• বৃহস্পতিবার, মে ২৮, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪১ সকাল

ডিএলএফকে আরেকটি খোলা চিঠি

  • প্রকাশিত ১২:২২ রাত নভেম্বর ২৫, ২০১৮
ঢাকা লিট ফেস্ট। ছবি: মাহমুদ হোসেন অপু/ ঢাকা ট্রিবিউন

ডিএলএফের আগের আসরগুলোতে বাংলাদেশের বাইরের প্যানেলিস্টরা তাদের মুখ খুলেছিলেন, যখন বাংলাদেশিরা তাদের চেপে ধরেছিল। আন্তর্জাতিক অতিথিদের এই আয়োজনে অংশগ্রহণের অবকাশ না দিলে, বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানার সুযোগ হতে বঞ্চিত হবে। যারা কোনো বাংলাদেশি অনুষ্ঠান বিদেশিদের বয়কট করতে বলে, তারে আসলেই গভীরভাবে বিভ্রান্ত

বাংলাদেশিরা শীতকালীন বিয়ে মৌসুমটিতে শুধুমাত্র দাওয়াত আর সাজগোজই উপভোগ করে না, বরং অনুষ্ঠান পরবর্তী খুঁত খুঁজে বের করে বিপুল আনন্দ ভোগ করে। সম্ভবত সামাজিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অষ্টম বছরে পা রাখা এবারের ঢাকা লিটারেরি ফেস্ট (ডিএলএফ)-এর মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে।

ডিএলএফ নামে পরিচিত লিটারেরি ফেস্টিভাল এর কাছে সমালোচনা নতুন কিছু নয়। অন্যান্য বড় বড় পাবলিক ইভেন্টগুলোর মতোই ডিএলএফের সত্য ভাষণ ও গঠনমূলক সমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে, যা দর্শকদের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এই দর্শকদের মধ্যে রয়েছে আগামীদিনের লেখক, শিল্পী ও চিন্তাবিদ।    

এ বছরের সমালোচনাগুলো বেশ খারাপ দিকে মোড় নিয়েছে। এ নিয়ে প্রধান দুটি অভিযোগ হলো—অনুষ্ঠানের আভিজাত্য আর বাকস্বাধীনতার বিষয়ে নিশ্চুপ থাকা।

প্রথমেই বলবো আভিজাত্যের জুজু বিষয়ে। প্রথমত, এমন একটি অনুষ্ঠান দাঁড় করাতে যে ধরণের যোগাড়যন্ত্র, খরচ ও ব্যক্তিগত সময় সংগঠকদের দিতে হয়, তা করার সক্ষমতা শুধু অভিজাতদেরই রয়েছে, বিশেষ করে যখন বর্তমানে সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি রয়েছে।

অনুষ্ঠানটি সব শ্রেণীর মানুষের জন্য কতটুকু উন্মুক্ত ছিল তা চিন্তা না করে সংগঠকদের তার ব্যাকগ্রাউন্ডের কারণে সমালোচনা করা নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে টানাটানি করা ছাড়া আর কিছুই না।   

বিশ্বের অন্যান্য অনেক অনুষ্ঠানের মতোই ডিএলএফ ছিল সম্পূর্ণ ফ্রি ও সবার জন্য উন্মুক্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতোই এ বছরে অনুষ্ঠানটিতে তিন দিনে প্রায় ৩০ হাজার দর্শক সমাগম হয়েছিল।  

এতো দর্শক সমাগম এই আয়োজনের বিরুদ্ধে কেবলমাত্র অভিজাত শ্রেণী দ্বারা সমাদৃত হিসেবে ওঠার অভিযোগকে অনায়াসেই নাকচ করে দেয়। ডিএলএফ শুধু মূল ধারার বাংলা সাহিত্যকেই তুলে ধরেনি, বরং আমাদের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও লোকশিল্পকেও ফুটিয়ে তুলেছে, যা ঢাকার অন্যান্য অনুষ্ঠানে দেখা যায় না।

যদি অনুষ্ঠানটির অনাভিজাত্য প্রমাণের জন্য শুধুমাত্র নিরক্ষর শ্রোতা-দর্শকদের অংশগ্রহণ বোঝায়, তবে কোনো সাহিত্য উৎসবই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না।

এবার আসা যাক বাকস্বাধীনতার বিষয়ে ডিএলএফের ভূমিকা প্রসঙ্গে। তারা কি কারাবন্দি থাকা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে নিয়ে যথেষ্ট করেছেন? একটি সাংস্কৃতিক উৎসব, যা মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের থেকে ভিন্ন প্রকৃতির, সেটি অধিকার নিয়ে কিই বা করতে পারে? 

প্রথম সত্যিটা হলো — শহিদুলের মুক্তির দাবিতে আন্দোলনকারীরা তার মুক্তির জন্য ডিএলএফ থেকে একটি বিবৃতি আশা করেছিল। ডিএলএফের পরিচালকদের কাছ থেকে আমি জেনেছি - শহিদুলের মুক্তির জন্য আন্দোলনকারীদের কেউ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি, যদিও তাদের (আন্দোলনকারী) অনেকেই এ বছর প্যানেলে ছিলেন।   

অনুষ্ঠানের পরিচালকরা শুধু তৃতীয় পক্ষের থেকে আশা, ধারণা এবং পরে নিন্দার কথাই শুনেছে। আমি এটাও জেনেছি শহিদুলের মুক্তির আন্দোলনকারীরা অনেকেই ডিএলএফের বিদেশি অতিথিদের উৎসবে অংশগ্রহণ না করার জন্য লিখেছিলেন।ডিএলএফের আগের আসরগুলোতে বাংলাদেশের বাইরের প্যানেলিস্টরা তাদের মুখ খুলেছিলেন, যখন বাংলাদেশিরা তাদের চেপে ধরেছিল। আন্তর্জাতিক অতিথিদের এই আয়োজনে অংশগ্রহণের অবকাশ না দিলে, বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে জানার সুযোগ হতে বঞ্চিত হবে। যারা কোনো বাংলাদেশি অনুষ্ঠান বিদেশিদের বয়কট করতে বলে, তারে আসলেই গভীরভাবে বিভ্রান্ত। 

এবারের ডিএলএফের তিনদিনে যা হয়েছে তা হলো— ডিএলএফের তিনজন পরিচালকই তাদের উদ্বোধনী বক্তব্যে বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন, যেমনটি তারা আগেও করেছেন।

তারা সংস্কৃতি মন্ত্রী ও সরকারের অন্যান্য প্রতিনিধিদের সামনে সরাসরি নতুন কঠোর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংস্কারের কথা বলেছেন। উৎসবের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানে নন্দিতা দাস ও ফিলিপ হেনসার উভয়েই শহিদুলের নাম উল্লেখ করে তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।   মুহাম্মদ হানিফসহ দেশ-বিদেশের বেশ কয়েকজন লেখক শহিদুলের মামলার বিষয়টি তাদের প্যানেলে তুলে ধরেছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে অনুষ্ঠানটির তিনদিনেই স্পষ্টভাবে শহিদুলের মুক্তি নিয়ে কথা হয়েছে এবং পাশাপাশি বাকস্বাধীনতার বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।    

মুক্তচিন্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের হত্যা (২০১৫ ও ২০১৬ সালে) এবং কারাবন্দিদের বিভিন্ন ঘটনা অথবা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের পুরোনো সংস্করণ নিয়ে প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়ে এই উৎসবের বাকস্বাধীনতা খোলাখুলি ও স্বচ্ছন্দভাবে তুলে ধরার ইতিহাস রয়েছে।

এটা উৎসবের পরিচালক ও প্যানেলের মাধ্যমে সবসময় অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও সমাপনীতে করা হয়েছে। যদি শহিদুলের মুক্তির জন্য আনুষ্ঠানিক বিবৃতি ব্যতিত আর কোনোকিছুতেই তার মুক্তিকামী জনগোষ্ঠী সন্তুষ্ট না হন, তবে অনুষ্ঠানের পরিচালকদেরও নিজস্ব কিছু যুক্তি রয়েছে - তারা শুধু একজনের জন্য এমন ব্যতিক্রম করতে পারেন না, তিনি যতই খ্যাতিসম্পন্ন বা নেটওয়ার্কসম্পন্ন হন না কেন। 

কেউ যদি বাকস্বাধীনতার ক্ষেত্রে ডিএলএফের গ্রহণযোগ্যতা স্বচ্ছভাবে পরিমাপ করতে চান, তাহলে তাদের ডিএলএফের আগের আট বছরের ইতিহাস দেখতে হবে। বাকস্বাধীনতা নিয়ে ডিএলএফের পরিচালকরা বক্তব্যে ও পত্র-পত্রিকায়, দেশে ও বিদেশে কথা বলেছেন এবং অন্যদের এমনটি করার জায়গা করে দিয়েছেন, যা অনেকেই করেননি। 

এক্ষেত্রে প্রকাশক শামসুজ্জোহা মানিকের কথা বলা যায়, যিনি ২০১৬ সালে প্রায় আট মাস জেলে ছিলেন এবং দমনমূলক আইনে অভিযুক্ত ছিলেন। ডিএলএফ এবং এটির পরিচালকরা তার বিষয়টি তুলে ধরেন, যখন অন্য কেউ (পেন ও কয়েকজন বাংলাভাষী অধিকারকর্মী বাদে) করেননি।

শহিদুলের মুক্তির জন্য যেমন জোরেশোরে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, মানিকের জন্য তা কোথায় ছিল? তিনি চোখে পড়েননি কারণ তিনি বাংলাদেশের আত্মসর্বস্ব ইংরেজিভাষী সুশীল সমাজ অথবা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না তাই? তাহলে অভিজাতমনা কারা; ডিএলএফ না এর সমালোচকরা?

ডিএলএফের জীবদ্দশাতেই বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদের দিকে মোড় নিয়েছে। শুধু বাকস্বাধীনতার জায়গা ছোট হয়ে আসছে তা নয়, বরং ভিন্নমত প্রকাশ করলে তাকে রাষ্ট্রবিরোধী তকমা দেওয়া হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে ডিএলএফকে অবশ্যই যেকোন ধরণের সাংস্কৃতিক অবমাননার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যাহোক, উদ্দেশ্যহীনভাবে সবদিক বিবেচনায় না রেখে কপটতা বা অসংস্কারের দায় অগঠনমূলকভাবে চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা এই ধরণের আয়োজন এবং তার সংগঠকদের জন্য অনান্তরিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশমাত্র- যদি আরো নেতিবাচক না ভাবতে চাই।

গত কয়েক বছর ধরেই ডিএলএফ শহিদুল আলম ছাড়াও অভিজিৎ রায় ও শামসুজ্জোহা মানিকের মতো মানুষদের নিয়ে কথা বলেছে। শহিদুল আলমের মুক্তির জন্য যারা প্রচারণা চালিয়েছেন তাদের আবেগ আমি বুঝি এবং সম্মান করি, এবং তাদের সাহসিকতার জন্য সম্মান জানাই।  

যাই হোক, ঢাকা এমন জায়গা না যেখানে প্রগতিশীলরা একে অপরকে অবজ্ঞা করবেন। যখন প্রগতিশীলতা রাষ্ট্র ও অ-রাষ্ট্রীয় - উভয় পক্ষের হুমকির মুখে, তখন আমাদের প্রকৃত বন্ধুদের শত্রু বানাবেন না। আমাদের একে ওপরের প্রতি যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদের সকলের সম্মিলিত কিছু দায়িত্বও রয়েছে। 

একজনের চাহিদার জন্য অন্যদের কাছে কিছু দাবি করা এবং যখন তারা ব্যর্থ হন তখন তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে নিন্দা করা - প্রকৃত শত্রুর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ থাকার চেতনাকে নষ্ট করে।

আমরা আনন্দিত যে শহিদুল আলম এখন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু আমরা আশা করি প্রগতিশীলরা তাদের মিত্রদের নিয়ে বিস্তৃত হবে-বিভক্ত নয়।



ইখতিসাদ আহমেদ একজন ফিচার লেখক ও কবি। ২০১৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্পের বই ‘ইয়োর্স’ ও ‘এটসেট্রা’ বেঙ্গল লাইটস বুকস থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

58
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail