• মঙ্গলবার, জুন ০২, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:২৮ রাত

দমননীতিতে বিএনপিও কম যায় না!

  • প্রকাশিত ০১:৩৭ দুপুর জুলাই ১৯, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট ০১:৩৯ দুপুর জুলাই ১৯, ২০১৮
khaleda-hasina-1531985849560.jpg
ফাইল ফটো

তারা ক্ষমতায় আসতে চায় দমন পীড়ন বন্ধের জন্যে নয়, বরং নিজেরা দমনকারী এবং পীড়নকারী হয়ে নিজেদের চিরতর ক্ষমতা পাকপোক্ত করতে।

দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় থাকার কারণে মুক্তিবাদী ধারণায় বিশ্বাসী মানুষেরা তাদের সমালোচনা করে যাচ্ছে নানান অনুদার নীতির কারণে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে লংঘন করা, দ্বিমতপোষণকারীদের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিতে না পারা, বিরোধীদলকে চুপ করিয়ে দেয়া আর সংবাদপত্রের লাগাম টেনে ধরবার জন্যে আমরা একের পর এক আঘাত করে এসেছি আওয়ামী লীগ সরকারের নীতির ওপর, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইসব সমালোচনা তাদের জন্যে নিতান্ত অপ্রাপ্য নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের খুব ক্ষুদ্র একটি ঘটনা আমাদের হতাশার সাথে মনে করে দিয়েছে এই অনুদার পন্থা বেছে নিতে বিএনপিও কোনদিন পিছপা হয়নি এবং একচ্ছত্র ক্ষমতা পেলে তারাও হয়তো একই কাজই করতো। সংবাদটি এমন: বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করায় আসাদুজ্জামান আসাদ ওরফে পংপং নামের এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে মালয়েশিয়ান পুলিশ। কিছুদিন আগে ফেইসবুক লাইভে এসে বিএনপির চেয়ারপারসন ও তার জ্যেষ্ঠপুত্রের নামে কিছু গালিগালাজ করলে এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিএনপির মালয়েশিয়া শাখার প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোহাম্মদ মামুন বিন আবদুল মান্নান বাদী হয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে কেপং থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। তার পরিপ্রেক্ষিতেই আসাদ পংপংকে গ্রেপ্তার করা হয়। 

আসাদ পংপং নামের এই লোকটি প্রায়ই ফেসবুকে এসে নানান আজেবাজে কথা বলে থাকেন। অধিকাংশ সময়েই তিনি থাকেন উত্তেজিত এবং তার লক্ষ্য থাকে বিতর্কিত কথা বলে অনেক মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তার বক্তব্যের কোন সারমর্ম আছে বা গভীর বিপ্লবী কোন চেতনা আছে-এমনটা আমি মনে করি না। তবে যা ভেবেই সে যা কিছুই বলে থাকুক না কেনো, সেইজন্যে তাকে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানোর কোন মানেই হয় না। কেউ যদি আপত্তিকর কিছু বলে, তবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তাকে আমলে নেবার কথা নয়। প্রয়োজনে বিএনপির পক্ষ থেকে তার কথা না শোনবার জন্যে একটি আবেদন করা যেতে পারে। অথচ কেবলমাত্র কিছু গালিগালাজ করার জন্যে পুলিশ দিয়ে গ্রেপ্তার করানো কেবলমাত্র অপ্রয়োজনীয় এবং অনাকাঙ্খিত নয়, বরং একই সাথে বিএনপির অনুদার ভাবাদর্শেরও পরিচায়ক। এই ঘটনার পিছনে যে কেবলমাত্র একজন ফেসবুকারকে পুলিশের কাছে নিয়ে যাবার ব্যাপারটি রয়েছে তেমনটি নয়, বরঞ্চ রয়েছে “আমার অপছন্দের কথা বললে তার বাকস্বাধীনতা নেই” এর ভয়ংকর অনুদার আদর্শ। এই আদর্শ দিয়েই দেশে কোটা আন্দোলনকারীদেরকে দমন করা হচ্ছে আর বিএনপির নেতাকর্মীদের জেলে পোরা হচ্ছে-অথচ সুযোগ পেয়ে সেই একই পথে বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজেরাও হাটা দিলো। 

মালয়েশিয়ার যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনে এই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে মিডিয়া প্রকাশ করেছে, মালয়েশিয়ার সেই কমিউনিকেশন এন্ড মাল্টিমিডিয়া এক্ট (১৯৯৮) সর্বজনবিদিত একটি দমনমূলক আইন যেটিকে কিনা রিপোর্টার্স উইদআউট বর্ডারস এর মতে প্রায়শই সরকারের দুর্নীতিকে প্রকাশ আটাকানোর কাজে বা সমালোচকদের দমন করবার কাজে ব্যবহার করা হয়। ব্রিটিশ মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল নাইনটিনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এই আইনের ২৩৩ ধারা ব্যবহার করে গত কয়েক বছরে ছাত্রনেতা খালিদ ইসমাতকে এবং গ্রাফিক আর্টিস্ট ফাহমি রেজাকে অভিযুক্ত করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো জহর রাজপরিবারের অসম্মান এবং মালয়েশিয়ান প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাককে ক্লাউন সাজিয়ে ছবি পোস্ট করবার। এই আইনের আবছা ও দ্ব্যর্থপূর্ণ শব্দ ব্যবহারের কারণে সরকারের ইচ্ছে হলেই যাকে ইচ্ছা তাকে এই আইনের আওতায় এনে বিপাকে ফেলা যায়। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন যে এই একই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে বাংলাদেশের কুখ্যাত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায়। শেখ পরিবারের অবমাননার জন্যে শাস্তি এবং রাজিব নাজাক অথবা জহর রাজপরিবারের অসম্মানের জন্যে শাস্তি কিন্তু এক সুতোয় গাথা। আর সেই ধারা ব্যবহার করে দেশের ভেতরে একের পর এক বিএনপির নেতাকর্মীকেই জেলে পোরা হচ্ছে দিনের পর দিন। অথচ সেই বিএনপিই কিনা সুযোগ বুঝে একই আইনের সুযোগ নিয়ে আসাদ পংপং-এর মতন একজন মানুষকে জেলে পুরে দিলো!

যখন আমরা দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যে, সরকারের সমালোচনার স্বাধীনতার জন্যে এবং মুক্তবাকের অধিকারের জন্যে কথা বলি, তখন প্রায়ই আমাদের দেখে মনে হয় যে আমরা বিএনপির সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছি কেননা আওয়ামী লীগ সরকারের দমননীতিতে ক্ষতিগ্রস্থ কারো উদাহরণ টানতে গেলে বিএনপির লোকজনের কথা চলেই আসে। কিন্তু সামান্য ক্ষমতার সুযোগে পেয়েই আসাদ পংপংকে এভাবে পুলিশের কাছে নিয়ে যাওয়া দেখেই আমাদের হুট করে মনে পড়ে যায় যে ক্ষমতায় থাকার সময় এই বিএনপিই ক্রসফায়ারের সূচনা করেছিলো, একুশে টিভি বন্ধ করিয়েছিলো আর হুমায়ূন আজাদের ওপর আক্রমণের সময় ঘাপটি মেরে ছিলো। এই ঘটনাটি আমাদের মুখে ২০০১-০৬ আমলের তেতো স্বাদটি ফিরিয়ে আনে যেটার থেকে মুক্তির জন্যে উদারপন্থীদের অনেকে ২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়েছিলো। এই ঘটনাটি আমাদের মনে সন্দেহ জাগায় যে আজ আওয়ামী লীগের মতন নিরংকুশ ক্ষমতার জায়গায় বিএনপি থাকলে তাদের রাষ্ট্রনীতিও সম্ভবত কিছুমাত্র কম দমনমূলক হতোনা।এই ঘটনাটি আমাদের ধারণা জাগায় যে দশ বছর ধরে নিজেরা দমন পীড়নের শিকার হবার পরেও বিএনপি দমন পীড়নের আদর্শ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে পারেনি। তারা ক্ষমতায় আসতে চায় দমন পীড়ন বন্ধের জন্যে নয়, বরং নিজেরা দমনকারী এবং পীড়নকারী হয়ে নিজেদের চিরতর ক্ষমতা পাকপোক্ত করতে।

এই নির্মমসত্যটুকু আমাদের জন্যে যতটুকু হতাশার, ততটুকু দিকনির্দেশক। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই দেশে দলীয় রাজনীতিতে পক্ষপাত করে আমাদের শেষতক কোন ফল হবেনা এবং দলের বদলে আমাদের অনড় থাকতে হবে আদর্শে। আমরা যদি আসলেই কেবলমাত্র সরকারবিরোধের জন্যে সরকারবিরোধ না করে বরং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যে রাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে থাকি তাহলে দলের প্রলোভনে আশান্বিত হয়ে আমাদের মুক্তমতের আন্দোলন ছেড়ে দিলে চলবে না। দলীয় রাজনীতিতে যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেনো, আমাদের একরোখা হয়ে উদারনৈতিক সমাজ গড়বার জন্যে কাজ করে যেতে হবে যাতে করে অবমাননার নাম করে অন্য কোন দমনমূলক আইনের কাছ থেকে টুকলিফাই করে আমাদের রাষ্ট্র আমাদের ওপর দমননীতি চাপিয়ে দিতে না পারে। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ, যে-ই মুক্তিবিরোধী নীতিতে হাটুক না কেন, তার প্রতিরোধ আর সমালোচনা আমাদের করতে হবে আর তাদের সাফ জানিয়ে দিতে হবে যে দমনমূলক ধারার থেকে সরে না আসলে আমাদের সমর্থন তারা কেউ পাবেনা, তার বিকল্প যতো বিচ্ছিরিই হোক না কেন। 


অনুপম দেবাশীষ রায় বিকল্প গণমাধ্যম মুক্তিফোরামের সম্পাদক। 


50
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail