• সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৪ রাত

সস্তা শ্রমের দুষ্টচক্রে বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত ০৬:২৪ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ২৩, ২০১৯
শ্রমবাজার
দেশের জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগেরই শ্রমের মূল্য অত্যন্ত সস্তা মেহেদী হাসান/ঢাকা ট্রিবিউন

কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে। দুঃখজনক হলেও ডুইং বিজনেস ইনডেক্সে ১৮৯ দেশের ভেতর বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ক্রমহ্রাসমান হলেও ২০১৮ সালে সার্বিক দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগেরই শ্রমের মূল্য অত্যন্ত সস্তা। মাদারীপুরের মনির হোসেন যেদিন দিনমুজরি করতে পারেন সেদিন আয় করেন ৫০০ টাকা, বছরের কয়েকমাস আবার কাজ থাকে না। সবমিলিয়ে তার সারাবছরের দৈনিক গড় আয় ২০০ টাকার খুব বেশি হবে না।

Industrial Reserve Force বা শিল্পীয় রিজার্ভ বাহিনী বলে একটি বিষয় আছে, কোনও রাষ্ট্র বা সমাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ কর্মহীন থাকলে তাদের শিল্পীয় রিজার্ভ বাহিনীর অন্তর্গত বলে বিবেচনা করা হয়। মূলত মনির হোসেনের মত মানুষদের ওপর ভিত্তি করেই শিল্পীয় রিজার্ভ বাহিনী গড়ে ওঠে, আর এর ফায়দা লোটে কিছু অতি মুনাফালোভী মালিকগোষ্ঠী। বাংলাদেশ একটি অতি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, আমাদের দেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ১,১১৫ জন মানুষ বসবাস করে যেখানে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দেশ ভারত ও চীনে এই সংখ্যা ৪১৬ ও ১৪৫। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সহজলভ্যতা সত্যিই অনেক দূরুহ।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ব্যাবসাবান্ধব পরিবেশ ও নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে। দুঃখজনক হলেও ডুইং বিজনেস ইনডেক্সে ১৮৯ দেশের ভেতর বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৬তম। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের অভাবও আমাদের দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে একটি অন্যতম প্রধান কারণ। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার প্রকাশিত “ওয়ার্ল্ড এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল আউটলুক-২০১৮” শীর্ষক প্রতিবেদনের সাথে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এদেশে বেকার ছিল ২৮ লাখ, ২০১৯ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৩০ লাখে ওঠার আশঙ্কা করছে তারা।

এই বিপুল পরিমাণ দরিদ্র ও বেকার জনগোষ্ঠীকে দিয়ে সহজেই কম বেতনে কাজ করানো যায়। যেখানে কাজ পাওয়াটাই অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য সেখানে সস্তা শ্রমের বিষয়টিকে তারা স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয়। তাদের অনেকেরই আশংকা থেকে যায় তাদের পরিবর্তে সুবিশাল বেকার বাহিনী বা Industrial Reserve Force থেকে নতুন কাউকে নিয়োগ দিয়ে না দেয়। বাংলাদেশে একজন শ্রমিকের মাসিক গড় আয় ১০৯ মার্কিন ডলার, যেখানে ভারতে শ্রমিকের গড় আয় ২৬৫ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে শুধু কম দামে দিনমজুরই পাওয়া যায় না, উচ্চশিক্ষিত দক্ষ পেশাজীবীদের শ্রমের মূল্যও এখানে কম। একজন প্রকৌশলীর বাংলাদেশে গড় বেতন ২৮৭ মার্কিন ডলার যেখানে ভারতে তা ৪৯২ মার্কিন ডলার ও পাকিস্তানে ৫৯১ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে সবক্ষেত্রেই শ্রমের মূল্য সস্তা। দক্ষিণ এশিয়ায় সবথেকে সস্তা শ্রম পাওয়া যাবে বাংলাদেশে।

জাপান ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৯টি দেশের উপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখিয়েছে এই দেশগুলোর ভেতর সবচেয়ে সস্তা দামে শ্রমিক পাওয়া যাবে বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী, দারিদ্র্যের হার ও প্রতিবছর কর্মবাজারে বেকার জনগোষ্ঠীর প্রবেশ ইত্যাদি কারনে শিল্পীয় রিজার্ভ বাহিনীর পরিধি প্রতিনিয়ত বড় হচ্ছে। একশ্রেণীর অসাধু মালিকপক্ষ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিনিয়ত কর্মরতদের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত করে চলছে। সার্বিক বিষয়টি সস্তা শ্রমের এক অশুভ দুষ্টচক্রে পরিণত হয়েছে। এই দুষ্টচক্রে সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এদেশের শ্রমজীবী মানুষ। রাত-দিন পরিশ্রম করেও তাদের ভাগ্যের চাকা ঘোরে না। মানসম্পন্ন একটি জীবনের স্বপ্ন তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়। গড়পড়তা দিনে ১৮৫ টাকা আয় করে পরিবার নিয়ে জীবন ধারণ করা কতখানি সম্ভব বিষয়টি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করলে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। সত্যিকার টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমের যথাযথ মূল্য দিতে হবে, অন্যথায় মানবেতর জীবনযাপনের অজস্র গল্পে একসময় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যাবে। সস্তা শ্রমের এক অশুভ দুষ্টচক্র থেকে আমরা কবে বেরিয়ে আসতে পারব সেটিই হবে আগামীদিনের প্রধানতম চ্যালেঞ্জ।


ফজলে রাব্বী খান, প্রকৌশলী ও কলামিস্ট

*****************************************************************************************************************

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।