• শনিবার, এপ্রিল ০৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩৫ রাত

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে জরুরি এনজিওগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়

  • প্রকাশিত ০৬:০১ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ৯, ২০১৯
ধর্ষণ-নারী নির্যাতন
প্রতীকী ছবি

‘স্বাধীনতার পর থেকে নারীর জীবনমানে অকল্পনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি বরং নিত্যনতুন কৌশল ও পন্থায় নারীর প্রতি পাশবিকতা এবং নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে’

পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে এগিয়ে যাওয়া বা অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ে বিগত দুই দশকে দেশের নারীরা দারুণ এগিয়েছে। কর্মক্ষেত্রে অনেকেই অর্জন করছেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। তবে শত সাফল্য ও প্রশংসার গল্প থাকলেও নারী নির্যাতন বা জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতার ইস্যুতে এখনও কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

“নারী-পুরুষ সমতা, রুখতে পারে সহিংসতা” স্লোগানকে প্রতিপাদ্য করে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ-২০১৯। নারীদের নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবছরই পক্ষটিকে গুরুত্বের সাথে পালন করে থাকে। এ উপলক্ষে আয়োজন করা হয়ে সভা-সেমিনার, র‌্যালি, গোলটেবিল বৈঠক, নাট্যেৎসব ইত্যাদির।

এতো পদক্ষেপ সত্ত্বেও যৌন হয়রানি, ধর্ষণ-গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক শোষণ নারীর প্রতি এসব অবিচার ও সহিংসতার পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। 

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৩০ জন নারী ধর্ষণ ও ৩৭ জন নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর গত পাঁচ বছরে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। পাশবিকতার শিকার এসব নারীদের ৮৬% শিশু-কিশোরী।

তবে বাস্তবচিত্র আরও ভয়াবহ। মুখের কথা নয়, তেমনটাই উঠে এসেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসেবে। শুধু চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে দুই হাজার ৮৩ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

কোথাও যেন নারীরা নিরাপদ নন। না ঘরে, না বাইরে। এমতাবস্থায় গণপরিবহনে হয়রানির ঘটনাও নৈমিত্তিক। ২০১৮ সালে উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজধানীর গণপরিবহনে যাতায়াতকালে ৯৪ ভাগ নারীই যৌন হয়রানির শিকার হন!

এসব তথ্যের বাস্তবতা অস্বীকার করছেন না বিশেষজ্ঞরাও। নারী নির্যাতনের বর্তমান চিত্র নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার বিষয়ক গবেষক ড. নাসিম আখতার হোসাইন বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে নারীর জীবনমানে অকল্পনীয় পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু এই সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা তো কমেইনি বরং নিত্যনতুন কৌশল ও পন্থায় নারীর প্রতি পাশবিকতা এবং নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে।”

মাঠ পর্যায়ে কাজের সীমাবদ্ধতা

একজন নারীর পাশে দাঁড়াতে গেলে কেবলমাত্র আইনগত সহায়তাই যথেষ্ঠ নয়। ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজন হয় আশ্রয় ও নিরাপত্তার। কিন্তু সেসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ দেখা যায় না। সরকারি পর্যায়ে যতটুকু উদ্যোগ দেখা যায়, সমন্বয়ের অভাবে সেসব জায়গায় রয়ে যায় তথ্যের ঘাটতি। ফলে কাজ করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা পড়েন সমস্যায়।

‌‌‌‌‌‌প্রতিবছরের ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ পালিত হয়। সংগৃহীত

জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা রোধে ইউএনএফপিএ-এ কারিগরি ও নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের আর্থিক সহায়তায় জামালপুর, পটুয়াখালী, বগুড়া ও কক্সবাজারের ১২টি উপজেলায় “আস্থা” নামের একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে আসক। এই প্রকল্পে নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রয়োজনের সময় বিভিন্ন সরকারি সেবা পেতে সহযোগিতা করা হয়। আর সে জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছে আস্থা প্রকল্পের কেসওয়ার্কাররা। আর প্রকল্প এলাকার থানা ও আদালতে অবস্থিত নারী সহায়তাকেন্দ্রের মাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীলতা ও সারভাইভারের গোপনীয়তা মেনে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হয়।

প্রকল্পের জামালপুর জেলার সমন্বয়ক সাবিনা ইয়াসমিন জানান, “অসহায় নারীদের সহায়তা করতে ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রধরে এলাকায় কাজ করা অন্যান্য এনজিও কর্মকর্তাদের কাছে নিয়ে যাই, অনুরোধ করি তারা যেন ওই নারীর অসহায়ত্বের দিকটি দেখভাল করেন। এতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপদাপন্ন নারী উপকৃত হন। আমার মনে হয়,সংস্থাগুলোর মধ্যে যদি একটা বোঝাপড়া থাকতো তবে এসব নারীদের জীবনে দারুণ একটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসতো।”

বিচ্ছিন্নতা নয় প্রয়োজন সমন্বয়

সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা বিলোপ ও প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে অসংখ্য এনজিও। শুধু নির্যাতন বিলোপ বা প্রতিরোধই নয় এদেরমধ্যে কোনো কোনোটি পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্যাতনের শিকার নারীদের চিকিৎসা, কাউন্সিলিং এবং আইনগত সহায়তার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করছে। 

তবুও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। তবে নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোকে একটি প্ল্যাটফর্মে আনা গেলে লক্ষ্য অর্জন অনেকটাই সহজ হতো।

ব্র্যাকের উদ্যোগে “গার্লস নট ব্রাইডস”এর উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বাল্যবিবাহ বন্ধের কার্যকর পদ্ধতি, আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় ইত্যাদি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০১২ সালে এর যাত্রা শুরু। বর্তমানে এর সদস্য ২৬টি এনজিও। বাল্যবিবাহ রোধে এই প্ল্যাটফর্মের সাফল্য দারুণ প্রশংসিত হয়েছে বলে জানান ব্র্যাকের জেন্ডার, জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি কর্মসূচির সমন্বয়কারী নিশাত সুলতানা।

একইভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ২০টি এনজিও নিয়ে তৈরি হয়েছে “হিউম্যান রাইটর্স ফোরাম” নামের আরেকটি নেটওয়ার্ক। দেশের মানবাধিকার ইস্যুতে এই প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে মানবাধিকার পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তনে যুগোপযোগী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এক্ষেত্রে একক প্রচেষ্টার চেয়ে সমন্বিত উদ্যোগ অনেক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হকের মতে, “সিঙ্গেল ভয়েজের চেয়ে সমন্বিত ভয়েস অনেক শক্তিশালী। এতে উদ্দেশ্য অর্জনও সহজ হয়। সরকার, এনজিও ও ডোনারদের আরও আগেই উচিত ছিল এবিষয়ে নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের একটি জায়গা তৈরি করা। আমরা সরকারি কাজের দীর্ঘসূত্রিতার কথাও জানি, তাই পরিস্থিতির বিবেচনায় নিয়ে এনজিও বা ডোনাররা নিজেদের প্রয়োজনে, দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে একটি ডায়ালগের ব্যবস্থা করতে পারেন। তাতে নিশ্চয় ভালোকিছু বের হয়ে আসবে।”

জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে এনজিওগুলোর মধ্যে সমন্বয় থাকাকে দারুণ আইডিয়া বলে মন্তব্য করেন নিশাত সুলতানা। 


আবু আজাদ, সংবাদকর্মী

**************************************************************************************************************

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।