• শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:২৩ রাত

কোটা আন্দোলন শত আশার উৎস

  • প্রকাশিত ০৫:১৯ সন্ধ্যা জুলাই ১২, ২০১৮
mahmud-hossain-opu-mho6616-1531394218238.jpg
কোটা সংস্কার আন্দোলন। ছবি: মাহমুদ হোসাইন অপু

দমন হলেও কয়লার নিচে আগুনের মতন সাংগঠনিক কাঠামোগুলো রয়ে যাবে। সেখানেই হয়তো বেঁচে থাকবে আমদের তৃতীয় শক্তির গণআন্দোলনের স্বপ্ন আর একতাবদ্ধ জনসমাজের আকাঙ্ক্ষা। সেই আশায় আমরা হয়তো কিছুটা বুক বাঁধতেই পারি।  


আমি রাজনৈতিকভাবে আশাবাদী মানুষ। আমার রাজনৈতিক বয়ঃসন্ধি ঘটে শাহবাগ আন্দোলনের সময়ে। কাজেই নির্বাচনী রাজনীতির বেড়াজালে শাহবাগের গণমুখী জোয়ার আটকে পড়লে বাংলাদেশের শত তরুণের মতন আমিও অত্যন্ত বেদনাহত হয়েছিলাম। তারপর থেকে আমি এবং আমার মতন আরও অনেক তরুণ রাজনৈতিক আশাবাদীরা বারংবার বাংলাদেশে তৃতীয় শক্তির গণআন্দোলন গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছে, সংস্কার এবং পরিবর্তনের স্লোগান তুলেছে এবং নিজেদের দাবি আদায়ের জন্যে পথে নেমেছে। তবে এর অধিকাংশই ঠিক তৃতীয় শক্তির গণআন্দোলন হয়ে উঠতে পারেনি। তাদের নির্দিষ্ট দাবি আদায় করে ফুরিয়ে গিয়েছে অথবা সরকারী দমন পিড়নের কাছে ক্ষান্ত দিয়েছে। 

সেই হতাশার বুক চিরে বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের আন্দোলন যে এতো তুমুল জনসমর্থন পেলো, তাতে স্বভাবতই আমরা তৃতীয় শক্তির স্বপ্ন নিয়ে আবারও দারুণ আশাবাদী হয়ে উঠেছি। যদি বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি বলতে আমরা কোন রাজনৈতিক দল না বুঝে বরং দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা গণমানুষের শক্তিকে বুঝি-তাহলে কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে তারই একটি প্রতিরূপ হিসেবে দেখতে কারও সমস্যা হবার কথা নয়। এই আন্দোলনে এখনো পর্যন্ত ঢাকা শহরের বুদ্ধিজীবিরা যেমন মানবন্ধন করেছেন, তেমনি গ্রামেগঞ্জের আলেমরাও মিছিল করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে, খুলনার বিএল কলেজেও হয়েছে। কাজেই ২০১৩ সালে গণআন্দোলনকে প্রতিহত ও বিভাজিত করতে শহুরে বনাম গ্রাম্য, প্রগতিশীল বনাম রক্ষণশীল, সেক্যুলার বনাম ধর্মভীরু-ইত্যাদি যেসব মেকি ঘায়ের বীজ বাংলাদেশের জনসমাজে বপন করা হয়েছিলো, এই আন্দোলনের মাধ্যমে তার কিছুটা উপশম হয়তো হচ্ছে। হয়তো জাতীয় স্বার্থের এই আন্দোলনে সমাজের বিভিন্ন আদর্শের ছাত্ররা একসাথে কাজ করতে শিখছে। আমাদের জন্যে সেটি দারুণ আশার একটি ব্যাপার। আরেকটি আশার ব্যাপার হলো যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় নেতার প্রতি এই আন্দোলন দারুণ শ্রদ্ধাশীল। কিছু অবিমৃষ্যকারী রেগে যাওয়া ছাত্রদের “আমি রাজাকার” বলে প্রতিবাদ করবার ভাষাকে স্বাধীনতাবিরোধী বলে দাবি করলেও বঙ্গবন্ধুর বাংলার স্বপ্নকে নিজেদের স্লোগানে পুঁতে দিয়ে এই আন্দোলন স্বাধীনতাবিরোধীতার দাবিটিকে বেশ শক্তভাবেই প্রতিহত করে এসেছে। এটি বাংলাদেশের সৃষ্টির প্রশ্নে বিভক্ত নয়, বরং ভবিষ্যতের পথে সংস্কারে বিশ্বাসী। এটি আমাদের জনসমাজের আলোচনার জন্যে নতুন একটি মাত্রা। 

আরেকটি নতুন দিক হলো, পূর্বের এককেন্দ্রিকতা ও বীরপূজার আদল ভেঙ্গে এ আন্দোনলটিতে পটু সংগঠকদের আদলে ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্রীয় কমিটি এবং এবং জেলা ও প্রতিষ্ঠানওয়ারী কমিটি গড়ে তোলা হয়েছে। গণআন্দোলনের গবেষণা ও ইতিহাস অনুযায়ী এই ধরণের বিকেন্দ্রীভূত ফেডারেটেড সংগঠন কাঠামোতে গড়ে তোলা আন্দোলন হয় সবচেয়ে মজবুত। যেহেতু একজন কেন্দ্রীয় মুখের বদলে একাধিক সংস্কারবাদী নেতাকে সামনে নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটি এগিয়েছে, সেহেতু কেবল একজনকে রাজনৈতিকভাবে আক্রমণ করে বা কয়েকজনকে জেলে পুরে এই আন্দোলনকে থামাতে পারেনি। কেন্দ্রীয় কমিটির যারা হামলা থেকে বেঁচে এসেছেন তারা স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাবার ঘোষণা দিতে পেরেছেন। একাধিক স্থানে বিকেন্দ্রীভূত ভাবে কমিটি গড়ে তুলবার কারণে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দ্বারা আন্দোলনকে চুরি করে ফেলাও কঠিন হয়ে পড়েছে কেননা একই সাথে এতগুলো কমিটি চুরি করা সাংগঠিকভাবেই বেশ দুরূহ। 

আরো একটি চমৎকার যে কৌশলটি এই আন্দোলন গ্রহণ করেছে সেটি হলো সরাসরি সরকারবিরোধী অবস্থানে না যাওয়া। শুরুর থেকেই আন্দোলনটি সরকারদলীয় চিহ্ন, প্রতীক এবং স্লোগান ব্যবহার করেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার প্রতি শ্রদ্ধাকেও নানান জায়গায় ব্যবহার করেছে। বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির কাঠামো এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে সরকারবিরোধী অবস্থানে যেতে মানুষ শঙ্কা বোধ করে, কেননা তারা উন্নয়নবিরোধী বা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে চাননা--যে কারণে রামপাল বিরোধী আন্দোলনকে অনেকেই এড়িয়ে গেছেন। কোটা সংস্কারের আন্দোলন সরকারবিরোধী অবস্থান এড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে সরকার বিরোধী না হয়েও সংস্কারপন্থী হবার সুযোগ দিয়েছে যেটি কিনা অধিকাংশ মানুষের জন্যে একটি সহনীয় রাজনৈতিক বিনিয়োগ। এই কৌশলটি তাদেরকে শুরুর থেকেই আন্দোলনে লোক জমাতে সাহায্য করেছে। যদিও সরকারী দমন পিড়নের মুখে এই সরকার পক্ষীয় অবস্থানটিই তাদের নেতাদের মুক্ত করবার আন্দোলনে সবচেয়ে বড়ো বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে এখন, তবে শুরুতে এই কৌশলে না আগালে সম্ভবত এতোদূর তারা আসতেই পারতো না। 

অনেকে বলছেন যে কেবল কোটার সংস্কার করে গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য বা কর্মসংস্থান সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। সেটি অনেকাংশে সত্যি হলেও আমি মনে করি এই প্রতীকপ্রবণতাটি খুব প্রয়োজনীয় একটি প্রথম ধাপ। খুব সহজসরল ভাবে এই আন্দোলনটি তাদের দাবিকে মানুষের পেটের দায়ের সাথে সংযুক্ত করেছে। হাজার ছাত্রছাত্রী অনুভব করেছে যে কোটা সংস্কার না হলে তাদের চাকরি হবেনা। রামপাল আন্দোলনের সময়ে আমরা এইভাবে করে জনগণকে তাদের ওপর সরাসরি ক্ষতি দেখাতে পারেনি। কিন্তু এই কোটা সংস্কারের আন্দোলন, এবং তার আগে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন তা করতে পেরেছিলো। তবে এটা ঠিক যে, খুব ছোট একটি একমুখী দাবি নিয়ে দাড়ানোর কারণে ভ্যাট আন্দোলনের মতন এটিরও দাবি পূরণের সাথে সাথে গুটিয়ে যাবার ভয় রয়েছে। কিন্তু ভ্যাট বাতিল করবার মতন করে কোটা বাতিল করে দেয়া খুব একটা সহজ কাজ নয়। প্রধানমন্ত্রীর কোটা বাতিলের ঘোষণার পরেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী এর মাঝেই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পরিবর্তন আসবে না বলে কোটাধারীদের আস্বস্ত করেছেন। কোটা বাতিল করার সাথে সরকারের অনেক শুভাকাঙ্খির স্বার্থ সরাসরি জড়িত। এটি কেবলমাত্র সামান্য একটি রাজস্ব উৎস বাতিলের মতন সমস্যা নয়, বরং ভোটার ও ডোনার হারানোর একটি সমস্যা। ।

সেই সমস্যাকে যদি অন্য কোনভাবে সরকারপক্ষ সমাধান করতে না পারে, তবে তাদের একমাত্র বিকল্প হবে এই আন্দোলনকে দমন পীড়ন করতে থাকা। কিন্তু এর বিকেন্দ্রীকৃত গঠন কাঠামোর কারণে সেটি সম্ভবত কঠিন হবে। বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা থাকায় একে পুরোপুরিভাবে রাজনৈতিকভাবে চুরি হয়ে যাবার দায়ও দেয়া হবে কঠিন। তার মানে এই নয় যে দমনটি একেবারেই সম্ভব নয়। তবে আমার বিশ্বাস হলো যে দমন হলেও কয়লার নিচে আগুনের মতন সাংগঠনিক কাঠামোগুলো রয়ে যাবে। 

সেখানেই হয়তো বেঁচে থাকবে আমদের তৃতীয় শক্তির গণআন্দোলনের স্বপ্ন আর একতাবদ্ধ জনসমাজের আকাঙ্ক্ষা। সেই আশায় আমরা হয়তো কিছুটা বুক বাঁধতেই পারি।  

অনুপম দেবাশীষ রায়, বিকল্প গণমাধ্যম মুক্তিফোরামের সম্পাদক।