• বুধবার, জুন ০৩, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৪ রাত

দিল্লীর বাতাস কেন এত দূষিত?

  • প্রকাশিত ০৩:২৯ বিকেল নভেম্বর ২৯, ২০১৮
দিল্লীর আকাশ
ছবি: রয়টার্স

ভৌগলিক অবস্থান এবং দারিদ্র্য সম্মিলিতভাবে ভারতের রাজধানীকে বিশ্বের অন্যতম দূষিত নগরীতে পরিণত করেছে।

যদিও দিল্লী পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা দূষিত বায়ুর নগরী নয়; ২০১৮ সালের বৈশ্বিক অবস্থানে সর্বেচ্চ দূষিত বায়ুর নগরীর তালিকায় প্রথম অবস্থানে রয়েছে উত্তর ভারতের অন্য একটি শহর "কানপুর", যেখানে ১৪ টি স্থানে সর্বেচ্চ দূষিত বায়ুর আলামত চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু ২৫ মিলিয়ন জনসংখ্যার নগরী দিল্লী অন্যান্য শহরগুলোর তুলনায় আকারে ও জনসংখ্যায় যথেষ্ট বড় হওয়ায় এর দূষিত বায়ু তুলনামূলকভাবে অধিক সংখ্যক মানুষের জনজীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করতে সক্ষম। প্রতি বছর প্রায় ৩০,০০০ দিল্লীবাসী এই বায়ু দূষণের প্রভাবজনিত কারণে অকালে মৃত্যুবরণ করেন; যদিও চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই হিসাব অতি নগন্য। কেননা আপনি যদি এখানে ক্রমশ বেড়ে চলা ফুসফুস ক্যান্সার, ডায়েবেটিস, অকালজাত শিশুর জন্ম এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রাপ্ত অটিজম-এ আক্রান্তের  কথা বিবেচনা করেন; তবে এই দূষণে ক্ষতিগ্রস্থ ও মৃতের সংখ্যা আরো বহুগুণ বেড়ে যাবে। দিল্লীর বাতাসে দৈনিক নিঃসরিত পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM2.5) মিহি ধুলোর পরিমাণ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রার চেয়েও ৬ গুণ বেশী। শীতকালে এর পরিমাণ আরো বেড়ে যায় এবং দিওয়ালী পরবর্তী সময়ে (বাজি-পটকা ফুটানোর ফলে) এই পরিমাণ প্রায় ৫০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া যায় যে, দিল্লীর বাতাসের দূষণের মাত্র যদি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক নির্ধারিত মাত্রায় নিয়ে আসা যায়; তবে দিল্লীবাসীর গড় আয়ু বর্তমানের তুলনায় ৯ বছর পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর বাতাস কেন এতো দূষিত?

এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে দিল্লীর বাতাসের ধোঁয়াশা (ধোঁয়া+কুয়াশা)-র মধ্যে। একটি কারণ হলো দিল্লীর ভৌগোলিক অবস্থান। উর্বর সমতল ভূমিবিশিষ্ট দিল্লীর বায়ু চলাচল ব্যবস্থা হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং বায়ু চলাচল এই পর্বতমালা দ্বারা বাধাগ্রস্থ হয়। গ্রীষ্মকালীন সময়ে ঘনীভূত উত্তাপ ধোঁয়াশাকে বায়ুমন্ডলের উচ্চতর স্তরে পাঠিয়ে দেয় এবং একই সময়ে ভারত মহাসাগর থেকে আসা মৌসুমী বায়ু এই ধোঁয়াশাকে আরো বৃহৎ পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়। শীতকালে সকালের কুঁয়াশা ধুলোকে ঘনীভূত করে মাটির সংস্পর্শে রাখে এবং কদাচিৎ পর্বতমালা থেকে আগত শীতল বায়ুপ্রবাহে এই ধুলো ঘনীভূত অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ধুলো এবং ধোঁয়া একত্রিত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

এই দূষণকারী উপাদানগুলো কোথা হতে আসে?

উষ্ণ আবহাওয়ার ফলে সৃষ্ট চিরাচরিত ধুলোবালির পাশাপাশি অসংখ্য নির্মাণাধীন স্থাপনা, লক্ষাধিক নিম্নমানের আস্তরবিশিষ্ট সড়ক, সড়ক নির্মাণে উচ্ছিষ্ট জ্বালানি দ্বারা বিটুমিন পোড়ানো, কয়লা জ্বালানি দ্বারা চালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শ্মশান চুল্লি, চাষের জমিতে আগাছা ও খড় পোড়ানো, কারখানা ও জ্বালানি চুল্লিতে সস্তা ও নিম্নমানের জ্বালানি তেলের ব্যবহার, লক্ষাধিক নিম্নমানের যন্ত্রাংশে চালিত যানবাহন এবং এগুলো কর্তৃক ব্যবহৃত নিম্নমানের জ্বালানি তেল,  ডিজেল চালিত লোকোমোটিভ রেল ইঞ্জিন ও জেনারেটর এবং রান্নার কাজে গরুর গোবর ও কাঠের চুল্লি ব্যবহার এখানে বায়ু দূষনের প্রধান কারণ।

দারিদ্র্য এই দূষিত পরিমণ্ডলকে আরো ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। হেমন্ত পরবর্তী সময়ে গম বা ধান তোলার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে জমিকে ধান চাষের উপযুক্ত করার জন্য ফসলের উচ্ছিষ্ট গোড়া বা শিকড় অপসারণ করার মতো ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে নেই। তাই এই উচ্ছিষ্ট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা কৃষকের কাছে সহজসাধ্য এবং এই চর্চা বহুকাল ধরে চলে আসছে। বছর দশেক আগে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ভয়াবহভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলির ধানচাষীরা বর্ষাকালের আগমন পর্যন্ত ধানচাষ বিলম্বিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও বর্ষাকালে পানির স্তর স্থিরাবস্থায় এসেছিল কিন্তু তাদের এই বিলম্বে চাষ করার ফলে ফসলের উত্তোলনকাল সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। এখন ধান উত্তোলনের পর কৃষকেরা যখন উচ্ছিষ্ট আগাছা পোড়ানো শুরু করেন তার আগেই বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে যায়। এই বিপুল পরিমাণ ধোঁয়ার মেঘকে অদৃশ্য করার মতো কোন বায়ুর প্রবাহ ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না থাকায় ধোঁয়াগুলি দক্ষিণ-পূর্বদিকে গিয়ে দিল্লীর আকাশে জড় হয়।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরো ঝুঁকির দিকে নিয়ে যায়। জ্বালানি  খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের স্বার্থে এতদিন ভারত সরকার ক্রমাগত কয়লা জ্বালানি র বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দূষনমুক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের তুলনায় অগ্রাধিকার দিয়েছে। প্রায় সকল কৃষক ডিজেল চালিত ট্রাক্টর, পাম্প ব্যবহার করেন বিধায় তাদের ভোট অর্জনের জন্য সরকার   ডিজেলের মূল্য পেট্রোলের চেয়ে কম নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ফলশ্রুতিতে ভারতের শহরগুলি লক্ষ লক্ষ দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী ডিজেলচালিত যানবাহনে ভরে গেছে এবং বর্তমান সময়ে গাড়ী নির্মাতা ও ক্রেতারা তাদের যানবাহনগুলির ক্ষেত্রে এই সস্তা জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন। 

বেইজিং শহর তার বাতাসে ধোঁয়াশাকে বিশোধন করতে প্রশংসনীয় অগ্রগতি দেখিয়েছে। বেইজিং এর সাথে দিল্লীর প্রধান বৈসাদৃশ্য হলো এর সরকার পরিচালন ও নেতৃত্ব ব্যবস্থা। শহরটির সরকার ব্যবস্থা নির্বাচন পদ্ধতির কারণে ধীরগতি পেয়েছে এবং একই শহর কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও স্থানীয় সরকার এই তিনধরনের সরকার ব্যবস্থার আওতায় থাকার ফলে সৃষ্ট ত্রিমুখী ব্যবস্থা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে জটিলতার সৃষ্টি করছে যা শহরের পরিবেশগত উন্নয়নকে ব্যহত করছে।

যদিও ইদানিংকালে এখানে উল্লেখযোগ্য কিছু অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ১৫ বছরের কিছু বেশী সময় ধরে শহরের অধিকাংশ বাস, ট্যাক্সি এবং অটোরিক্সা জ্বালানি  হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করছে। কিছু পরিবেশ দূষণকারী কল-কারখানা এবং কয়লা চালিত প্লান্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি বাসাবাড়িতে কাঠের বা তেলের চুলার পরিবর্তে গ্যাসের চুলার ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বছর কেন্দ্রীয় সরকার কল-কারখানায় ব্যবহৃত দূষণ সৃষ্টিকারী জ্বালানি  আমদানী নিষিদ্ধ করেছে এবং উচ্চ দহন ক্ষমতা বিশিষ্ট অক্টেন-পেট্রোল ও ডিজেল এর ব্যবহার চালু করেছে।  ২০২০ সালের মধ্যে ভারতে বিক্রিত সকল গাড়ী পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি  ব্যবহার করবে এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।  রাজ্য সরকার তার কৃষকদেরকে জমিতে ফসলের উচ্ছিষ্ট পোড়ানো থেকে বিরত রাখার জন্য চেষ্টা করছে। এই মাসে দিল্লীর বাতাসে ধোঁয়াশা ভয়াবহ রকমের গাঢ় হয়ে যাওয়ায় দিল্লীর স্থানীয় সরকার শহরে সকল লরী ট্রাকের প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে এবং বেশ কিছু নির্মাণ প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে।  হয়তো কোন একদিন এই সকল উদ্যোগের সম্মিলিত ফলাফল হিসেবে ভারতের এই রাজধানী শহর আবারো তার নীল আকাশকে ফিরে পাবে। কিন্তু সেটা কবে এই প্রশ্ন রয়েই যায়।


(দি ইকোনমিস্ট পত্রিকা অবলম্বনে)



55
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail