• রবিবার, আগস্ট ১৬, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৬ রাত

ধর্ষণ পরিক্রমাঃ যুদ্ধের ময়দান থেকে জাতীয় জীবনে

  • প্রকাশিত ০১:৫০ দুপুর এপ্রিল ১৭, ২০১৯
ধর্ষণ
পরিসংখ্যানে ধর্ষণ তথ্যসূত্র - অধিকার

বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬% নারী কোন না কোন ভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং ৭% নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন

যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষণকে অন্যান্য মারণাস্ত্রের মত একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সংস্থা উইমেনস মিডিয়া সেন্টারের তথ্যমতে, একাত্তরে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্তত চার লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, বাস্তবে এই সংখ্যাটি হয়তো আরও বড়। একাত্তরে কোনো কোনো নারী প্রতিদিন ৭০-৮০ বারও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্রায় ২০ লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। রুয়ান্ডায় এই সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ, কঙ্গোতে সাড়ে চার লক্ষ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত চলাকালে এই পরিসংখ্যান প্রায় একই রকম। জেনেভা কনভেনশনে ধর্ষণকে যুদ্ধাপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। যুদ্ধের ময়দানে অনেকেই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করেছে জাতিগত দমনের উদ্দেশ্যে এবং সেই ব্যবহার এখনো চলছে।

পূর্বের তুলনায় বর্তমান সময়ে সম্মুখ যুদ্ধের ঘটনা তুলনামূলক ভাবে অনেক কমই বলা যায়। মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকান কিছু অঞ্চলে  যুদ্ধাবস্থা চলমান থাকলেও আমাদের উপমহাদেশে শান্ত পরিস্থিতি বিরাজমান রয়েছে। স্বাধীনতার সুবাদে আমাদের দেশে যুদ্ধ ভিত্তিকধর্ষণ  থামলেও আমাদের জাতীয় জীবনে ধর্ষণ থামেনি। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা ‘অধিকারের’ দেয়া তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এদেশে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৩,৬৩৮ টি, যার ভেতরে গণধর্ষণ ছিল ২,৫২৯ টি। ধর্ষকদের বিষাক্ত দৃষ্টি থেকে বাদ যায়নি শিশু, প্রতিবন্ধী  থেকে ষাটোর্ধ্ব মহিলা কেউই। এই সময়ের ভেতর ৬,৯২৭ জন শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয় ১,৪৬৭ জনকে। ধর্ষণের গ্লানি সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন ১৫৪ জন। পরিসংখ্যানগুলো সত্যিই অনেক ভয়াবহ।

নারীর প্রতি এই সহিংসতা বিশ্বব্যাপী কমবেশি একই রকম। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৬% নারী কোন না কোন ভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে,  ৭% নারী সরাসরি ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। উন্নত অথবা অনুন্নত দেশ, সবখানেই একই চিত্র। আমেরিকায় প্রতি ১০৭ সেকেন্ডে একজন নারী ধর্ষণ অথবা যৌন নির্যাতনের শিকার হয় এবং বছর শেষে গড়ে এই সংখ্যা এসে দাঁড়ায় প্রায় ২,৯ ৩,০০০। শান্তির দেশ কানাডায় প্রতি ৪ জনে ১ জন নারী যৌন সহিংসতার শিকার হয়, বার্ষিক যা প্রায় ৪,৬০,০০০। মুক্ত গণতন্ত্রের দেশ গ্রেট ব্রিটেনে প্রতি বছর ৮৫,০০০ ধর্ষণের ঘটনা  ঘটে থাকে।

এই পরিসংখ্যান থেকে সহজেই স্পষ্ট হয় আমরা যাদেরকে উন্নত দেশের তকমা দিয়েছি, যাদেরকে সভ্য হিসাবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরা হয়, ধর্ষণের ব্যাধি সেখানেও ভীষণভাবে সংক্রামিত। আবার ক্ষুধা-দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত দক্ষিণ আফ্রিকায় শতকরা ৪০ ভাগ নারী ধর্ষণের শিকার, বছর জুড়ে ধর্ষণের সংখ্যা প্রায় ৫ লক্ষ। সুতরাং এটি পরিষ্কার ধনী হোক বা দরিদ্র, শিক্ষার হার বেশী বা কম সবখানেই ধর্ষণ একটি মহামারি আকার ধারণ করেছে। তবে উন্নত বিশ্বের ধর্ষণের সাথে অনুন্নত বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উন্নত বিশ্বে বেশিরভাগ ধর্ষণ হয় পরিচিতদের দ্বারা আর সেখানে পুলিশ কমপ্লেইন রেট অনেক বেশী। অপরদিকে অনুন্নত বিশ্বে পুরুষত্বের খায়েশ মেটানোর জন্য রাস্তা-ঘাটে অপরিচিতদের দ্বারা ধর্ষণের সংখ্যা বেশী আর পুলিশ কমপ্লেইন রেট তুলনামূলক ভাবে কম।

ধর্ষণের এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরেকটি চিত্র, সেটি হচ্ছে পরিসংখ্যানে ধর্ষণের যে তথ্য-উপাত্ত দেয়া হয় সেটি কেবল পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগ অথবা গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উপর ভিত্তি করে তৈরি। এই সংখ্যার বাইরেও আছে বিশাল আরেকটি সংখ্যা, যেখানে নারীরা লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের কথা প্রকাশ করে না। শুধু অনুন্নত বিশ্বে নয় উন্নত বিশ্বেও লোকলজ্জার ভয়ে  যৌন নির্যাতনের কথা গোপন করার পরিসংখ্যানটি ভয়াবহ। কানাডায় ১০০০ টি যৌন নির্যাতনের ঘটনার মাত্র ৩৩ টি পুলিশকে জানানো হয়, আমেরিকায় ৬৮% যৌন নির্যাতনের ঘটনায় নির্যাতিতরা পুলিশকে কিছুই জানায় না। উন্নত বিশ্বের অবস্থা এই হলে, বাংলাদেশের মত রক্ষণশীল দেশগুলোতে এই প্রেক্ষাপট কতখানি ভয়াবহ হতে পারে সেটি সহজেই অনুমেয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ধর্ষণ কেন হচ্ছে? কেনইবা ধর্ষণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে হু হু করে? এই প্রশ্নের উত্তর অনেকেই দিচ্ছেন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে। কেউ মনে করেন ধর্ষণের সাথে পরোক্ষভাবে নারীদের পোশাক জড়িত, কেউ মাদক-পর্নোগ্রাফি বা বিজাতীয় অপসংস্কৃতিকে দায়ী করেন ধর্ষণের কারণ হিসাবে। ধর্ষণের পেছনের অদৃশ্যমান আরেকটি কারণ কিছুটা হলেও উন্মোচন করেছে নারীপক্ষ নামক একটি সংস্থা তাদের গবেষণার মাধ্যমে। নারীপক্ষ তাদের গবেষণায় দেখিয়েছে , ২০১১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ছয়টি জেলায় ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে করা তিন হাজার ৬৭১টি মামলায় মাত্র ৪ জনের সাজা হয়েছে। ধর্ষণ মামলায় হাজারে সাজা হচ্ছে মাত্র চার জনের। মহিলা আইনজীবী সমিতির আরেক জরিপে দেখা যায় ধর্ষণ মামলার ৯০ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এসব মামলার ভেতরে যেগুলোর রায় হচ্ছে সেখানেও আছে দীর্ঘসূত্রিতা , এই সুদীর্ঘ সময়ে ধর্ষিতাকেও মনস্তাত্ত্বিক ধর্ষণের শিকার হতে হয় বছরের পর বছর জুড়ে।

ধর্ষিতারা লোকলজ্জার ভয়ে নির্যাতনকে গোপন করছেন, ধর্ষকেরাও পার পেয়ে যায় নানা ফন্দি-ফিকিরে এই সংস্কৃতিই হয়তো ধর্ষকামীদের ধর্ষণ করার সাহস যোগায়।

লেখাটি শেষ করব একটি দুঃখজনক সংবাদ দিয়ে। ময়মনসিংহে মেয়েকে ধর্ষণের অভিযোগে বাবা গ্রেফতার (bangla.dhakatribune.com, 13-04-2019)। আলাল হুদা নামের এক ব্যক্তি তার ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ুয়া মেয়েকে বিগত ৭ মাস ধরে ধর্ষণ করেছে। লোকলজ্জার ভয়ে এতদিন ঘটনাটি চাপিয়ে রাখলেও অবশেষে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় পুলিশ আলাল হুদাকে গ্রেফতার করেছে। কোন যুক্তি দিয়ে এই নির্মমতাকে ব্যাখ্যা করবেন? পিতার সামনে মেয়ের পর্দানশীলতা, পোশাকের শালীনতা অথবা বিজাতীয় সংস্কৃতির অগ্রাসন কোন তত্ত্বই এখানে প্রযোজ্য হবেনা। উচ্চ শিক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এত উচ্চ শিক্ষা নিয়েও যৌন হয়রানি করে, ধর্মীয় লেবাসধারী কিছু অসাধুরা ধর্মের জ্ঞান নিয়েও ধর্ষণে অংশ নেয়, নিম্নবিত্ত বাসের ড্রাইভার-হেলপারও ধর্ষকামী হয়ে উঠে কোন অজানা কারণে। মনগুলো ধর্ষকামী হয়ে ওঠার পেছনে অবাধ যৌনতা, পর্নোগ্রাফি, আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসন, অশালীন-আবেদনময়ী ফ্যাশন বা এরকম হাজারটা কারন থাকতে পারে তবে কঠোর সামাজিক প্রতিরোধই পারে এই সংস্কৃতির লাগাম টেনে রাখতে।

শিক্ষা-চেতনা অথবা অর্থনৈতিক বা সামাজিক অবস্থা কোন কিছু দিয়েই কে ধর্ষককে আলাদা করার উপায় নেই। ধর্ষকেরা শুধু একটি নির্দেশকের মাধ্যমেই চিহ্নিত হতে পারে সেটি হচ্ছে ধর্ষকামী মন। ধর্ষকামী এই মনগুলোকে ভয় দেখাতে হবে। ধর্ষণ করলে পার পাবার কোন সুযোগ নেই এমন একটি সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে, যেখানে কঠোর পরিণতির ভয়ে মনগুলো আর ধর্ষকামী হয়ে উঠবে না। ভারতে ধর্ষণের মহামারির সংবাদ শুনে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর দেই, নিজের দেশের সামাজিক অবক্ষয়ের পরিসংখ্যানগুলোর দিকেও একবার তাকিয়ে দেখা উচিত, আমরাও কিন্তু হাঁটছি ঘুণে ধরা একটি সমাজের দিকে, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা কমে আসছে দিনে দিনে।


লেখক একজন প্রকৌশলী এবং কলামিস্ট

101
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail