• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০২ রাত

গরুর গুঁতো সামলাবে কে?

  • প্রকাশিত ০৪:৫১ বিকেল সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮
গরু
ভারতের রাস্তায় বাড়ছে বেওয়ারিশ গরু। ছবি: সংগৃহীত

২০১৭ সালে ভারতে গরুর সংখ্যা ছিল ২৮ কোটি,  যা ২০১৮ তে ৩০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বের ২৫% গরু ছিল ভারতে, ২০১৮ তে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ গরুর বাসস্থান ভারত।

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাংসদ লিলাধর বাঘেলা সকালে হাঁটতে বেড়িয়েছিলেন। এমন সময় একটা  গরু তেড়ে এসে তাকে এমন গুঁতো মারে যে তার পাঁজরের কয়েকটা হাড় ভেঙ্গে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে  অ্যাপোলো হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটে ভর্তি করা হয়। খবরটি সংবাদ মাধ্যমগুলোয় ফলাও করে এসেছে। গরুর গুতোয় শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি নয়, ভারতীয় রাজনীতি আক্রান্ত। মোদী সরকার কি গরুর গুঁতো সামলাতে পারবে? 

ভারতের গরুর বয়স যত বাড়ছে, সমস্যা ততই বাড়ছে। বয়স্ক গরুর কোনো অর্থনৈতিক উপযোগিতা নেই। কৃষকদের অফলদায়ক গরু রাখার সামর্থ্য নেই, ব্যবসায়ীরা গরু কিনতে চায় না, গোশালাতেও স্থান সংকুলান হচ্ছে না। গরুগুলো ছেড়ে দিয়ে কৃষক জানে বাঁচতে চাইছে। এই ছাড়া গরুগুলো  ফসলের জমিতে আর রাজপথে গরুত্রাসের সৃষ্টি করেছে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা সানডে টাইমস লিখেছে, পরিত্যাক্ত গরুর সংখ্যা একটা টাইম বোমার মতো, যেকোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।

ওয়ার্ল্ড ক্যাটল ইনভেন্টরি  একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গরুর সংখ্যার পরিসংখ্যান রাখে। এই সংস্থার হিসাবে, ২০১৭ সালে ভারতে গরুর সংখ্যা ছিল ২৮ কোটি,  যা ২০১৮ তে ৩০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বের ২৫% গরু ছিল ভারতে, ২০১৮ তে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ গরুর বাসস্থান ভারত।

ওয়াশিংটন পোস্টের হিসাবে, ভারতের শহরগুলোয় ৫২ লক্ষ বর্জিত গরু অবাধে বিচরণ করছে। ছেড়ে দেওয়া গরুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ভারতে শুধু যত পরিত্যাক্ত গরু আছে, আফ্রিকার বেশীর ভাগ দেশে সর্বসাকূল্যেও এতো গরু নেই।

স্বাভাবিক বিচারে, গরুর সংখ্যাবৃদ্ধি প্রাণীসম্পদ বৃদ্ধির পরিমাপক হয়। কিন্তু ভারতের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রবি শ্রীবাস্তব বলছেন, ভারতে গবাদিপশু একটি সম্পদ নয়, একটা বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরুর ব্যাপারে মোদী সরকারের নীতি ভুল ছিল। এই ভুল সংশোধন না করলে গবাদি পশু একটি জাতীয় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ভারতের প্রাণী সম্পদ সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে আর সবচেয়ে বিপর্যস্থ হচ্ছে কৃষকগণ।

ভারতের অর্থনীতি বহুমুখী। গরুর কারণে দেশে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হবেনা। তবে গরু পালনের আর্থিক উপযোগীতা না থাকায় গরু ক্রমবর্ধবানভাবে পরিত্যাক্ত হতেই থাকবে। 

পরিত্যাক্ত গরুর সংখ্যা ক্রমশঃ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই গরুগুলো জনসাধারণের জীবনযাত্রায় এতো সমস্যা সৃষ্টি করছে যে, ভারতের কয়েকটি প্রদেশ গরু পরিত্যাগ করা দণ্ডনীয় অপরাধ হিসাবে কার্যকর করার আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে।

মধ্যপ্রদেশের কথা ধরা যাক, এই প্রদেশে গণনা করা গরুর সংখ্যা ২ কোটি। পরিত্যাক্ত গরুর কোনো পরিসংখ্যান নেই কিন্তু সংখ্যা অনেক তাতে কোনো সন্দেহ নেই. মধ্যপ্রদেশে গরুর কারণে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে, মালিকহীন গরু ফসল নষ্ট করছে। 

কেউ স্বেচ্ছায় ষাড় ও বৃদ্ধগরু পালন করতে চায় না। এই বোঝা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য কৃষকগণ গরু রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে বিপদ মুক্ত হচ্ছে। গরুর খোয়ারগুলোও স্থান সংকুলান হচ্ছে না। গরুর মালিকরা খোয়ার থেকে গরু নিতে গেলে ৫০০০ রুপি জরিমানা দিতে হয়। এই টাকা দিয়ে নতুন করে ঝামেলা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

পরিত্যাক্ত গরুর সমস্যা মোকাবেলা করার জন্য মধ্যপ্রদেশ গরু সংরক্ষণ বোর্ড গরু পরিত্যাগ করার কারণে দণ্ড প্রদানের আইন করা যাচ্ছে। এরআগে, শুধু গরু জবাই ও চোরাচালানের কারণে শাস্তির বিধান ছিল। সড়ক দুর্ঘটনায় কোন গরু মারা গেলে, তার মালিককে খুঁজে পেলে, তাকে গরু জবাই এর সমতুল্য শাস্তি দেওয়া হবে।

এই আইন প্রণীত হলে গরু বর্জন করার জন্য জরিমানার সাথে সাথে কারাদণ্ড হবে। অন্যান্য প্রদেশগুলো মধ্যপ্রদেশের অনুসরণ করতে পারে। হরিয়ানা প্রদেশ ইতমধ্যে একই আইনের প্রস্তাব করেছে। 

গরু বর্জন করাকে দণ্ডযোগ্য করা ছাড়া ভারতের প্রাদেশিক সরকারগুলোর হাতে অন্য কোনো উপায় নেই।

জবাই বন্ধ থাকলে  বুড়ো গরুর বাড়তেই থাকবে আর গরু পরিত্যাক্ত হতে থাকবে। গরুর সংখ্যা এতো বেশী যে,  খোয়াড়ের জায়গা হচ্ছে না, বৃদ্ধ গরু নিবাসগুলোয় স্থান সংকুলান খুব সীমিত। হিন্দুস্তান টাইমসের হিসাব অনুযায়ী, ভারতে ৩০৯৪ টি গোশালা  আছে. এই গোশালাগুলোয় গড়ে ৫০০০ গরু থাকলে, সংখ্যাটি দেড় কোটি হতে পারে। গোশালা গুলোয় প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো না থাকায় প্রচুর গরু মারা যাচ্ছে। ইন্ডিয়ান টাইমস এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে অপুষ্টিতে ৮০০০ গরু মারা গেছে।

আগে কৃষকগণ যেভাবে বয়স্ক গরু  বিক্রী করে দুগ্ধবতী গাভী কিনতো, সেই সুযোগ এখন নেই। গরু ব্যবসায়ীরা যে প্রদেশ গুলোয় গরু জবাই বৈধ, গরুগুলো সেখানে পাচার করতো। এখন গরু পাচারের বিরুদ্ধে আইন কঠোর হয়েছে। এর সাথে গোরক্ষাকারী বাহিনীদের উপদ্রব বেড়েছে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলো এদের হিংসাত্মক আচরণের কথা প্রায়ই রিপোর্ট করছে। এদের মোটরসাইকেল বাহিনী ওয়েস্টার্ন কাউবয় ফিল্ম স্টাইলে গরু ব্যবসায়ীদের রাস্তায় লুটপাট করে আর গরুগুলোকে মুক্ত করে দেয় শহরগুলোয় এখন মালিকহীন গরুর সংখ্যা অন্য প্রাণীর চেয়ে বেশী। 

শহরের রাস্তা থেকে ভাসমান গরু ধরাও বিপদজনক। পশু ডাক্তারের উপস্থিতি ছাড়া গরুকে চেতনা নাশক বুলেট মারা অবৈধ। বেশীরভাগ প্রয়োজনের সময়ে পশু ডাক্তার পাওয়া যায় না। এই কারণে গরুগুলো তাড়িয়ে, দড়ি ছুড়ে পুরানো দিনের মতো ধরা হচ্ছে। এই দৌড়াদৌড়ি, ধরাধরির কারণে অনেক সময় ট্রাফিক অচল হয়ে পরে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে অনেকগুলো গরুর ফার্ম চালানো হতো। সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফার্মের গরুর খাদ্যের চাহিদা বেশী। বন্ধ হওয়া ফার্মগুলোর গরুর নতুন বাসস্থান  এখনো অনিশ্চিত।

ভারত সরকার গরু পরিত্যাগ করার যত শাস্তির বিধানই করুক না কেনো, বৃদ্ধ গরুর যত স্যানেটোরিয়াম করা হোক না কেনো কয়েক বছর পর কয়েক কোটি গাভী বৃদ্ধ হয়ে যাবে, তখনকার উদভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।

গরু যদি কেউ পুষতে না চায়, তাহলে কি পরিণতি হতে পারে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মতবাদ আছে।

৫ বছর পর ভারতের অর্ধেক গরু অকেজো বৃদ্ধ গরুতে পরিণত হবে। গরুগুলো ব্যাপক হরে পরিত্যাক্ত হলে অনেক গরু মারা যাবে কারণ তারা প্রকৃতিতে জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত নয়। সানডে টাইমস সম্ভবতঃ এই অবস্থায় গরুর টাইম বোমার বিস্ফোরণের কথা বলছে।

শুধু অর্থনীতিবিদগণই নয় পরিত্যাক্ত গরুর ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানীরাও ভাবছে না। তাদের মতে, গরু প্রজাতি বনেও টিকে থাকতে সক্ষম। গরু গৃহপালিত হওয়ার আগে বন্যই ছিল। গরু পুরোপুরি বন্য হতে ২/৩ প্রজন্ম লাগবে। 

লেখক: ওবায়দুল করিম খান_ ব্যবসায়িক, পরামর্শক ও লেখক।