্থগিত করা হয়, কখনো আবার তা একেবারে বন্ধও হয়ে যায়।  

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ১৯৯৬-২০০১ এর আওয়ামী লীগের আমলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া হাজার খানেক কমিউনিটি ক্লিনিক ২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। কেবলমাত্র রাজনৈতিক কারণেই শত শত কোটি টাকা নষ্ট করা হয়। তারমানে এটি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে যে, সিঙ্গাপুর বা মালেশিয়ার মতো আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পেতে জনগণ একটি দলকে ধারাবাহিকভাবে একাধিকবার সরকারে থাকবার সুযোগ দিতে প্রস্তুত।  

অতঃপর, পরিসমাপ্তিতে আমি বলতেই পারি যে ‘ধারাবাহিকতা’য় বিশ্বাস আর ‘ক্ষমতাসীনের বিরোধীতা’র নীতিকে বাতিল করেই নতুন দিনের সূচনার পথে পা বাড়িয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতি।