• শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৫:২৯ সন্ধ্যা

মতামত: তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি আয়ে আমরা এতো পিছিয়ে আছি কেন?

  • প্রকাশিত ০১:০৫ দুপুর অক্টোবর ১০, ২০১৮
প্রতীকী
ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের মোট রপ্তানি আয় বেশি হলেও তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাদের তুলনায় আমাদের আয় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

যদিও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানিআয় নিয়ে দেশে সরকারিভাবে ও প্রচারমাধ্যমগুলোয় প্রচুর উচ্ছ্বাস প্রকাশ হয়, প্রকৃতপক্ষে এই খাতে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোথেকে প্রচুর পিছিয়ে আছে।

আমাদের দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতেএ বছর ১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় আশাকরা যাচ্ছে।

এই খাতে ভারতের আয় ১১১ বিলিয়ন ডলার, এমনকি পাকিস্তানেরও ৫ বিলিয়ন ডলার।পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের মোট রপ্তানি আয় বেশি। কিন্তু তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাদের তুলনায় আমাদের আয় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

২০২১ সালে তথ্য প্রযুক্তি খাতে লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলে আয়  ২ বিলিয়ন ডলারেও পৌছাবে না। অন ডিম্যান্ড অর্ডার বা চাহিদা অনুযায়ী সরবারহ করে টার্গেটে পৌঁছানো যাবেনা। যারা বর্তমানে আমাদের কাছ থেকেসফটওয়্যার কিনছে, তাদের চাহিদা এই সময়ের মধ্যে কয়েক গুনবাড়বে।

আমাদের প্রযুক্তি বিদেশের বাজারে ব্যাপকভাবে প্রমোট বা উন্নীত করলে  রপ্তানি বাড়বে কিন্তু তা সত্ত্বেও এতো কম সময়ে কাংখিত গন্তব্যে পৌঁছানোসম্ভব নয়। সফ্টস্কিলস ও আন্তঃব্যাক্তিক যোগ্যতার বৃদ্ধির উপর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপক প্রচেষ্টা এবং একই সাথে আমাদের সফটওয়্যার পণ্যটি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রমোট করতে থাকলে, কোনো এক সময় আমাদের রপ্তানি যায় ৫ বিলিয়ন ছাড়াবে কিন্তু ২০২১ সালের মধ্যে কাংখিত লক্ষে পৌঁছানো যাবেনা।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয়, সরকারি প্রচেষ্টার চেয়ে বেসরকারী প্রচেষ্টার উপর বেশি নির্ভর করে।

শুধু সফটওয়্যার সৃজন করলেই চলেনা। এই ব্যাবসার সাফল্য বাজারজাতকরণের কৌশলের উপর নির্ভর করে।

আমরা B২B পদ্ধতিতে অর্থাৎ দেশী ব্যাবসায়ীরাবিদেশী ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রীকরছি। একটা প্রতিষ্ঠান অর্ডার দিচ্ছে আর আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান তাদের সরবরাহ করছে। এই ব্যবসায়ে প্রযুক্তি খাতের ব্যাপক বিকাশ ঘটেনা। আমাদের সরাসরি গ্রাহকদের (B2C) কাছে সেবা পৌঁছে দিতে হবে।

পৃথিবীর সব সফল সফটওয়্যার কোম্পানীসফলতা খুচরা গ্রাহকদের নিকট বিক্রিকরা থেকে অর্জিত হয়েছেও। যে কোম্পানিগুলোদৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ সফটওয়্যার তৈরী করেছে, তারাই বেশি সফল হয়েছে।

এই যে ১ বিলিয়ন এমনকি ৫ বিলিয়ন এইসব টাকার অংকে লক্ষ কোটি টাকা শোনা যায়, কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির বাজারেএই ৫ বিলিয়ন একটি বড় সংখ্যা নয়। শুধু এক একটা কোম্পানী যেমন গুগল, ফেইসবুক এদের বাজারমূল্যযথাক্রমে ৮৫০ ও ৫৫০ বিলিয়ন ডলার।আর অ্যাপেল এর বাজারমূল্য ১১০০ বিলিয়ন ডলার। আমাজনের বাজারমূল্যও ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

আমরা বন্ধুরা কয়েক বছর আগেও দেখেছি, স্কাইপ প্রতিষ্ঠিতা ডেনমার্কের ইয়ানুস বেকার ঘুরে বেড়াতো। সেই ব্যাক্তিমাইক্রোসফটের কাছে স্কাইপ বিক্রিকরে এখন কয়েক বিলিয়ন ডলারের মালিক।

ট্রিলিয়ন ডলার প্রযুক্তি বাজার সৃষ্টি হয় শুধু প্রযুক্তির উৎকর্ষতার উপর নির্ভর করে নয়। প্রযুক্তির সঙ্গে জীবনের সম্পৃক্ততার উপর প্রযুক্তির সাফল্য নির্ভর করে।ফেইসবুকের  উদাহরণ দেই। ২০০৪ সালে মার্ক জুকারবার্গ যখন ফেসবুক প্রতিষ্ঠা করেন, উনি না ছিলেন প্রকৌশলী না ছিলেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ। জুকারবার্গ ছাত্র ছিলেন। ফেসবুকের সাফল্য আসে তার ভিশন বারূপকল্প থেকে। মানুষ কিভাবে নিজেকেপ্রকাশ করতে চায়, আরেকজন মানুষের সংগে যোগাযোগ করতে চায়, জুকারবার্গ তা বুঝেছিলেন। ফেসবুকের ফিচারগুলো সেভাবে করেছেন। তাই মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে।

ওই সময়েও  গুগলের প্রযুক্তির মান  আকাশ ছোঁয়া ছিল। ফেসবুকের কয়েকজন তরুণ ছাত্রদের সাথেগুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের কোনো তুলনায় চলেনা। ফেসবুকের ব্যাবহারকারী যখন ১০০ মিলিয়ন ছাড়ালো, গুগল ফেসবুককে টেক্কা দিতে গুগল+ (প্লাস)  নামে সামাজিক নেটওয়ার্ক শুরু করে। সবাই ভেবেছিলো, এটাই ফেসবুকের ক্রান্তিকাল হবে। কিন্তু গুগল+ (প্লাস) ফেসবুককে একটুও নড়াতে পারেনি। ফেসবুকের ফিচারগুলো আমাদের চাহিদার সাথে বেশী সম্পৃক্ত।

প্রযুক্তিতে সফল হতে হলে জীবনের রূপকার হতে হয়। স্যার জগদীশ চন্দ্র কবিতা ও বিজ্ঞানের যে সম্পর্ক বুঝেছিলেন, আজও তাসত্য। আমাদের স্বপ্নের সাথে প্রযুক্তি কে সম্পৃক্ত করতে হয়। আমরা রূপকল্পের স্বপ্ন দেখি। বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের কাজ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা।

প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিকশিত করতেএকটি টিমওয়ার্কের দরকার হয়। প্রযুক্তিটি কিসের উপর ভিত্তি করে হবে, কাদের, কিভাবে সেবা দেবে, সেটা আগে বুঝতে হবে। একটা ভালো মোবাইল অ্যাপস করেই ৫ বিলিয়নের টার্গেট পূরণ করা যায়। হোয়াটসাপ ও স্ন্যাপচ্যাটের উদাহরণ দেই। হোয়াটসআপ ও স্ন্যাপচ্যাটের বাজারমূল্য যথাক্রমে ১৯ ও ২০ বিলিয়ন ডলার। ইন্স্টগ্রামের আরো বেশি মূল্য।

এই ধরণের সফল একটা অ্যাপ উদ্ভাবন করতে হলে সমাজ বিজ্ঞানী, মনোস্তত্ববিদ ও বাজার বিশেষজ্ঞদের  নিয়ে একটা টিম করতে হয়। বুঝতে হবে সমাজকিভাবে সামনে যাবে, মানুষের মন কি চায়। আইডিয়া বের করাটাসবচেয়ে বেশী  প্রয়োজন। একটা আইডিয়া অনেক বিলিয়ন ডলার আয় সৃষ্টি করতে পারে। আইডিয়াগুলোর পেটেন্ট করা খুবই প্রয়োজন। অন্যথায় কেউ আইডিয়া থাকলেও তা অন্যকে দিতে উৎসাহী হবেনা। আইডিয়া সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলে আমিনিজেও আইডিয়া দিতে আগ্রহী।

আইডিয়াগুলো অবশ্যই যাচাই, বাছাই করে নির্ণয় করতে হবে, সেগুলো বাজারজাত করা যায় কিনা। আমাদের রপ্তানিমুখী প্রযুক্তির প্রধান বাজার মার্কিন যুক্তরাস্ট্র। সফল রপ্তানিমুখী প্রযুক্তি সৃষ্টি করতে হলে, মার্কিন নাগরিকদের জীবনধারা সম্পর্কে খুব ভালো ধারণা প্রয়োজন। এই ধারণা শুধু তাদের বর্তমান জীবনধারা নয়, তা কিভাবে পাল্টে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে তাদের কি চাহিদা হবে, সে সম্পর্কেও গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই সম্পর্কে নিজেদের গবেষণা করা উচিৎ।

বাংলাদেশের অনলাইন শপগুলো শুধু প্রবাসী বাংলাদেশী গ্রাহক টার্গেট করে। শপগুলো আমেরিকা ও ইউরোপের বাজারগুলোয় ঢুকতে পারে। গার্মেন্টসগুলো শুধু পাইকারিভাবে পণ্য কাপড় বিক্রী না করে অনলাইনে খুচরা বিক্রী করতে পারে। বিশ্বের সব বড় পোশাক বিক্রেতার মূল আয় অনলাইন বিক্রয়ের মাধ্যমে হয়।

সরকারীভাবে মোবাইল অ্যাপসগুলোকে পুরস্কার করা হয়। কিন্তু এই সামান্য পুরস্কার যথেষ্ট নয়। একটা ভালো আইডিয়ার মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। আইডিয়াগুলো পেটেন্ট বা দলিল করে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা আবশ্যক।

এরপর যেসব আইডিয়া সামাজিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে সম্ভাবনায় মনে হয়ে, সেগুলো বাস্তবায়নে সরকারি সহায়তা দেওয়া উচিৎ। এভাবে অনেক প্রতিভাবান তরুণ উদ্যোক্তা হতে উৎসাহী হবে।

যেসব দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সফল হয়েছে, তার পিছনে তরুণ উদ্যোক্তাদের অবদান আছে।

অনেকগুলো ভালো আইডিয়া বাস্তবে রূপ দিলে কিছু প্রকল্প সফল হবেই। একটা মোবাইল অ্যাপ একবার সফল হলে, আমাদের টার্গেট ছাড়িয়ে যাবে। সরকার এইসব প্রকল্পে পার্টনার হলে, তার বিদেশী গ্রাহকের ভরসা বেশী হবে।

তৈরী পোশাকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেমন সুনাম আছে, তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও তেমন সুনাম অর্জন করার জন্য সেভাবেপ্রমোট করা আবশ্যক।


 ওবায়দুল করিম খান, বাণিজ্যিক পরামর্শক ও লেখক 

54
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail