• বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৬, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৭ দুপুর

বাংলাদেশে ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াড কেনো জরুরী?

  • প্রকাশিত ০৪:৫২ ভোর জুলাই ১৪, ২০১৮
bd-imo2018-1531522031741.jpg
বাংলাদেশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াডের অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াডে (আইএমও) অংশগ্রহণ করায় রোমানিয়ার ক্লুজ –নাপোকাতে অবস্থান করছে। এদেশেই আজ থেকে ৫৯ বছর আগে আইএমও প্রথম অনুষ্ঠিত হয়েছিলো।

কারও মনে প্রশ্ন আসতেই পারে যে, “বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াড এর বিশেষত্ব কি?” প্রথমত, বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াড তরুণদের দ্বারা পরিচালিত। এখানে যে শিক্ষক বা প্রশিক্ষকরা নিযুক্ত হোন, তারা কলাকৌশলে অত্যন্ত দক্ষ এবং তরুণ। আপনি এমন কাওকে এখানে দেখবেন না যারা ’৭০ দশকের ধ্যান ধারণায় শিক্ষালাভ করেছে। তাছাড়া এটি স্বেচ্ছাসেবামূলক সংগঠন। অহংবোধ তাড়িত লোকজনের জায়গা এটা নয়। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে এটি সবচেয়ে যোগ্যতর শিক্ষার্থীদেরকেই বাছাই করে। বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াড এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যাদের দেখলে আপনি বুঝবেন সামাজিক, শিক্ষায়তন বা রাজনৈতিক যে কোনো ক্ষেত্রেই পেটি-বুর্জোয়াদের হস্তক্ষেপ না থাকলে বাংলাদেশ কি কি অর্জন করতে সক্ষম।

বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াড অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছে। গতবছর ১১১টি দেশের মধ্যে ২৬ তম অবস্থান নিশ্চিত করেছিলো। কানাডা, জার্মানির মতো দেশকেও টপকে এই কীর্তি গড়েছে তারা। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উপরে বাংলাদেশ, উন্নয়নশীল দেশগুলোর শীর্ষে বাংলাদেশ,এমনকি উন্নত সুবিধাপ্রাপ্ত ইরান আর কাজাকিস্তানের পরে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর সবার উপরে বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, টানা দ্বিতীয়বারের মতো দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে সবেচেয়ে বেশি স্কোরকারী প্রতিযোগী বাংলাদেশের আসিফ এলাহী।

বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে চমৎকৃত হয়ে যুক্তরাজ্যের কোচ ড. জিওফ স্মিথ আমাকে গত বছর জিজ্ঞেসই করে বসেছিলো যে, “তোমরা এবছর আলাদাভাবে কি কি করেছো?” ভারতের কোচ, যিনি কয়েক বছর আগে আমার কথা শুনে ঠাট্টা করেছিলেন, কেননা আমি বলেছিলাম “আমরা একদিন ভারতকে হারিয়ে দেব!”, তখন তিনি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিলেন “বাংলাদেশ কোনোদিনও ভারতকে হারাতে পারবে না।“ গতবার তিনিও বলেছিলেন, “তোমরা শীর্ষে! তোমরা আমাদের অনেক উপরে!” একথা বলার সময় তিনি অবশ্য খুব বেশি অবাক ছিলেন না কেননা আরও ২ বছর আগেই তাদের আমরা হারিয়ে দিয়েছিলাম। আর গতবার বাংলাদেশ ১১১ পয়েন্ট অর্জন করেছিলো, ভারতের ছিলো ৯০ পয়েন্ট। দু’দেশের মাঝের দূরত্ব নেপালের মোট পয়েন্টের ৭গুণ! তুলনার সুবিধার্থে উল্লেখ করছি, সেবার নেপালের সংগ্রহ ছিলো ৩ পয়েন্ট, মিয়ানমার ১৫ আর পাকিস্তান ৫৮ পয়েন্ট। 

