• শনিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:৩০ রাত

হিরো আলম ও আমাদের শ্রেণী বিদ্বেষী মন

  • প্রকাশিত ০৫:৫৪ সন্ধ্যা নভেম্বর ১৪, ২০১৮
Hero Alam
হিরো আলম। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

আমিও দেখতে খাটো আর কৃশকায়। আমার থুৎনির দিকটাও দেখতে বানরের সাথে অনেকটা মিল আছে। আমিও হিরো আলমের মতন...

আমাদের চিন্তাভাবনা কি এখনো তীব্রমাত্রায় ক্লাস নির্ভর বা শ্রেণী সচেতন? 

কথাটা মনে এলো হিরো আলমের নির্বাচনী মনোনয়ন ফর্ম তোলার পর 'সুশীল-শিক্ষিত' ও অপেক্ষাকৃত আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নাগরিকদের ফেসবুক প্রতিক্রিয়া দেখে। 

পাশাপাশি, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতেও তাকে দেখা গেলো। 

একটি টেলিভিশনের সংবাদ-বিশ্লেষণী এক অনুষ্ঠানের শ্রদ্ধেয় একজন অতিথি হিরো আলমকে জিজ্ঞেস করলেন, ''আপনি তো এমনিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?" 

আপাতঅর্থে প্রশ্নটি নিরীহই বটে। কিন্তু, 'অনেক বিখ্যাত' শব্দটাতে আমার কান আটকে গেছে। তাছাড়া এই শব্দ-দ্বয় ডেলিভারি দেবার সময় বক্তার স্বরটাও লক্ষনীয়।

বাংলাদেশে শ্রেণীভেদে হিরো আলমের গ্রহণ যোগ্যতা, তাকে নিয়ে ফেসবুকীয় সুশীলীয় ট্রল ইত্যাদি বিষয়ে যারা অবগত আছেন তারা এই প্রশ্নটির ডেলিভারি শুনতে-শুনতেই অনুভব করবেন যে, প্রশ্নটিও আসলে একধরনের ‘বুলিং’-এরই নামান্তর।

হিরো আলমকে এনে সাক্ষাতকারের নামে যেভাবে বিনোদন করা হয়েছে বা সার্কাস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে সেভাবে কি অন্যান্য তারকা যেমন সঙ্গীতশিল্পী কণকচাপা ও বেবী নাজনীন, চিত্রনায়ক সোহেল রানা, অভিনেতা ডিপজল, নায়িকা কবরী ও ময়ূরী ও অন্যান্যদের এনেও করা হয়েছে বা হবে? 

কিংবা আমাদের কোটি মানুষের প্রাণপ্রিয় মাশরাফিকে কি এই প্রশ্নটা করা হয়েছে এভাবে গলা টানতে-টানতে যে, ''আপনি তো এম্নিতেই অনেক বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?"

এবারে যারা নির্বাচনের মনোনয়ন কিনেছেন, তাদের মধ্যে মাশরাফির চেয়ে বিখ্যাত কে আর আছেন? তাহলে 'অনেক বিখ্যাত' শব্দ-বন্ধ কি হিরো আলমের চেয়ে মাশরাফিকেই বেশি মানায় না? 

হিরো আলমের এমপি হবার যোগ্যতা নাই থাকতে পারে। তাকে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া নাই হতে পারে। বা চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়া হলেও সে ভোটে ফেল করতে পারে। সেটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে 'হিরো আলম' নিজেকে 'এমপি'র আসনে আসীন' ব্যক্তি হিসেবে কল্পনা করতে পারার সাংবিধানিক অধিকার তার আছে। আর নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধানও তাকে দিয়েছে মনোনয়ন ফর্ম তোলার অধিকার।

কিন্তু  হিরো আলম 'আনস্মার্ট', 'অশিক্ষিত', 'গরীব' 'ফকিন্নির পুত' 'মুর্খ' (এই কথাগুলো আমি ফেসবুকে এই দুই দিনে হিরো আলমকে নিয়ে লোকের কমেন্টে পড়েছি) তাই সে নির্বাচনের মনোনয়ন ফর্ম কিনতে পারবে না বলেই সাব্যস্ত করেছে আমাদের সুশীল মন।  

তাই, আমাদের 'সুশীলীয় সেট অফ ভেল্যুজ' বা মূল্যবোধের ছাঁকনি দিয়ে মেপে আমরা হিরো আলমকে সাব্যস্ত করেছি 'বিলো এভারেজ' বা গড়পড়তার নিচে বলে এবং তাকে  সাব্যস্ত করেছি 'নট আপ টু দি মার্ক' অর্থাৎ 'আমার মাপে সে যাচ্ছে না'  বলে।

কিন্তু এই সুশীলরাই আবার দেখি সাবোলটার্নদের পক্ষে নানাখানে কথা বলেন। তারাই আবার শ্রেনী-বর্ণ ও জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। 

আমরা নিম্নবর্গের সংস্কৃতি নিয়ে গালভরা কথা বলি। কিন্তু একজন প্রকৃত নিম্নবর্গের মানুষ যখন নির্বাচনে লড়াই করবার জন্য মনোনয়ন ফর্ম কিনেছেন মাত্র, সেটিই 'সুশীল-শিক্ষিত' সমাজ মেনে নিতে পারছে না। 

তাকে নিয়ে আমরা বুলিং করতে ছাড়ছি না। তাকে নিয়ে 'মজা' নিতে ছাড়ছি না। তাকে পরোক্ষে 'র্যা গ' দিতে ছাড়ছি না। 

হিরো আলমের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি নই। সে এমপি হবার যোগ্য না-কি যোগ্য নয় সেই প্রসঙ্গেও আমি আলোচনায় যাচ্ছি না। কিন্তু আমার বলার মূল বিষয় 'শ্রেণী বিদ্বেষী মন'। অর্থাৎ অত্যন্ত পরিতাপের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, আমাদের সুশীল মন কতটা বর্ণবাদী ও শ্রেণী-বিদ্বেষী সেটিই ঠেলে বের হয়ে আসছে হিরো আলমের ঘটনায়।

আপনি ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপনের বিরোধীতা করেন। কারণ এটি সমাজে বর্ণবাদ ছড়ায় বলে আপনি মনে করেন।

আফ্রিকান বংশোদ্ভুত কাউকে তার গায়ের বর্ণের কারণে কৃষ্ণাঙ্গ বলা হলে সেটি আপনার সুশীল মনে কষ্ট দেয়। সেটিকে আপনার সুশীল মন বর্ণবাদ বলে চিহ্নিত করতে পারে।

আপনি এশিয়ান বলে, আপনার চামড়া বাদামী বলে, সাদা চামড়ার দেশে কোনো বিমান বন্দরে আপনাকে যখন অন্যের চেয়ে বেশী সময় ধরে চেক করার নামে ভোগান্তি দেয়, আপনার পাসপোর্টটা যখন অহেতুক হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে নেড়ে-চেড়ে দেখে, আপনার নামের আগে মোহাম্মদ লেখা দেখে যখন আপনাকে অতিরিক্ত আরো কিছু প্রশ্ন করে ‘হিউমিলিয়েট’ বা ‘অপদস্ত’ করে তখন আপনি বিরক্ত হন এবং এই বিরক্তিকে যৌক্তিক মনে করেন।  

কিন্ত হিরো আলম 'শুদ্ধ ভাষায় ঠিক মতন মনোনয়ন শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না' বলে, সে দেখতে 'আনস্মার্ট' বলে 'অশিক্ষিত' বলে তাকে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করেন, তাকে যখন খারিজ করে দেন তখন কি সেটি বর্ণবাদী আচরণ নয়, মহামান্য? 

বাংলাদেশের 'সবচেয়ে খ্যাতিমান ও অভিজাত' একটি বাংলা পত্রিকার একটি খবরেও হিরো আলমের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হতে দেখলাম। সাক্ষাৎকারটিতে হিরো আলমের বক্তব্যের পুরো অংশ বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায়। আর রিপোর্টারের ভাষা 'মান বাংলায়'। 

এই ইন্টারভিউটা পড়েই মাথায় এলো 'বিটুইন দি লাইন্স' কথাটা। ভাবে-ভঙ্গিতে কাউকে সম্মান দেয়ার 'ভং' ধরেও আপত্তিকর কোনো শব্দ ব্যবহার না করে ও কী করে বহু কথা বলে দেয়া যায় তা এই সমাজ জানে।

তাই, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া, মেইনস্ট্রিম গাণমাধ্যমের আচার-আচরণ দেখে মনে হলো, বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষা আতরাফ বা নিম্নবর্গ বা চাষা-ভুষা বা ছোটোলোকের ভাষায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভাষা কবে থেকে আতরাফের ভাষায় পর্যবসিত হলো? 

বগুড়ার মানুষ যারা আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন তারা সবাই কি আতরাফ? তারা সবাই কি আনস্মার্ট? আপনাদের যাদের আত্মীয়-স্বজন বগুড়ায় আছেন তারা সবাই কি মান বাংলায় কথা বলেন? আর যারা মান বাংলায় কথা বলেন না তাদের সবার নাম কি হিরো আলমের মতন আনস্মার্টদের লিস্টে তোলা হবে?

এই যে, শ্রেণী সচেতনতা, এই যে আপনার 'মানে এবং মাপে' পৌঁছাতে না পারলেই আরেকজনকে 'ডি-ক্লাস' বা শ্রেণীচ্যুত করে দেওয়ার মাধ্যমে তাকে বালখিল্য ও হাস্যস্পদ করে তোলা এটি কি অন্যায় ও নীতিবিরুদ্ধ আচরণ নয়, হে সুশীল-শিক্ষিত সমাজ?

আপনার মতন, ক্লাস-সচেতনতা ও উগ্র সাংস্কৃতিক আধিপত্যের  মানসিকতা থেকেই তৈরি হয়েছিল আর্য আর অনার্যের মিথ। এইজন্যই আমাদের মিথের অসুরেরা দেখতে হিরো আলমের মত কালো, খাটো, 'বিদঘুটে'। হয়তো অসুর মানেই হিরো আলমের মতন দাঁত উঁচা।

হে হিরো আলমকে-নিয়ে-ট্রল-করা-সমাজ, আপনার মুখে কি নিম্নবর্গের সংস্কৃতির জয়গান তথা সাবোলটার্ন সোসাইটির কালচারাল ফাইট বা এই ভূখন্ডের মিথের সেলিব্রেটি-অসুর রাবণের পক্ষে গান গাওয়াটা মানায়? 

একটু ভেবে দেখবেন। 

আমিও প্রকৃতই হিরো আলমের সমাজের একজন। নগরের সুশীল দেবতা আর অশিক্ষিত-গরীব-আনস্মার্ট গেঁয়ো অসুরের এই দ্বিধা বিভক্ত সমাজে আমি আসলে অসুরগোত্রভুক্ত। 

আমি কৃষক ও গরিব সমাজের মানুষ। আমার পাড়ার খেলার সাথীরা বড় হয়ে কেউ গার্মেন্টেসে কাজ করতে গেছে, কেউ ওয়ার্কশপ দিয়েছে, কারো কৈশোরে বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ রোগে ভুগে মরে গেছে। অপেক্ষাকৃত অবস্থাপন্নরা অর্থনৈতিকভাবে ভালো আছে। 

তবে, আমার পাড়ায় খেলার সাথীদের বেশির ভাগই 'মান বাংলায়' কথা বলে না। তারা কথা বলে আঞ্চলিক ভাষায়। আমার বংশেও এলিট বা অভিজাত কেউ নেই; কিউ ছিল না কোনো কালে। তারাও আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। আমার বাবা আমাকে কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় 'পুত' বলে ডাকতেন। আমার মা আজো আমাকে দরদ ঢেলে 'পুত' বলে ডাকেন। 'সুশীল সমাজে' গেলেও আমার মা তার নিজের স্বচ্ছন্দ ভাষায় কথা বলেন। বুলি পাল্টে তাকে 'সুশীলিয় মান-বাংলার-বুলি' নিতে হয় না। 

আমি খেটে-খাওয়া পরিবারের মানুষ। আমার আত্মীয়-স্বজনেরাও সব গরীব। আমার বন্ধু-স্বজনদের মতন এবং হিরো আলমের মতন বাংলাদেশে এমন আরো কয়েক কোটি গরীব 'অ-সুশীল' আছেন যারা সুশীলীয় ‘হাই ক্লাস কালচার’ বোঝে না। তারা সুশীলীয় হাই-আর্ট-কালচারের সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারেন না। তারা সুশীলদের সাথে ‘এলিয়েনেটেড’ বা বিচ্ছিন্ন বোধ করে। অবশ্য সুশীলরাও যে তাদের সাথে একাত্মবোধ করেন না তার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অগণিত স্ট্যাটাস ও কমেন্ট। 

আমার উপর রাগ নিয়েন না। পারলে ক্ষমা-ঘেন্না করে দিয়েন। আর না পারলে সত্য বলার ধৃষ্টতা দেখানোর অপরাধে আমাকে নিয়েও ইচ্ছা হলে ট্রল করতে পারেন। আমিও দেখতে খাটো আর কৃশকায়। আমার থুৎনির দিকটাও দেখতে বানরের সাথে অনেকটা মিল আছে। আমিও হিরো আলমের মতন নিম্নবর্গের বিধায় আমারও কোনো প্রতিরোধ নেই।

নিম্নবর্গের প্রতিরোধ থাকে না বলেই তারা নিম্নবর্গ থেকে যায়। উচ্চবর্গেরা সব অর্জুনের মতন রাজরক্ত বহন করেন। আর হিরো আলমরা সব একলব্য। তাদেরকে আপনাদের সাথে এক পংক্তিতে বসতে না দেয়াই শ্রেয়।


আফরোজা সোমা, কবি ও সাংবাদিকতা বিষয়ে শিক্ষক

101
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail