• মঙ্গলবার, আগস্ট ২০, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:২১ দুপুর

‘মিঞা সাহিত্য’ ও আসামের রাজনীতি

  • প্রকাশিত ০৯:২৬ রাত জুলাই ১৫, ২০১৯
আসাম
ছবিটি গত ৩০ মার্চ আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে ২৯৯ কিলোমিটার দূরের একটি চা বাগান থেকে তোলা হয়েছে। ছবি: এএফপি

আসামের রাজনীতি কয়েক দশক ধরে একই বৃত্তে ঘুরছে, ভাষা যার প্রধান অবলম্বন। অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ‘বিদেশি’ বিতাড়ন যারা প্রধানত ‘বাংলাদেশি’। যেখানে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিম উভয়েই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যদিও সেখানে বাঙালি হিন্দুদের চেয়ে বাঙালি মুসলিমরাই বেশি ভুক্তভোগী ও ঘৃণার শিকার হয়েছে। 

ভারতের উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ আসামের রাজধানী গুয়াহাটিতে গত শুক্রবার (১২ জুন) কয়েকজন কবির বিরুদ্ধে থানায় একটি মামলা হয়েছে। এসব কবি ‘মিঞা’ উপভাষায় লেখা কিছু কবিতায় আসামের সরকার কর্তৃক তৈরি নাগরিকত্বের তালিকা থেকে বাদ পড়া মানুষের (বিশেষত মুসলিম) দুঃখ-দুর্দশা তুলে ধরেছিলেন, যারা আসামে মিঞা হিসেবে পরিচিত। কাউকে সম্মান দিতে ‘মিঞা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয় না। আসামে এটা মূলত সেসব দরিদ্র মানুষের পরিচিতির ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়, যারা আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে আসামে অভিবাসন করেছিলেন। আসামে উর্বর অনাবাদী জমি চাষাবাদের জন্য হাতে নেওয়া কর্মসূচি সফল করতে এসব মানুষকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। সে সময় আসাম ও ময়মনসিংহ উভয় বঙ্গ বা বাংলা প্রদেশের অংশ ছিল।  

কবিদের বিরুদ্ধে ওই মামলাটি গুয়াহাটির প্যানবাজার থানা দায়ের করা হয়েছে, থানাটির পুলিশ অফিসার ইতোমধ্যে মামলাটি রেজিস্ট্রার করেছেন। কবিদের লেখায় সরকারের প্রহসনমূলক নাগরিকত্বের তালিকা (এনআরসি) ও একই সঙ্গে ‘ডি ভোটারস (ডাউটফুল বা সন্দেহজনক ভোটার)’ চিহ্নিতকরণের কারণে সৃষ্ট মানুষের দুর্দশার কথা বলা হয়েছে। মিঞা কবিরা তাদের কবিতায় নিজেদেরকে আসাম ও ভারতের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। মামলায় এসব কবিদের বিরুদ্ধে ‘বিশ্ববাসীর কাছে আসামের মানুষকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে’ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।      

ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিকত্ব তালিকা তৈরির কথা বলা হলেও মূলত এটি শুধু আসামেই পরিচালনা করা হচ্ছে। আসাম সরকার নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি কর্মসূচির মাধ্যমে সেখানকার বিরাট জনগোষ্ঠীকে ‘বিদেশি’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এক্ষেত্রে তাদেরকেই নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে, যাদের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সরকার ঘোষিত সমস্ত কাগজপত্র আছে অথবা যারা বা যাদের পূর্বপুরুষ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ মধ্যরাতের আগে আসামে প্রবেশ করেছেন, যারা এমন প্রমাণ দিতে পারছেন।  

প্রাথমিকভাবে তৈরি নাগরিকত্বের তালিকায় ৪১ লাখ মানুষ রয়েছেন, যাদের ভাগ্য অনিশ্চিত। এ বিষয়ে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান রাম মাধব, “চিহ্নিতকরণ, মুছে ফেলা ও বের করে দেওয়া’ তত্ত্ব দিয়েছেন। এর মূলকথা হলো- অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে হবে, ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম মুছে ফেলতে হবে এবং সবশেষে তাদেরকে দেশ থেকে বের করে দিতে হবে। কিন্তু দেশ থেকে তাদেরকে বের করে দিলেও বিপুল এ জনগোষ্ঠীকে কোথায় পাঠনো সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলেননি রাম মাধব। এ ক্ষেত্রে তিনি সম্ভবত বাংলাদেশকেই বুঝিয়েছেন কারণ এসব জনগোষ্ঠীর আদি নিবাস এক সময় বাংলাদেশেই ছিল। 

তবে মিঞাদের বিরুদ্ধে বর্তমান এই সংকট বিজেপি বা হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তৈরি করেনি। বরং এ সংকটকে উস্কে দিয়েছেন আসামের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিরেন গোয়াইন, যিনি অনেক আগে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজেও বিভিন্ন ধরণের আক্রমণাত্বক ভাষা ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত।    

গোয়াইনের অভিযোগ খুবই সাধারণ, মিঞা কবিরা তাদের নিজস্ব উপভাষায় লিখে থাকেন। কিন্তু গোয়াইন এ কাজের বিরোধী। তিনি চান কবিরা আসামীজ বা অসমীয়া ভাষায় লিখুক, আসামের ৫৫টি ভাষার মধ্যে অসমীয়াই প্রধান ভাষা।  গোয়াইনের মতে, এ চেষ্টা ব্যর্থ হলে ‘বহিরাগত শক্তি’ যেমন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আসামে সুযোগ নেবে। এ বিষয়টি যে কারো কাছেই খুব গোলমেলে লাগবে অন্তত যিনি আসামের জটিল রাজনীতি ও ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত নন। গোয়াইন যেমন ‘মিঞা’ পরিচিতির বিরোধী তেমনই ‘বহিরাগত’ বিজেপিরও বিরোধী। সাধারণ হিন্দু-মুসলিমের গতানুগতিক হিসাব প্রকৃতপক্ষে সেখানে খাটে না। তবে আসামে আসলে কি হচ্ছে?  

আসামের রাজনীতি কয়েক দশক ধরে একই বৃত্তে ঘুরছে, ভাষা যার প্রধান অবলম্বন। অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ‘বিদেশি’ বিতাড়ন যারা প্রধানত ‘বাংলাদেশি’। যেখানে বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলিম উভয়েই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যদিও সেখানে বাঙালি হিন্দুদের চেয়ে বাঙালি মুসলিমরাই বেশি ভুক্তভোগী ও ঘৃণার শিকার হয়েছে, বিশেষ করে ১৯৮৩ সালে আসামের নেলি হত্যাকাণ্ডের পর যেখানে রাতারাতি ২২০০ এরও বেশি বাঙালি মিঞা মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু এ ঘৃণ্য হত্যার ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়নি, যেমনটা করা হয়েছিল ২০০২ সালে গুজরাটে দাঙ্গার ঘটনায়। গুজরাট হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই এখনো জেলে রয়েছে।

অবশেষে এসব ঘটনায় বরং একটি কট্টরপন্থী সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যারা ভারত থেকে আলাদা হতে চায়। এ বিদ্রোহীরা  ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্টের (উলফা) ব্যানারে আন্দোলন করে যাচ্ছে। ভাগ্যের পরিহাস হচ্ছে, উলফা নেতৃত্বের সমাপ্তি হয়েছে বাংলাদেশে যেখানে কয়েকজন উলফা নেতা অতিথির মর্যাদা পেয়েছিল এবং তাদের সন্তানেরা বাংলাদেশি হিসেবে বেড়ে উঠেছিল। এই বিদ্রোহ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধ করেছে। এই যুদ্ধ পরিকল্পনা আসামের সাবেক গর্ভনর এস কে সিনহার মস্তিষ্কপ্রসূত যিনি উলফার সঙ্গে সহযোগিতার সীমারেখা টানেন এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদ নতুন রূপে উস্কে দেন।

বৃহত্তর অর্থে এসকে সিনহার পরিকল্পনাকে সার্থক বলা যায়। আসামের বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সেনোয়ালসহ বেশিরভাগ আসামীজ জাতীয়তাবাদীই এখন বিজেপির সদস্য। পুরনো ভাষাগত রাজনীতির বদলে সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু করে ভোটের মাঠে সুফল পেয়েছেন হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা, অন্তত বর্তমান সময়ের জন্য এবং বাঙালি ও আসামের হিন্দুরা এটি ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছেন। যদিও সব আসামীজ এটি খুশি মনে মেনে নিতে পারেননি। কারণ তারা বিশ্বাস করতেন এবং এখনও বিশ্বাস করেন তারা ‘বিশুদ্ধ আসামীজ’, তারা ওই মাটিরই সন্তান যারা স্থানীয়ভাবে ‘খিলোনজিয়া’ নামে পরিচিত। 

এটা ঠিক যে কেউই ‘বিশুদ্ধ আসামীজ’ নয়, তারা কখনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। মিঞা সাহিত্যের এই জটিলতর সংকট আসামের বিভিন্ন শ্রেণির নাগরিক ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর দ্বারাই প্রবর্তিত।