• বুধবার, নভেম্বর ১৪, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:১৫ রাত

কোটা সংস্কারবাদীদের থেকে তৃতীয় রাজনৈতিক দল?

  • প্রকাশিত ০৮:৩৭ রাত আগস্ট ১৫, ২০১৮
Quota reformists
কোটা আন্দোলনকারীদের নেতাকর্মীদের ফাইল ছবি। ছবি: ঢাকা ট্রিবিউন

 কোটা আন্দোলন থেকে একটি তৃতীয় সংস্কারবাদী দলের উত্থানকে কিছুটা বাতুলতা বলে মনে হলেও, এই বাতুলতায় আমরা একাকী অন্তত নেই। যদি একেবারে জিতেও না যায় এই নতুন দল, তবে অন্তত আমাদের দুই দলের দ্বন্দ্বময় রাজনীতিতে একটি শক্ত ঝাঁকুনি দিয়ে যেতে পারবে এবং হয়তো বড় দুইটি দলকে সংস্কারবাদী চিন্তাধারায় নিয়ে আসবে।

    কোটা সংস্কারের আন্দোলনে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর চলমান জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেফতার-রিমান্ডের ধারাবাহিকতায় আজ ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী লুতফর নাহার রুমাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে তুলে নিয়েছে ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ অথবা ডিবি পুলিশের লোকজনেরা। সংস্কারবাদী এই আন্দোলনের শীর্ষব্যক্তিদের ওপর সরকারের এই সন্দেহজনক দৃষ্টিপাত মোটেই নতুন নয়। শুরুর থেকেই এই আন্দোলনকে সরকার পতনের আন্দোলন হিসেবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে সরকার দলীয় কর্তাব্যক্তিরা এবং পরবর্তীতে বহু নেতার ব্যক্তিগত পরিচয়কে সামনে এনে সমগ্র আন্দোলনকে জামায়াত-শিবিরের চক্রান্ত হিসেবেও উপস্থাপিত করা হয়েছে। যদিও বিশেষত এই বিশেষ ব্যখ্যার থেকে বাচার উদ্দেশ্যেই শুরুর থেকে শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের লোকজনেরা সরকারী দলের নানান প্রতীককে সামনে রেখে স্লোগান দিয়ে এসেছেন, তার পরেও সরকারের রোষানল থেকে তারা বাঁচতে পারেননাই কেননা নির্বাচনের এই বছরে সরকার চারদিকে বিরোধী দলের ষড়যন্ত্র খুঁজে পাচ্ছে-সেটা আদতে থাক বা না থাক।

    হতাশার ব্যাপার হচ্ছে এই বিএনপি জামায়াতের অনুপ্রবেশের গল্পটি সাধারণ মানুষও কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বাস করেছে। যেহেতু অতীতে আমাদের বেশ কিছু আন্দোলন এক পর্যায়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ক্রীড়ানকে পরিণত হয়েছে সেহেতু এই সন্দেহও নিতান্ত ভিত্তিহীন নয়। এতো মারধর, জেলজুলুমের পরেও যারা এই আন্দোলনের সাথে আকড়ে রয়েছেন, তাদের কোন রাজনৈতিক অভিসন্ধি নেই, সেটা ভাবতেও আমাদের দারুণ কষ্ট হয়। কাজেই যতই এই আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগের প্রতিক নিয়ে স্লোগান দিক না কেন-জনমনে তাদের কল্পনা ধীরে ধীরে বিএনপি বা জামাতের “বি-টিম” হিসেবেই পাকাপোক্ত হচ্ছে, সত্যিকারে তার যথার্থতা যতটুকুই থাক না কেনো। একারণে যখনই সংস্কারবাদী নেতাদের ওপর নিগ্রহ চলছে, তখন জনমনে তার সম্ভাব্য অনুবাদ হয়ে দাড়াচ্ছে বিএনপি-জামাতের ওপর নিগ্রহতে। আর দীর্ঘদিনের গ্রেফতার রিমান্ডের সংস্কৃতিতে বাস করতে করতে আমাদের দেশের মানুষের কাছেও এসব স্বাভাবিক খবর হয়ে দাড়িয়েছে। পূর্বে সংস্কারবাদীদের ওপর হামলার ব্যাপারটিতে যেমন একটি আবেগী আপিল ছিলো, এখন ধীরে ধীরে সেটি আর থাকছেনা। এই ব্যাপারটি সংস্কারবাদীদের জন্যে ভয়ংকর। তারা একই সাথে বিএনপি জামাতের দলীয় নানান সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত, কেননা অনেক নেতারা আসলে আওয়ামী লীগেরই ভোটার, আবার বিএনপি-জামাতের লোক হবার অসুবিধাও তাদের ঘাড়ে চেপেছে। দুইদিক থেকে দ্বিবিধ এই চাপে তাদের অবস্থা এখন ওষ্ঠাগত। এই মাইনকা চিপা থেকে বের হবার জন্যে তাদের একটি প্রকল্প প্রয়োজন এবং তেমনই একটি প্রকল্প হতে পারে একটি জোট-নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল।

    আমাদের উপমহাদেশে সংস্কারের আন্দোলনের গর্ভে জন্ম নেয়া রাজনৈতিক দলের সাফল্যের ইতিহাস রয়েছে। ভারতের দিল্লিতে শাসনরত আম আদমী পার্টির জন্ম হয়েছিলো আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের থেকে। আন্না হাজারে নিজে রাজনীতিতে না আসলেও তার শিষ্য অরবিন্দ কেজরীওয়াল একটি তৃতীয় রাজনৈতিক দল গঠন করে বিজেপি-কংগ্রেসের দ্বিধারা রাজনীতির ময়দানে নিজের পরিচয় গড়ে নেয় এবং পরবর্তীতে দিল্লি শাসনেরও সুযোগ পায়। পাকিস্তানের সদ্যজয়ী ইমরান খানের রাজনৈতিক দল তেহরিক ই ইনসাফেরও জন্ম হয়েছিলো একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে। কাজেই কোটা আন্দোলন থেকে একটি তৃতীয় সংস্কারবাদী দলের উত্থানকে কিছুটা বাতুলতা বলে মনে হলেও, এই বাতুলতায় আমরা একাকী অন্তত নেই। যদি একেবারে জিতেও না যায় এই নতুন দল, তবে অন্তত আমাদের দুই দলের দ্বন্দ্বময় রাজনীতিতে একটি শক্ত ঝাঁকুনি দিয়ে যেতে পারবে এবং হয়তো বড় দুইটি দলকে সংস্কারবাদী চিন্তাধারায় নিয়ে আসবে। আর যদি কিছুটা রাজনৈতিক সাফল্য তারা লাভ করতে পারে, তাহলে গঠিত হতে পারে একটি ঝুলন্ত সংসদ যেটি কিনা আমাদের ৭০ অনুচ্ছেদের আঘাতে কাতর গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্যে নতুন একটি দিশার সৃষ্টি করতে পারে। আর তার কিছু না হলেও অন্তত আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে সংস্কারবাদীদের ওপর নিগ্রহের ঘটনাগুলো একটি অগণতান্ত্রিক পন্থা হিসেবে ফুটে উঠবে সহজে, কেননা বিশ্ব সামাজিক আন্দোলনের ওপর দমননীতিকে অগ্রাহ্য করতে পারে, কিন্তু বিরোধী দলের ওপর দমন পীড়ন একটি বৈশ্বিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত অগণতান্ত্রিক আচরণ।

    অবশ্যই আমার এই আলোচনা অতিরিক্ত আশাব্যঞ্জক। আমি নিতান্তই তরুণ, এবং অনেকের মতে আদতে একজন আধবুড়ো কিশোর। তবে আমার নিতান্ত ব্যক্তিগত অতি-আশাবাদী দৃষ্টিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তৃতীয় শক্তি হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা এখনও রয়েছে এর। এখনো এর পক্ষে সম্ভব আমাদের দ্বীদলীয় বৃত্ত ভেঙ্গে সত্যিকারের একটি জনতার শক্তি হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়ানোর। অবশ্যই সে পথে নানান বাধাবিপত্তি রয়েছে, আন্দোলন হাইজ্যাকারদের আস্ফালন রয়েছে, রয়েছে ডিবি পুলিশ। তবে সেইসব পেরিয়ে যদি আসলেই এই আন্দোলনটি একটি তৃতীয় সংস্কারবাদী দল দাড়া করাতে পারে, তবে আমার মতে সেটি আমাদের গণতন্ত্রের জন্যে একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

অনুপম দেবাশীষ রায় বিকল্প গণমাধ্যম মুক্তিফোরামের সম্পাদক।