• বুধবার, অক্টোবর ১৬, ২০১৯
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:০৫ রাত

কিশোর বিদ্রোহ ও শহিদুল আলম

  • প্রকাশিত ০২:৩১ দুপুর আগস্ট ৯, ২০১৯
শহিদুল আলম
ছবি: শুভ্র কান্তি দাস

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা যারা শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে মাঠে নেমেছিলেন, নানানভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন

২০১৮। ২৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট কিশোর বিদ্রোহের এই সময়টার মধ্যে অনেককিছুর মেরুকরণ হলো। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অনেক উদ্দীপনা অনেক সম্ভাবনা পরিণত হলো একরাশ ভয় ও শঙ্কায়। তার ৫ মাস পরেই ছিলো জাতীয় নিবার্চন যার প্রস্তুতিও দেশজুড়ে চলছিলো ওইসময়ে। এতোকিছুর মাঝে খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চর্চার ‘অতি সাহসের’ পুরস্কারস্বরূপ গ্রেফতার হন ৫ আগস্ট। আজ থেকে ১ বছর আগে। কেউ কল্পনাও করেনি রাজনৈতিক অ্যারেস্ট লিস্টে এইরকম একজন ব্যক্তি আছেন যিনি সমাজের প্রগতিশীল, গণতন্ত্রকামী, সর্বজনমহল ও আলোকচিত্রজগতে পরিচিত, উচ্চশিক্ষিত, রসায়নে পিএইচডি, দেশে-বিদেশে সুনাম কুড়ানো এবং ক্যামেরা হাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা মুহূর্তের সাক্ষী!!! বাকিদের বেশি না বাড়ার আগাম হুঁশিয়ারিই ছিলো এই গ্রেফতার। বেশি বাড়াবাড়ি আর সাহস দেখালে কিভাবে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া যায় তার একটা নমুনা শহিদুলের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানান দেওয়া হলো।

তাঁর ‘অপরাধ’ ছিলো, তিনি সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। ছবি, ভিডিও, লাইভ পোস্ট ও সাক্ষাৎকারের মধ্যদিয়ে একাজ করেছিলেন। যেধরনের সমালোচনা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক ও বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলো এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলও করে আসছিলো। নতুন কোনও সমালোচনা সেখানে তেমন কিছু ছিলো না। উল্টো করে বললে সরকারি ভাষায় সরকারকে ‘বিব্রতকর’ অবস্থায় ফেলবার ‘ঘোরতর অপরাধে’ দুষ্ট ছিলেন তিনি। একেবারে ফিল্মি কায়দায় গ্রেফতার। ডিবি অফিস, থানা-পুলিশ-রিমান্ড, মারপিট, জেল-জুলুম--এরপর শুরু ব্র্যান্ডিং। সরকারের সমালোচনা করলেই যেসব ব্র্যান্ডিং হরেদরে হয় সেসবই কমন পড়লো শহিদুলের কপালেও--- দেশদ্রোহী, উস্কানিদাতা, গুজব ছড়ানোর হোতা ইত্যাদি ইত্যাদি!!! মনে রাখা দরকার, শহিদুল আলম তাঁর ‘স্ট্রাগল ফর ডেমোক্রেসি; ম্যানি ফেসেস অব ওয়ার ১৯৭১, ক্রসফায়ার, কল্পনা চাকমা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সুন্দরবনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য পরিচিত।

শহিদুলসহ অন্যান্যদের গ্রেফতার, হামলা, নির্যাতনে বুঝতে বাকি থাকলো না---শহিদুলের মতো বিশিষ্টজনের হাল যদি বেকায়দা-বেহাল করা যায় তাহলে বাদ বাকিদের কী হতে পারে। তার নানা প্রচারণাও ছিলো। ভীতি ছড়ানো হচ্ছিলো বেশ কায়দা করে।

চারপাশটা গুমোট ছিলো নির্বাচনকাল পর্যন্ত। নির্বাচনের আগে আগেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, আন্তর্জাতিক মহলে দাবি ওঠার পর শহীদুল জামিনে ছাড়াও পেলেন ২০ নভেম্বর, প্রায় ১০৭ দিন পর। ততদিনে জেলের জানালায় বাসাবাঁধা ছোট্ট চড়ুই পাখি, পাশের সবজি বাগান, টগর, শিউলি আর কয়েদিদের সাথে ভাব হয়ে গেছে শহিদুলের। জেলের দেয়ালে ছবি আঁকা, পালতোলা নৌকার ছবি দেখা কত কী? শরীরের ব্যথা-যন্ত্রণা-কাশি-শ্বাসকষ্ট-চোখের সমস্যা এমনকি নির্যাতনের নানান উপসর্গ যেন ভুলে যেতেন তিনি কখনো সেই ছোট চড়ুইয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে।

আর কারাগারের বাইরের প্রহরী, অফিসার, ক্যান্টিনের ছেলেপেলে, পুলিশ, চা-পান দোকানদার সবারসাথে সখ্য হয়ে যায় রেহনুমার আহমেদের। বলতে গেলে প্রায় প্রতিদিন জেলের কিচির-মিচিরের সাক্ষাৎ ঘরে দেখা করেন শহিদুলের সাথে। প্রতিদিন কেরানিগঞ্জের ধুলিমাখা পথ পেরিয়ে আসা-যাওয়ায় মাঝেই জেলের হাওয়া-বাতাস, মানুষজন সব পরিচিত হয়ে ওঠে রেহনুমার। কখনো ২/১ জন সাথে করে কখনোবা দল বেঁধে পৌঁছে যেতেন ৬০/৭০ জনের কিচিরমিচির জানালার কাছে, যেখানে অপেক্ষায় থাকতেন শহিদুল। 

এত শক্তি ওইসময়ে কোথা থেকে রেহনুমাকে ভর করেছিলো কে জানে? হয়তো মাথা না নোয়াবার সাহসই ভেতর থেকে ব্যক্তি রেহনুমার শক্তিকে আরো কয়েকগুণে বাড়িয়ে দিয়েছিলো। ব্যারিস্টার সারা হোসেন আর জ্যোতির্ময় বড়ুয়াসহ অন্যান্যদের সাথে নিয়ে মামলা-মোকদ্দমাসহ সব ঝক্কি পোহাতো হয়েছে তাঁকে। চারপাশের খোঁজখবর-সমন্বয় কিভাবে সামাল দিয়েছে, রেহনুমার চেয়ে ভালো কে জানে! সেসময়ে রেহনুমার মনে ক্রোধ, ভালোবাসা, ভয়, অবসাদ, লড়াই, শক্তি, বিষন্নতা, ফের মরিয়াপনা কোনটা কখন কিভাবে কাজ করেছে সেও রেহনুমার চেয়ে বেশি কে জানে!!

জেলের দিনগুলোতে বাইরে থেকে শহীদুলের মুক্তির দাবিতে আলোকচিত্রীসহ প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তি, বাম গণতান্ত্রিক জোট, লেখক বুদ্ধিজীবী, ছাত্র সমাজ, আইনজীবীরা লড়েছে দেশে। দেশের বাইরেও শহিদুলের মুক্তির দাবি ওঠে বড় পরিসরে। ১১জন নোবেল বিজয়ীসহ বিশিষ্টজনেরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শহিদুলের মুক্তির জন্য সোচ্চার হন। এই পুরো সময়ে অনেকে কাছে এসেছে, কেউ দূরে সরেছে, কেউ দূরেও ঠেলেছে। এভাবেই চলতে থাকে টানাপোড়েনের দিনগুলো।

চট্টগ্রামের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, ছাত্র ফেডারেশনের নেতা মারুফ, আশাফসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকেই ওইসময়ে গ্রেফতার হলেন। হেলমেটবাহিনী ও ক্ষমতাসীনদের পালোয়ানরা হাড়হাড্ডি ভাঙলো কিশোর আন্দোলনকারীদের, সাংবাদিকদের, পথচারীদের, সমর্থকদের। আন্দোলনে নারীদের হয়রানি করা হবে এমন গুজবসহ আতঙ্ক ছড়ানো হলো। এসব হলো যাতে নারী শিক্ষার্থীরা ভয়ে আন্দোলনে অংশ না নেয়। একইসাথে আন্দোলনের প্রাণ কিশোররা যাতে ভয় পেয়ে বাড়ি ফিরে যায়। ওইসময় গ্রেফতার হলেন অভিনেত্রী নওশাবা। এভাবে অনেক মাশুল দিতে হলো কিশোর বিদ্রোহকে।

শহিদুল বা কিশোরদের কী হতো এতে ‘সাহস’ আর ‘বাড়াবাড়ি’ না করলে? কী দরকার ছিলো বিপদ পায়ে পড়ে ডেকে আনার--এরকম নানা গুঞ্জনও ছিলো? কী হতে পারতো আর কী হয়েছে-- এসব সম্ভাবনা নিয়েও হিসেব কষা হয়েছে।

নিঃসন্দেহে শহিদুলের মুচলেকা দিয়ে, মাথা নত করে, সরকার বাহাদুরকে কুর্নিশ করে আগে আগে বাড়িতে ফেরার দারুণ সুযোগ ছিলো। তাতে আমাদের হাঙ্গামা-টেনশন কমতো। রাতের ঘুম হারাম হতো না। কোনকিছু নিয়ে সাতপাঁচ ভেবেভেবে পা ফেলতে হতো না। ক্ষমতা সম্পর্ক যোগান নানা কিছু দহরম-মহরম বাড়তো। অনেককিছু থেকেই নিজেকে, সকলকে ও আরো কিছুকে রক্ষা করা যেতো। কিন্তু যা হারাতে হতো তা হলো সম্মান। শুধু শহিদুল না, একটা সময় নতজানু সময়ের স্মারক হয়ে থাকতে পারতো। যে নতজানু দাসের জীবন আমরা এই সমাজে প্রতিনিয়ত বয়ে বেড়াচ্ছি। দাসানুদাস মনের জয়গান হতো। অনেক না হওয়ার মাঝে বরং যা হলো তাইবা কী কম? তাতে হারানোর ভয় থাকলেও শক্তিতো কম ছিলো না।

শহিদুল গ্রেফতার, জেল থেকে বেরিয়ে চুপ না করে, গুটিয়ে না গিয়ে, উল্টো নিজের মত মাথা উঁচু করে থাকা; আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণা। শহিদুলের গ্রেফতারের মধ্যদিয়ে আমরা আলোকচিত্রীরাও অনেককিছু নতুন করে উপলব্ধি করতে পেরেছি। আমাদের সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা ও করণীয় বিষয়ে। সেইসব করণীয় একা করা যায় না। একসাথে করতে হয়।

সময়ের ইতিহাসে সাক্ষী আলোকচিত্রীরা আগামীতে কিভাবে নিজেদের কাজ নিয়ে, ঐক্য নিয়ে, আলোকচিত্র নিয়ে সাক্ষ্য দিয়ে যাবে তা আমাদের ভাবতে হবে । ভাবতে হবে দেশপ্রেমিক জনগণকে, এই দেশটায় পরবাসী কয়েদি জীবনযাপন করবো, না নতুন করে গড়বো। সীমানা পেরিয়েই সেসব ভাবনাকে অগ্রসর করার ও একসুতোয় বাঁধার কাজ এখন। নতুন স্বপ্ন দেখতে নতুন করে সব গড়তে এখন সেই সীমানা পেরুবার সময়।

অভিবাদন সড়ক আন্দোলনের কিশোরদের, অভিনন্দন শহিদুল আলমকে। অভিনন্দন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাইদুল ইসলাম, ছাত্র ফেডারেশনের নেতা মারুফ, আশাফসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেফতার হওয়া এবং নির্যাতনের শিকার কিশোর ও সাংবাদিক বন্ধুসহ সকলকে।

ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা যারা শহিদুল আলমের মুক্তির দাবিতে মাঠে নেমেছিলেন, নানানভাবে প্রতিবাদ করেছিলেন। অভিবাদন সকলকে যারা দুঃসময়ে ভীতু ভোঁতা সমাজে শান দিতে পাশে ছিলেন। যারা দূরে থেকেও কাছে ছিলেন তাঁদেরও। আমাদের মেলা কিছু করার আছে বাকি।

সালাম আলম ভাই (শহিদুল আলম)।


লেখক: তাসলিমা আখতার, আলোকচিত্রী ও সভাপ্রধান গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।  ঢাকা ট্রিবিউন এর কোনও ধরনের দায় নেবে না।