• শুক্রবার, মার্চ ০৫, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:২৩ রাত

#মিটু যুগ: কাছা খোলার কাল (পর্ব-১)

  • প্রকাশিত ০৬:৩০ সন্ধ্যা নভেম্বর ১৯, ২০১৮
মানববন্ধন
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন/ ঢাকা ট্রিবিউন

কুরু শত্রুর হাতে তার নিগ্রহের কথা কী বলবো আর! দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কি আজো ঘটে চলছে না? কিন্তু হায়! এ যুগে সেই কৃষ্ণ কোথায়! ঘাটে-মাঠে-ঘরে-চলন্তবাসের ভেতর যিনি স্বয়ং বস্ত্র হয়ে দ্রৌপদীদের আব্রু ঢেকে দু:শাসনদের ব্রিবত করবেন!

ভারতীয় সনাতন ধর্ম মতে, সংসারে চার যুগ বিরাজিত ছিল। যথা: সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। 

তবে, অধুনা সংসারে যুগ বা কাল বিভাজনকে আমি ৫ ভাগে বিভক্ত করতে চাই। যথা: সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর, কলি ও মিটু যুগ বা কাছা খোলার কাল। 

সত্য যুগ: এই যুগে সংসারে পাপাচার বলে কিছু ছিল না। দুনিয়া ছিল স্বর্গসম। এই সূত্রে আপনি হয়তো কল্পনা করতে পারেন যে, কল্পনার এই যুগে নারী-নিপীড়নের কোনো ঘটনা ছিল না। আপনি হয়তো আশা করতে পারেন যে, নারী ও পুরুষ সেই কালে পরস্পর পরস্পরকে মানুষ্য জ্ঞান করে আচরণ করতেন। 

কিন্তু তা নয়। নারী ও পুরুষের সম্পর্কের দিক থেকে বিচার করতে গেলে নারীর জন্য সত্য যুগ বলে কিছু ছিল না। কারণ সত্য যুগেও নারী ছিল নিগৃহিত। আজও সেই নিগ্রহের স্বাক্ষী হয়ে আছে ভারতীয় পুরাণ। সত্য যুগে স্বয়ং ইন্দ্র অহল্যাকে ধর্ষণ করেছিলেন। ধর্ষণকাণ্ড নির্বিঘ্ন করবার জন্য তিনি অহল্যার স্বামী মহর্ষী গৌতমের রূপ ধরে এসেছিলেন খালি ঘরে। 

দেবতারই যেখানে এই দশা, মুনী-ঋষির স্ত্রী হয়েও যেখানে অহল্যারই রক্ষা নেই, সেখানে সেই কালে খেটে-খাওয়া সাধারণ নারীদের কী ছিল দশা তা হয়তো অনুমেয়।

ধর্ষক ইন্দ্রকে অবশ্য শাপ দিয়েছিলেন অহল্যার স্বামী। সেই শাপে দেবরাজের শরীরে সহস্র যোনী জন্মায়। শরীর ভরা যোনী নিয়ে বেচারা ইন্দ্র কী একটা বিতিকিচ্ছিরি দশায়ই না পড়েন!

ইন্দ্রের পাশাপাশি অহল্যাকেও শাপান্ত করেছিলেন গৌতম। রামের পদস্পর্শ না পাওয়া পর্যন্ত তাই অহল্যা পাথর হয়ে কাটিয়েছেন যুগের পর যুগ।

আজকের দিনেও, ধর্ষকের পাশাপাশি ধর্ষিতার গায়ে যখন পড়ে দোররার ঘা, তাকেও যখন দেওয়া হয় লোকলজ্জা-নিন্দা-অপমান, তখন দ্বিধান্বিত হই। বুঝতে পারি না, ঘটনাটা সত্যযুগে ঘটছে নাকি অহল্যাই সত্য যুগের মিথ্যে মায়া ছেড়ে নেমে এসেছেন আজকের সংসারে! 

ভারতবর্ষে বা পৃথিবীতে সত্য যুগ কখনো ছিল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে বটে। তবে, সত্য যুগ যদি পৃথিবীতে আদৌ বিরাজ করে থাকে তাহলে এর নমুনা কেমন হতে পারে? 

এই মর্মে উদাহরণ দিতে গিয়ে কেউ কেউ বর্তমান পৃথিবীর “নর্ডিক কান্ট্রি”গুলোর উদাহরণ দেয়ার চেষ্টা করে থাকেন। 

বলে রাখা ভালো, উদাহরণ হচ্ছে কমলা লেবু দিয়ে পৃথিবীকে বোঝানোর প্রচেষ্টা। অর্থাৎ কমলা লেবু আর পৃথিবী এক নয়। তবে, কমলা লেবু বা বাতাবী লেবুর গোলকত্ব দিয়ে ধরিত্রীর গোলকত্ব সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যেতে পারে বৈকি! 

ত্রেতা যুগ: এই যুগের বড় উদাহরণ সীতা। আহারে সীতা! দেবর লক্ষণের অপরাধে সতী ভাবী সীতাকে অপরণ করে নেয় রাক্ষস রাবণ। বহু লড়াই ও যুদ্ধের পর সীতাকে উদ্ধার করলেও সতীত্ব পরীক্ষার হাত থেকে তার রেহাই মেলেনি। 

অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে সীতাকে প্রমাণ করতে হয়েছিল নিজের সতীত্ব। কিন্তু অগ্নিপরীক্ষাও সীতার সতীত্ব নিয়ে সন্দেহ দূর করতে পারে না। সীতা গর্ভধারণ করলে, তিনি দুই পুত্র প্রসব করলে প্রজাকূলে সীতার চরিত্র নিয়ে ঢি ঢি পড়ে যায়। এই অবস্থায় দুই শিশুসহ সীতাকে পাঠানো হয় বনবাসে! 

স্বয়ং রাম যেখানে এমন কর্ম করতে পারেন সেখানে আমাদের জাতীয় ক্রিকেটারের আর কী দোষ বলুন! তিনি তো নিজের ফেসবুক পেজে স্ত্রীর সাথে তার বিবাহের দিন থেকে সন্তান জন্ম দেয়ার দিন পর্যন্ত দিন-তারিখের খতিয়ান দিয়েছেন মাত্র! সন্তানসহ স্ত্রীকে তিনি পাঠাননি বনবাসে! অতএব, রামের চেয়ে আমাদের ক্রিকেটার ভালো।

বেচারা সীতা! অগ্নি-পরীক্ষা দিয়েও সতীত্বের পরীক্ষায় সন্দেহাতীতভাবে উত্তীর্ণ হতে না পারায় সিঙ্গেল মাদার হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি বনবাসে যান! এই যুগের সিঙ্গেল মাদারদের কষ্টটা কি সীতার থেকে কিছু কম হবে, নাকি বেশি? তুলনা করে দেখা যেতে পারে বটে।

অবশ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুমানা মঞ্জুরও কি খানিকটা সীতা নন? বিদেশে পড়তে গেলে তার সতীপনা নিয়ে কি স্বামীর মনে উদ্রেগ হয়নি সন্দেহের? সেই সন্দেহই কি পরে পর্যবসিত হয়নি রুমানা মঞ্জুরের অন্ধত্ব বরণের ঘটনায়। 

রুমানা মঞ্জুরের কাহিনী অন্ধত্ব দিয়ে সমাপ্ত হলেও সীতার কাহিনী আরেকটু বাকি। বনবাসে বহু বর্ষ অতিক্রান্ত করার পর সীতাকে আবার রাম মেনে নেন বটে। কিন্তু এবারেও রাজ্যে ফেরার আগে সীতাকে দিতে বলা হয় অগ্নিপরীক্ষা। 

কিন্তু সীতার মন তিতা হয়ে গিয়েছিল সন্দেহবাতিক পতির প্রতি। তাই, ধরিত্রী মাতাকে মিনতি করে সীতা প্রবেশ করেছিলেন মাটির গহ্বরে। হায় সীতা! হায় সীতা! আজো কত সীতা দেবী করে তোমার দু:খ ধারণ!

দ্বাপর যুগ: এই যুগের নিপীড়নের কথা কী বলবো আর! দ্রৌপদীই এ যগের সেরা উদাহরণ। স্বয়ম্বর সভায় রূপবান অর্জুনকে একমাত্র পতি হিসেবে বরণ করে শ্বশুরালয়ে এসে তার পঞ্চস্বামী হয়! 

হায়! হায়! নারীর হৃদয় নাই কোনো। সে যে বস্তুসম। হায় বস্তু! হায় দ্রৌপদী! হায়রে উপায়হীনতা! 

পঞ্চপাণ্ডবের মা কুন্তী ছেলেদের বলেছিলেন, যা এনেছিস পাঁচ ভাইয়ে মিলে তোরা সব ভাগ-জোক করে নে। 

কী বিপত্তি! বস্তু তো নয়। সে যে মানুষ! সে যে মানবী এক! তবু সে বস্তু বলে বিবেচিত হয়। কী হবে উপায়! কী হবে উপায়!

উপায় আর কী! পালা করে পঞ্চপাণ্ডব মানে পঞ্চস্বামীর ঘরে দ্রৌপদী স্ত্রী রুপে ভূমিকা পালন করে যান। 

তিনি যে স্বেচ্ছায়, ভালোবেসে পঞ্চস্বামীকে বরণ করেননি মহাভারতের মহাপ্রস্থান দৃশ্যে তার প্রমাণ রাখা আছে। পঞ্চপাণ্ডব ও দ্রৌপদী যখন মহাপ্রস্থানের পথে ছিলেন তখন সবার আগে মৃত্যু হয় দ্রৌপদীর। 

মহাপ্রস্থান পর্বে প্রত্যেকেরই মৃত্যুর একটি করে কারণ উল্লেখ করা হয়। সেখানে দ্রৌপদীর মৃত্যুর কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, অর্জুনকে তিনি বেশি ভালোবাসতেন। অর্থাৎ যার ব্যাখ্যা দাঁড়ায় যে, পরিস্থিতির চাপে পড়ে পঞ্চস্বামীর ঘর করলেও মনে-মনে দ্রৌপদী আসলে ছিলেন কেবল একজনার! 

ইন্দ্রপ্রস্থের রাণী হয়েও স্বামী-সংসারে এভাবেই বস্তুর মতন কেটেছে পাঞ্চালীর জীবন। 

এছাড়া কুরু শত্রুর হাতে তার নিগ্রহের কথা কী বলবো আর! দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ কি আজো ঘটে চলছে না? কিন্তু হায়! এ যুগে সেই কৃষ্ণ কোথায়! ঘাটে-মাঠে-ঘরে-চলন্তবাসের ভেতর যিনি স্বয়ং বস্ত্র হয়ে দ্রৌপদীদের আব্রু ঢেকে দু:শাসনদের ব্রিবত করবেন!

(বাকি অংশ ২য় পর্বে প্রকাশিত)

আফরোজা সোমা, কবি ও শিক্ষক।


আরও পড়ুন: #মিটু যুগ: কাছা খোলার কাল (পর্ব-২)


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।

53
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail