• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৪ রাত

মতামত : বিএনপির করণীয় কি?

  • প্রকাশিত ০২:৩০ দুপুর নভেম্বর ১১, ২০১৮
পুরোনো ছবি
পুরোনো ছবি

বিএনপির অবস্থা যে অতি করুণ তা ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না। এইসব রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন পুরানো নেতৃত্ব সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আশা আর সংগঠনকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো।

নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা করার পর সবগুলো পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ পড়েও বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা কোনোভাবেই স্পষ্ট হলো না। শুধু বোঝা গেছে, বিএনপি সহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা তাড়াহুড়া করে তফসিল ঘোষণা করায়   সন্তুষ্ট নন. সন্তুষ্ট না হলেও কি তারা কি করবেন, তা জানতে  খুবই আগ্রহী। ঐক্যফ্রন্টের রাজশাহীর সমাবেশের বক্তব্য থেকেও নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে আমাদের কাছে কিছু পরিষ্কার হলো না. তবে বোঝা গেলো, বিএনপি আন্দোলন করবে আর আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করবে।

ডেইলি স্টারে পড়লাম, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ গ্রহণের পক্ষে সম্মতি দিয়েছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন কোন কোন দল জোটের মাধ্যমে নির্বাচনে যাবে তিন দিনের মধ্যে জানাতে বলেছে। 

আন্দোলনের মাধ্যমে বিএনপি দাবি আদায় করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে নেই। এই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করলে বিএনপির অস্তিত্ত্ব বিলুপ্ত হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বিএনপি এমনিতে গত নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে মারাত্মকভাবে সংকুচিত। এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে দলটি বিলুপ্তি ঠেকানো  যাবে না। গণতন্ত্রমনা কারোরই কাম্য নয়। 

সংসদে একাধিক রাজনৈতিক দলের আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে গণতন্ত্র বিকাশ লাভ করে। সব গণতান্ত্রিক দেশে কমপক্ষে দুটি বড় রাজনৈতিক দল থাকে। আমাদের সাধারণ নাগকরিকদেরও কাম্য সংসদে সরকারি দল ছাড়াও অনেক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকুক।

বিএনপি এখন রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে । বিএনপি যদি কোনো কোম্পানি হতো, এমন অবস্থায় দেউলিয়া বা bankrupt ঘোষণা করা লাগতো। তবে রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও এমন হয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলোর বিএনপির মতো খারাপ অবস্থা হলে, তারা গোটা দলকে ঢেলে সাজায়, এমনকি দলটি নতুন নামে ও লক্ষ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। ইউরোপ এমন উদাহরণ অনেক আছে।

বিএনপির অবস্থা যে অতি করুণ তা ব্যাখ্যা করার অপেক্ষা রাখে না। এইসব রাজনৈতিক এজেন্ডা নিয়ে টিকে থাকতে পারবে না। টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন পুরানো নেতৃত্ব সম্পূর্ণ সরিয়ে দিয়ে তরুণদের নেতৃত্বে নিয়ে আশা আর সংগঠনকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো।

এই ব্যাপক পরিবর্তন নির্বাচন পরবর্তী কালের ভাবনা হতে পারে। নির্বাচনের তারিখ ও নির্বাচনকালীন সরকার যেমনি হোক না কেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করলে আম ও ছালা কোনোটাই বাঁচবে না। সংসদে ২৫/৩০টি বা যেকটাই আসন পাক না কেন তা নাই মামার চেয়ে কানা মামার চেয়ে ভালো। সংসদে অন্ততঃ কিছু বলার সুযোগ থাকে। ভাগ্য ভালো হলে হয়তো বিএনপি প্রধান বিরোধী দল হিসেবেও স্বীকৃত হতে পারে। 

গত ১০ বছরে বিএনপির রাজনীতি দেখে ভালোভাবে বোঝা যায়, বিএনপির রাজনৈতিক বিচক্ষণতা একেবারেই নেই। তাদের নেতারা বক্তৃতা করতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নেই। বর্তমান যুগে জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি চলে না। আধুনিক রাজনীতি অর্থনীতি, সমাজ ও প্রযুক্তির সঙ্গে সংপৃক্ত। সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়গুলোর উপর গবেষণা করতে হয়, জরিপ করতে হয়। মানুষদের মানসিকতা, চাওয়া পাওয়া সম্পর্কে বিজ্ঞান সম্মত জরিপের মাধ্যমে জানতে হয়, জ্ঞান অর্জন করতে হয়। কে কী বললো এইসব কানকথা। বুদ্ধি শুনে বড় বড় সিদ্ধান্ত নিলে দেশের ও ক্ষতি হয়, দলের ক্ষতি হয়।

বিএনপি নেতারা রাজনৈতিক কৌশল খাটিয়ে রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরি করতে সক্ষম নন। নিজেরা সক্ষম না হলে এমন পরামর্শদাতা সংস্থা নিয়োগ করা উচিত যারা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গবেষণা করে বিএনপির করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সব রাজনৈতিক নেতারা তাদের স্ট্রাটেজিস্ট নিয়োগ করেন। সব ক্ষেত্রে পরামর্শ দাতা নিয়োগ করেন। ভারতের নেতারা বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা নিয়োগ করেন।এই ধরনের পরামর্শদাতা বা Spin doctor বিএনপির বিশেষ প্রয়োজন। ভালো ডাক্তার ছাড়া বিএনপির রোগ সারবে না।

আমি ব্যাবসায়িক পরামর্শক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই। তবুও বিনিয়োগ সম্পর্কে পরামর্শ দিতে রাজনীতির ঝুঁকির পূর্বাবাস দিতে হয়। এই কারণে বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থার  ওপর গবেষণা করা লাগে। আমরা বুঝি, বিএনপি ও ঐক্যজোট যেসব আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে গদিচ্যুত করার হুমকি দেয় তা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়। ক্ষমতা না থেকে এমন করতে গেলে কী হয় তার একটা উদাহরণ দেই। কিছু কোম্পানি নিজেদের সামর্থ্য ও মূলধনের অবস্থা না বুঝে যদি বড় বিনিয়োগ করে তখন তরল মূলধনের অভাবে আগেও বাড়তে পারে না। আর এতো বিনিয়োগের লোকসান দিয়ে পিছিয়েও আসতে পারে না। তাদের অবস্থা হয় মাইনকা চিপায় ফেঁসে থাকার মতো। বিএনপি এখন চিপায় ফাঁসা। 

আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের জন্য যে ধরনের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সৃষ্টি হতে হয় তা দেশে সামান্যতম বিরাজ করছে না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, সরকার ও জনগণের মধ্যে এক ধরণের লিখিত ও অলিখিত চুক্তি থাকে যার অর্থ জনগণ সরকারকে ততদিন মেনে নেয় যতদিন সরকার জনগণকে প্রয়োজনীয় সেবা, কর্মসংস্থান ও আয়ের সুবিধা দিতে পারে। যখন অর্থনৈতিক অবস্থার ধস  নামে ও সরকার জনগণকে  প্রয়োজনীয় সেবা দিতে সক্ষম থাকে না এবং সর্বোপরি দারিদ্র্যের হাহাকার ওঠে তখন, আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা স্মরণকালের ইতিহাসে বর্তমানের চেয়ে ভালো কখনো হয়নি। বেকারত্বের হার এখন সর্বনিম্ন এবং মানুষের এখনকার মতো ক্রয়ক্ষমতা এতো বেশি আগেকখনো ছিল না। গত নির্বাচনের প্রাক্কালে এখনকার তুলনায় কিছুটা আন্দোলনের পরিস্থিতি একটু বেশি ছিল। তখনি আন্দোলন হতে পারেনি, এখন হওয়া তো অসম্ভব।

ধর্মঘট করা, বিক্ষোভ করা ও সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করা, সব দেশে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। এই ধরনের প্রতিবাদ সব গণতান্ত্রিক দেশে হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের গুলিতে কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ মারা যাওয়ায়, ওখানে দেশব্যাপী প্রতিবাদ  হয়েছে। বিতর্কিত গর্ভপাতের আইন নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। স্বাস্থ্য বীমার অধিকার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। এমন প্রতিবাদ যুক্তরাজ্যে, ইতালি ও ফ্রান্স সম্প্রতি অনেক দেখা গেছে। প্রতিবেশী ভারতে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ানোর কোটি কোটি কৃষক আন্দোলন করেছে। সব আন্দোলন হয় দাবী দাওয়ার ভিত্তিতে, সরকার উচ্ছেদের জন্য নয়.

দেশে সম্প্রতি কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক নিয়ে দুটি বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছে। এই আন্দোলনগুলোর দাবি সরকারের পদত্যাগ নয়. অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়েছে, এই জাতীয় আন্দোলনই বিরোধী দলের একমাত্র ভরসা। কোটার বা সড়কের আন্দোলন বাড়তে বাড়তে ভয়াবহরূপ নেবে এবং তা থেকে সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হবে-এ ধরণের প্রত্যাশা অমূলক।

রাজনৈতিক আন্দোলন বিদ্রোহে রূপ নেবে কিনা তা মূলত কয়েকটা বিষয়ের উপর নির্ভর করে: আর্থ-সামাজিক অবস্থা, সরকারের ভিতরের স্থিতিশীলতা, দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বহিঃবিশ্বের হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতি।

অর্থনৈতিক সমবৃদ্ধির বিষয় বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ হাসিনা সরকার সম্পূর্ণ স্থিতিশীল। সরকারের মধ্যে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ কলহ নেই. সরকার প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব আছে। সরকারের মধ্যে কোনো ঝামেলা নেই. অভ্যন্তরীণ সংঘাত বলতে ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক কোন্দল ইত্যাদি বোঝায়। দেশে এ ধরনের কোনো সঙ্কট নেই।

আগে বিদেশি পরাশক্তি দেশে অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতো। এ ধরনের প্রবনতা আগের চেয়ে অনেক কম। তাছাড়া সরকার যথেষ্ট সবল। সরকারের বৈদেশিক নীতি স্থিতিশীল। 

এমতাবস্থায় বিএনপি নেতারা এখনো আন্দোলনের হুংকার কেন দিচ্ছেন বটে বোধগম্য নয়। প্রবাদে আছে “ঢাল নেই, তলোয়ার নেই-নিধিরাম সর্দার। এমন সর্দার দিয়ে কি দেশ উদ্ধার করা সম্ভব? যারা নিজেরা সংগঠিত করতে না পারে, তারা দেশকে সংগঠিত করবে কীভাবে!!

অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়, বিএনপি গায়েবি বা অলৌকিক কিছু কিছু ঘটার প্রতীক্ষায় আছে। ঠিক তীর্থের কাকের মতো। যদি কিছু ঘটে সবকিছু পাল্টে যায়, পাল্টানোর মতো পরিস্থিতি নেই।

যা বলতে চেয়েছি তার সসংক্ষিপ্তসার হলো- এই এক মাস সর্বশক্তি দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্য গ্রহণ করা উচিত এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দলকে ঢেলে সাজাতে হবে।

ওবায়দুল করিম খান, বাণিজ্যিক পরামর্শক ও লেখক


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না