• বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৮
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:০২ রাত

#মিটু যুগ: কাছা খোলার কাল (পর্ব-২)

  • প্রকাশিত ০৬:৪৩ সন্ধ্যা নভেম্বর ১৯, ২০১৮
মিটু
ছবি: সৌজন্য

সৎ পুরুষ মানুষ যে এই যুগে নাই তা নয়। তারা আছেন। কিন্তু আকছার নিপীড়নের যুগে তাদের কোনো যৌন পীড়নের কাহিনী নাই বলে তাদেরকে তাদের নিপীড়ক ভাই-বেরাদর ও বন্ধুরা আড়ালে ‘হিজড়া’, ‘বেডি-মুইখ্যা’ ও ‘ডরেলা’ বলে ডাকে

কলি যুগ: এই যুগে দেবলোক আর নরলোক একাকার হয়ে গেলো। এই যুগে ইন্দ্র আর কালা মিয়া আর লাল বাবুর আর কোনো বিভেদ রইলো না। নিগ্রহই এই কালে যুগ-ধর্ম বলে বিবেচিত হয়। 

এই যুগে কথা বা কাজে বা ইশারায় বা ইঙ্গিতে জীবনে কখনো না কখনো যৌন নিগ্রহ ঘটান নাই তেমন মানুষ হারিকেন দিয়ে খুঁজে বের করতে হয়। 


আরও পড়ুন: #মিটু যুগ: কাছা খোলার কাল (পর্ব-১)


তবে, সৎ পুরুষ মানুষ যে এই যুগে নাই তা নয়। তারা আছেন। কিন্তু আকছার নিপীড়নের যুগে তাদের কোনো যৌন পীড়নের কাহিনী নাই বলে তাদেরকে তাদের নিপীড়ক ভাই-বেরাদর ও বন্ধুরা আড়ালে ‘হিজড়া’, ‘বেডি-মুইখ্যা’ ও ‘ডরেলা’ বলে ডাকে। 

তাই, সৎ পুরুষ লোকেরা এই কালে বেশি আওয়াজ না দিয়ে চুপচাপ থাকে। কারণ পুরুষের সতিত্ব-ও এই কালে নিপীড়ক পুরুষদের কাছে মস্করা, বিনোদন ও রসের বিষয় বলে বিবেচিত হয়। 

তবে, এই যুগে নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো কোনো তেজী, রাগী, ঘাড় ত্যাড়া নারী রুখে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু মধ্যযুগীয় চিন্তায় তাদেরকে ডাইনি বলে বিবেচনা করা হয়। এই যুগের উদাহরন হলেন তসলিমা নাসরীন। 

চার্চের বিরুদ্ধে গিয়ে সত্য বলার অপরাধে এক সময় ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। ব্রুনোর মতই ক্ষমতা বলয়কে চ্যালেঞ্জ করায় গ্যালিলিওকেও পুড়িয়েই মারা হতো বটে। কিন্তু তিনি কায়দা করে মাফ চেয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন। জোয়ান অফ আর্ককেও পুড়িয়ে মেরেছিল কলি কালের ধর্মাবতারেরা।

তসলিমা নাম্নী ডাইনিকে অবশ্য পুড়িয়ে মারা হয়নি। তাকে শুধু তার মাতৃভূমি থেকে বিতাড়ন করা হয়েছিল। তাই, কলিকালের এই ডাইনির লেখায় বারবার এসেছে তার জন্মভূমি ব্রহ্মপুত্রের তীরে এসে বসে একটু নিজের মনে কেঁদে প্রাণ জিরোবার ব্যাকুলতা। 

#মিটু যুগ বা কাছা খোলার কাল: এই যুগে ঝাঁকে ঝাঁকে নারীরা তসলিমার মতন ডাইনি হয়ে যায়। তসলিমার মতন চরিত্রহীন হয়ে যায়।  

ইউরোপ-অ্যামেরিকা-বাংলা-ভারতসহ পৃথিবীর সবখানেই কোমলমতী অহল্যারা স্বেচ্ছায় তসলিমার মতন মুখরা হয়ে যায় ডাইনি হয়ে যায়।

আর ডাইনিরা 'নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ' করতে থাকে বলে নিপীড়কদের ভক্ত-মুরিদ-আশেকান-সাগরেদরা প্রচার করতে থাকে। 

কিন্তু এই কাছা খোলার কালে সংসার দুইভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। 

এই কালে সতি পুরুষরাও এসে তসলিমাদের সাথে ডাইনি ক্যাম্পে যোগ দেয়। কারণ নিপীড়িত নারীদের মতন  সতি পুরুষদের বাকও আসলে এতোকাল ছিল রুদ্ধ। তাই, কাছা খোলার কালে ডাইনি নারীদের মতন তারাও লুচু ইন্দ্রদের কাছা খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে ডাইনিদের পক্ষ নেয়; ডাইনিদের সাহস যোগায়। 

অতএব, বলা যায় মিটু যুগ বা এই কাছা খোলার কালই সকল যুগের মধ্যে নারীদের জন্য তুলনামূলক অনুকূল। 

কেননা, এই যুগে বুকের পাথর সরিয়ে অহল্যারা কথা বলছে। বস্ত্র ধরে কবে কোথায় টান মেরেছিল কোন দু:শাসন সেই কাহিনী হ্যাশট্যাগ মিটু লিখে দিকে দিকে অসংকোচে প্রকাশ করছে দ্রৌপদী সকল। কাছা খোলার এই কালে সীতাদের সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষা নেবার বদলে এখন সতি পুরুষদেরই বসতে হচ্ছে সতীত্বের অগ্নিপরীক্ষায়। 

এই পরীক্ষায় বোনাস নাম্বার পেয়ে পাশ করে যাবার বিধান স্বয়ং ইন্দ্রের জন্যে-ও নেই। তাই, এ কালের ইন্দ্ররাও ভীত। কখন যে কার গায়ে কার শাপে সহস্র যোনী জন্মাবে সেই ভয়ে ইন্দ্রেরা ইয়া নাফসী ইয়া নাফসী জপছেন।  

লক্ষণ বড় ভালো ঠেকছে। ইন্দ্রদেরই যদি এই দশা হয় তবে, যদু-মধু-রাম-শ্যামেরা একটু তো নড়ে চড়ে বসবেই।

আফরোজা সোমা, কবি ও শিক্ষক।

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।