• বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১৬, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:০৭ দুপুর

বন্ধুর জন্য প্রতিবাদ- এক উৎসবের নাম!

  • প্রকাশিত ১২:৫৪ দুপুর আগস্ট ৬, ২০১৮
বন্ধুর জন্য আন্দোলন-৩
বন্ধুর জন্য নিরাপদ সড়কের দাবিতে, আর অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আঠারোর প্রাণের মেলা। ছবি: ইবনুল আসেফ জাওয়াদ

কিছু বন্ধুত্ব  তৈরি হয় রাজপথে! বন্ধুত্ব হয় ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে-বজ্রকন্ঠে শ্লোগান দিতে দিতে- রাজপথ ধরে এগোতেই হঠাৎ হওয়া আক্রমণে। বন্ধুত্ব হয় বৃষ্টিতে ভিজে রোদে শুকিয়ে, কিম্বা  প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাঠ হয়ে আসা নিজের গলাটা ভুলে মিছিলে পাশে দাঁড়ানো আরেক প্রতিবাদি কণ্ঠকে পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে। এভাবেই নাম জানার আগেই কিছু বন্ধুত্ব শুরু হয় রাজপথ চিনেই। এই বন্ধু দিবস হোক রাজপথের এই বন্ধুদের জন্য।

বন্ধু। ছোট্ট এই শব্দটার অর্থ বোঝার আগেই আমরা বন্ধু পেয়ে যাই। এই বন্ধুত্বের শুরু ক্লাস রুমে কিম্বা খেলার মাঠে। আমরা জানতেও পারি না কখন, কিভাবে এই টিফিন ভাগ করে নেয়া থেকে শুরু  হওয়া এই বন্ধুত্ব একদিন জীবনের দুঃখসুখগুলো ভাগ করে নিতে শিখিয়ে ফেলে আমাদের। 

রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে যেমন ছোট্ট চারাগাছ গুলো ধীরেধীরে বেড়ে উঠে, বন্ধুর সাথে বন্ধুতাও ঠিক তেমন। রাগ-অভিমান-ভালোবাসা জরানো এই বন্ধুদের বন্ধুত্বকে নিয়েই বন্ধু দিবস। 

কিন্তু জানেন, কিছু বন্ধুত্ব আবার তৈরি হয় রাজপথে! বন্ধুত্ব হয় ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে-বজ্রকন্ঠে শ্লোগান দিতে দিতে- রাজপথ ধরে এগোতেই হঠাৎ হওয়া আক্রমণে। বন্ধুত্ব হয় বৃষ্টিতে ভিজে রোদে শুকিয়ে, কিম্বা  প্রচণ্ড তৃষ্ণায় কাঠ হয়ে আসা নিজের গলাটা ভুলে মিছিলে পাশে দাঁড়ানো আরেক প্রতিবাদি কণ্ঠকে পানির বোতলটা এগিয়ে দিয়ে। এভাবেই নাম জানার আগেই কিছু বন্ধুত্ব শুরু হয় রাজপথ চিনেই।

একটা গল্প বলি। বন্ধুত্বের গল্প। এই গল্পজুড়ে তাই শুধু বন্ধুত্বের জয়গান। এই গল্পজুড়ে কেবলই রক্ত লাল রাজপথ। এই গল্পে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো  স্কুল-কলেজ পড়ূয়া অকুতোভয় তাজা তাজা প্রাণ। 

আচ্ছা, আপনার খুব কাছের বন্ধু হঠাৎ আপনার চোখের সামনে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে অকালেই ঝরে পরে কি করবেন আপনি কি তখন? কাঁদবেন নিশ্চয়ই। তারপর?  

জি। এই গল্পটার শুরু যখন কিছু কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী বাড়ির ফেরার পথে চোখের সামনে নির্মমভাবে বাসচাপায় নিজের বন্ধুদের অকালে ঝরে যেতে দেখল। এরপর? এরপর আর রাজপথ ছাড়ে নি তারা। দাবি - বন্ধুদের হত্যার বিচার আর নিরাপদ সড়ক। 

শুরু হল বাংলাদেশের ইতিহাসে বন্ধুত্বের বিরল দৃষ্টান্তের এক নতুন অধ্যায়। এই অধ্যায় পরিবর্তন চায়। নিরাপদ সড়ক চায়। চায় প্রশাসনিক জবাবদিহিতা। এই দাবি আদায়ের আন্দোলনে সারা দেশ জুড়ে চলল শ্লোগান-প্রতিবাদ-মিছিল! 