বাংলাদেশে যারা এই কৃতিত্বের কদর বুঝতে পারেন, তারা অবশ্যই হতবাক হয়ে যাবেন। প্রফেসর কায়কোবাদ, বাংলাদেশের অন্যতম শিক্ষাবীদ, এই খবর শুনে বাকরুদ্ধ ছিলেন। ওহাইয়ো স্টেট ইউনিভার্সিটির প্রফেসর সালেহ তানভীর যিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো একজন গণিতবীদ, একথা শুনে আবেগাপ্লুত হয়েছেন। প্রিসটনের প্রফেসর জাহিদ হাসান যিনি নোবেল পুরষ্কারের দাবিদার,শুনে পরমানন্দিত হয়েছেন। আমার নিজের পিতা বাইদুল আলম মজুমদার, একজন অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, তিনি কেঁদেই ফেললেন।

এথেকে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে অহংবোধ বাদ রেখে, গুণীর কদর করা হলে, বাংলাদেশ বিশ্বজয় করতে সক্ষম। এটা নিয়ে আর অবাক হবার কিছু নেই। ১৬ কোটি মানুষের মাঝে সে সম্ভাবনা গ্রথিত। বরং এটা ভেবে আশ্চর্য লাগতে পারে যে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এতো বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেও তাদের মেধার ঝলকে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। 

বাংলাদেশের এই শিক্ষার্থীরা কেনো এতোটা ভালো করছে আর অপেক্ষাকৃত সিনিয়র শিক্ষার্থীরা সেই মাত্রায় ভালো করতে পারছে না, এর কারণ আমাদের ত্রুটিপূর্ণ উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থা। যারা ম্যাথ-অলিম্পিয়াডে ভালো করছে তারা বেশিরভাগই উচ্চশিক্ষার জন্য এমআইটি বা ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজে চলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে তাদের ভেতর থেকে অনেকেই বিশ্বে বড় গবেষক, আবিষ্কারক বা শিক্ষাবীদ হিসেবে স্বনামধন্য হবেন। তাই বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ এই অলিম্পিয়াডের মতো স্বজনপ্রীতি, অহংবোধ ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে একটা সুস্থ শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, তবেই মেধাবীদের ঝলক এদেশেও আলোড়িত হবে।

আমি আমার স্বল্পোসাধ্যের মাঝে এই পদ্ধতি প্রয়োগের চেষ্টা করেছি। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীদের এনে ব্রাক ইউনিভার্সিটিতে ক্লাসরুমে সম্মিলিত করেছি, আর ফলাফলটা দারুণ। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে যা মানুষ আশাও করেনি, তেমন অর্জন তারা করে দেখিয়েছে। আমার ছাত্রদের মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব ওউয়াটারলু’তে ‘থিওরিটিকাল ফিজিক্স’ আর ‘মেশিন লার্নিং’ এর মতো বিষয়ে কাজ করছে। তারা সহ অন্যরা মিলে বাংলাদেশে প্রথম ‘ব্লকচেইন’ থিসিস করছে। এই স্বপ্রণোদিত ছাত্ররা প্রমাণ দিচ্ছে ম্যা-অলিম্পিয়াডের সংস্কৃতি কিভাবে উচ্চশিক্ষাতে প্রভাব ফেলবে। 

আমি আশা করি বিশ্বকাপ জ্বরের এই মাসেই একটু করে ম্যাথ অলিম্পিয়াডের সংস্কৃতির বীজ আমাদের মাঝে বুপ্ত হোক। আমাদের এবারের প্রতিনিধিদের কাঁধে ভর করে আছে তাদের পরিবার, প্রতিষ্ঠান আর দেশের অসংখ্য মানুষের প্রত্যাশা। আইএমও ‘র প্রশ্নপত্র অত্যন্ত জটিল। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররাও এর পূর্ণাঙ্গ উত্তর করতে পারেন না। গতবারের মতো ফলাফল করাটা কষ্টসাধ্য হবে।

আশা রাখছি জুলাইয়ের ১৩ তারিখ  যখন ফলাফল প্রকাশ করা হবে, তখন বিশ্বকাপের অংশগ্রহণকারী সেসকল দেশের পতাকা না উড়িয়ে, যাদের ভদেশে ভিসা পেতেও আমরা ভোগান্তি পোহাই, বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াডকে উৎসাহ দেবো। 


মাহবুব মজুমদার, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির প্রফেসর  ও বাংলাদেশ ম্যাথমেটিকাল অলিম্পিয়াডের জাতীয় কোচ।