সেদিন বন্ধু হারিয়ে হতবিহ্বল ওরাও বাস ভেঙ্গে ছিল কাঁদতে কাঁদতে। মূর্ছা যাচ্ছিল বারবার। বাস্তবতার সাথে তাদের প্রথম পরিচয়ে তারা কিংকর্তব্যবিমুঢ় না হয়ে সিদ্ধান্ত নিল পরিবর্তন আনার।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোও তাদের প্রতিবাদের কথা ছড়িয়ে পড়ল মুহুর্মুহু। তারপর তারা আমাদের শেখাল প্রতিবাদের নতুন ভাষা। যেই কারণে বন্ধু হারাল সেই কারণটাই উপড়ে ফেলবে গোড়া থেকে। শুরু হল রাস্তায় নেমে গাড়িগুলোর ফিটনেস আর লাইসেন্স পরীক্ষা। যা বড়রা পারলনা, ছোটছোট এই বন্ধুরা তাই করে দেখাল। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে সড়কে প্রথম এমার্জেন্সি লাইনটাও ওদের কৃতিত্ব। আপাতদৃষ্টিতে যেটাকে জনদুর্ভোগ মনে হচ্ছিল সেখানে জনগনের মুখের কৃতজ্ঞতার হাসিই বাতলে দিল ঠিক পথেই এগোচ্ছে তাদের প্রতিবাদ। মন্ত্রি কি সাধারণ জনগন- তাদের এই সুপরিকল্পিত অভিযানে বাদ পরে নি কেউই। এর মধ্যেও এলো বাধা। পুলিশের লাঠিচার্জে মাথা ফাটলো কারও, কেউ বা ট্রাকের চাপায় হল গুরুতর আহত। তবু তাদের এই অভিনব প্রতবাদে একচুলও বিচ্যুতি হয়নি। 

তারপর আক্রমণ হল। পুলিশের লাঠিচার্জ, আর ‘হেলমেট’ বাহিনি। খুব মারল সেদিন ওদের। রাবার বুলেটও ছুড়ল ওরা। আচ্ছা, মিরপুরে তো ক্রিকেটের স্টেডিয়াম তাহলে হকিস্টিক হাতে ওরা কি করে? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল বন্ধুর জন্য এই প্রতিবাদে হানাদার শত্রুদের বর্বরটার কথা।

নাহ। ওদের আর একা একা প্রতিবাদ করতে হয়নি এরপর। তাদের সারথি হয়ে রাজপথে নামল সবকটা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুনেরাও। নামলো আর অনেক কিশোর কিশোরী। কারো কারো মায়ের নির্দেশ, ‘গুলি না খেয়ে ঘরে ফিরবি না’।

এরপরের দিন ওদের ওপর হল আরও বেশ বর্বরোচিত হামলা। আহত হল অনেকেই। কেউ কেউ আহত অবস্থায় হাসপাতালেই মারা গেল। হল যৌন-হয়রানির শিকার। নিখোঁজও হল।

গতকাল এক ফেসবুক বন্ধুর পোস্ট পড়ে জানলাম ধানমন্ডি পপুলার হাসপাতালের বন্ধুত্ত্বের এই অধ্যায়ের আরেক অংশের কথা। আহত শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে এসেছিলেন অনেকেই। আটকে পড়া ছাত্রদের নিরাপত্তা দিতে কিংবা বাড়িতে পৌঁছে দিতে কাজ করেছেন কোন কোন শিক্ষক আর বন্ধুর অভিভাবকরাও। আহত এক বন্ধু নিজের আঘাতের চেয়ে বেল টাওয়ারে আটকে পড়া বন্ধুদের নিয়ে বেশি চিন্তিত। নিজের ব্যথার কথা বেমালুম ভুলে গেছে। জানলাম, ঝিগাতলার কাছে আহত শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়ির ওপর থেকে কেউ কেউ জামা ছুড়ে দিচ্ছেন, যাতে বাচ্চাগুলো পোষাক বদলে নিতে পারে। জানলাম কিছু নারীর মাতৃস্নেহে ভয়ার্ত কিছু বাচ্চাদের আলাদা আলাদা রিকসায় পাশে বসিয়ে বাড়ি নিয়ে যাবার কথা। তাদের ছিন্নভিন্ন পোষাকগুলোর জন্য যাতে বিপদে না তাই অন্যরা নিজের গায়ের জামা খুলে দিয়ে দিল তাদের। বিশালদেহী এক বন্ধুর জামাটা নাকি ঢলঢল করছিল ছোট্ট আরেক বন্ধুর গায়।

আরও জানলাম, গতকাল বিকেলে হাতিরপুলে আসার পথে ছেলেমেয়েগুলো ধৈর্য আর বিনয় নিযেই অবিচল থেকে সড়কের দায়িত্ব পালন করছে। অথচ একটু আগেও ওদের ওপরও হামলা হয়েছিল। বন্ধুর জন্য নেয়া সপথ, প্রাণ দিয়ে হলেও যে রক্ষা করতে হয়! 

জিগাতলা যেন নির্যাতন শিবির ছিল গতকাল। তবু দমেনি এই সুকান্তের আঠার বছর বয়সীরা।  তারা যে ভয়ংকর, তাদের তাজা তাজা প্রাণে যে অসহ্য যন্ত্রণা- তা এই ব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো নির্যাতনের চাইতে অধিকতর অসহনীয়। 

গত রাতটা ওদের পার হল আহত বন্ধুদের রক্ত খুঁজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ছিল জরুরী রক্তের পোস্ট। 

জিগাতলা নাকি রণক্ষেত্র ছিল আজ। গতকালকের নারকীয় হামলাগুলোর আঘাত উপেক্ষা করে আজও নাকি তারা রাজপথে ছিল। 

বন্ধুর জন্য রীতিমত বুলেট খাওয়া এই বন্ধুত্বের গল্প এখন বিশ্বের মুখেমুখে। আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমগুলোর সাহায্যে গোটা বিস্ব আজ এই বীর বন্ধুদের সাহসী গাথার সাক্ষী হয়ে গেল। আর এই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোও জেনেছে বন্ধুদের কারণে।

২৯ জুলাই-৫ আগস্ট, ২০১৮। এই সপ্তাহটা শোকের, প্রতিবাদের, আশার। প্রতিদ্বন্দ্বী স্কুল কলেজ গুলোর শিক্ষার্থীরাও একজনকে বাঁচাতে আরেকজন নিজের বুক পেতে দিচ্ছে। ছেলে বন্ধুরা মেয়ে বন্ধুদের ঘিরে রাখছে এমনভাবে যেন কোন পিশাচের হাত তাদের না ছুঁতে পারে। কেউ কেউ নিয়ে আসছে খাবার, পানি, স্যালাইন, যেন এই লড়াকু প্রাণগুলো দুর্বল না হয়ে পড়ে। মাদের দেখলাম নিজের সন্তান কি পরের, এক থালায় লোকমা তুলে খাইয়ে দিচ্ছেন ওদের। দেখলাম সেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা ছেলেগুলো ছাতা এগিয়ে দিলে ওরা সেটা বিনয়ের সাথে নিয়ে দৌড়ে দিয়ে এলো ভিজতে থাকা মেয়ে বন্ধুদের। অসুস্থ হয়ে পড়া রিক্সাওয়ালাকে নিজেরা রিক্সা চালিয়ে পৌঁছে দিল হাসপাতালে। কারো প্রতিবাদের পোস্টারে লেখা ‘যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাড়াও তবেই তুমি বাংলাদেশ’। কারোরটায় লেখা ‘মাথায় গুলি কর মেধা মরে যাবে, বুকে গুলি কর না, ওখানে বঙ্গবন্ধু থাকে, বন্ধু জেগে গেলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে’। 

আসলেই তো, বঙ্গবন্ধুও তো বন্ধু- বঙ্গের, বাংলাদেশের বন্ধু!

২০১৮’র এই বন্ধু দিবসটা তাই এই রাজপথের বন্ধুগুলোর থাক। ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ডে বাঁধা নয়, বরং রাজপথের ধুলো আর রক্তে মাখামাখি এই বন্ধুত্বের গল্প দিয়ে নতুন করেই বাংলাদেশকে চিনে নিক গোটা বিশ্ব। এই পৃথিবী তাকিয়ে থাকুক অবাক হয়ে! দেখুক এদের, যাদের কাছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এক উৎসবের নাম!