• বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৬, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩৬ রাত

যে কারণে সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করা উচিত

  • প্রকাশিত ০৬:১৫ সন্ধ্যা জানুয়ারি ৬, ২০২০
ট্রাম্প খামেনি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের সবোর্চ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। সংগৃহীত

যুদ্ধে দুনিয়ার কোথাও জনগণের কোনো ফায়দা হয় না। ফায়দা হয় অস্ত্র ব্যবসায়ী আর অদূর দৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের। আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়

২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের যুদ্ধবিরোধী মানুষ। তাদের ধারণা ছিলো, ট্রাম্প যেহেতু হিলারি ক্লিনটনের মতো ‘‘যুদ্ধবাজ’’ নন, তাই তার পররাষ্ট্রনীতি অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ হবে। তাদের অনেকেই ট্রাম্পের বর্ণবাদী, উগ্র জাতীয়তাবাদী, নারীবিদ্বেষী, অভিবাসীবিদ্বেষী, মুসলিমবিদ্বেষী চিন্তাচেতনার বিরোধী হলেও অন্তত এই একটি প্রশ্নে ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থনযোগ্য বলে মনে করতেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে দুই কোরিয়ার মধ্যে যে ঐতিহাসিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ট্রাম্পের ভূমিকা তার “শান্তিকামী ভাবমূর্তিকেই” শক্তিশালী করেছিলো।

কিন্তু এই ভাবমূর্তিতে প্রথম ফাটল ধরে জেরুজালেম ইস্যুতে। ঐতিহাসিক কারণে জুদাইজম, ক্রিশ্চিয়ানিটি ও ইসলাম- তিন ধর্মের অনুসারীদের কাছেই জেরুজালেম একটি পবিত্র শহর। ইহুদিদের পশ্চিম দেয়াল, ক্রিশ্চানদের চার্চ অফ দি হোলি সেপুলচার আর মুসলমানদের আল-আকসা মসজিদের অবস্থান এই শহরে। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েল জেরুজালেম দখল করে নেওয়ার পর থেকে এটি অধিকৃত ফিলিস্তিনি অঞ্চলসমূহের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ইসরায়েল ও পিএলওর মধ্যে স্বাক্ষরিত অসলো চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম জেরুজালেম ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পূর্ব জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকার কথা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে। ট্রাম্প সেই জেরুজালেমকে ইসরায়েলের হাতে তুলে দিয়ে জায়নবাদী রাষ্ট্রটির প্রতি যে পরিষ্কার পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করলেন তা ইহুদি ইসরায়েলি ও আরব-ফিলিস্তিনিদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সত্যিকার শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে রুদ্ধ করে দেয়। ফিলিস্তিনের ওপর জায়নবাদী ইসরায়েলের যে বর্ণবাদী-ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব এর মাধ্যমে সেটাকেও বৈধতা দেওয়া হলো।

পাশাপাশি, ট্রাম্প চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালেন। এই যুদ্ধে মার্কিন অর্থনীতি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নাকি চীনের অর্থনীতি, এই নিয়ে স্কলারদের মধ্যে দৃশ্যমান মতবিরোধ আছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের অর্থনৈতিক নীতির চর্চাবিষয়ক অধ্যাপক জেসন ফারম্যান মনে করেন, এই যুদ্ধে চীনই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, যদিও সেটা সামাল দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে তাদের রাজনৈতিক সামর্থ্য বেশি। উল্টোদিকে, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক অ্যালিসন কার্নেগি মনে করেন, ট্যারিফের অর্থনৈতিক খরচের পাশাপাশি এই বাণিজ্যযুদ্ধ বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বস্ততা ও সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেশটির দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্য স্বার্থকে বিপন্ন করে তুলেছে। এই দুই মতামতের যেটিই সত্য কিংবা সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী হোক না কেনো, বিশ্ব অর্থনীতি যেহেতু কোনো একটি রাষ্ট্রের বিষয় নয়, তাই শেষ পর্যন্ত এই বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড়ো ক্ষতিটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের জনগণেরই হবে। পরোক্ষভাবে সেটা অন্যান্য রাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। যা মোটেই ইতিবাচক নয়।

ট্রাম্পের শান্তিকামী ভাবমূর্তির যা কিছু অবশিষ্ট ছিলো, ড্রোন হামলায় ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি কাশেম সোলায়মানি হত্যাকাণ্ডে ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। সিরিয়া যুদ্ধে সোলায়মানির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও ইরাকের মাটিতে ইরানের একজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ব্যক্তিত্বকে হত্যা করা সব ধরনের আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ও চূড়ান্ত হঠকারিতা হিসেবেই বিবেচিত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এই ঘটনার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে।

মূলতঃ ইউরোপিয়ান ঔপনিবেশবাদ ও অংশতঃ নিজেদের ধর্মীয় ও জাতিগত ভেদবুদ্ধির কারণে মধ্যপ্রাচ্য এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিগ্রহে পরিপূর্ণ একটি অঞ্চল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন চালিয়ে সেখানে যে অনন্ত যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছিলো তারই ধারাবাহিকতায় আইএসের মতো ধর্মাশ্রয়ী রক্তপিপাসু শক্তির উত্থান ঘটেছে। তাদের কথিত খেলাফতের পতন ঘটানো গেছে বটে, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায়, জঙ্গিদের পাশাপাশি বহু বেসামরিক মানুষের রক্ত ঝরেছে। সৌদি আরব অথবা ইরান, তুরস্ক অথবা সংযুক্ত আরব আমিরাত, যে-ই হোক এসব যুদ্ধবিগ্রহ সব ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রেরই ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ উদ্ধারের কাজে এসেছে। সিরিয়া আর ইয়েমেন শিশুদের গণকবরে পরিণত হয়েছে। এই গল্পে কোনো হিরো নেই, সবাই ভিলেন। ট্রাম্পের এই নিধনযজ্ঞের আগুনে ঘি ঢাললেন মাত্র।

ইরান ইতোমধ্যেই জানিয়েছে, তারা “প্রচণ্ড প্রতিশোধ” নেবে। এটা যে নিছকই কথার কথা নয়, রাশিয়া আর চীনের সঙ্গে তাদের সম্মিলিত সামরিক মহড়া থেকে সেটা বোঝা গেছে। যুদ্ধ বেধে গেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্র রাষ্ট্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কোন পক্ষে থাকবে বলার অপেক্ষা রাখে না।

যুদ্ধ বাধলে বিপুল অর্থক্ষয় আর প্রাণহানি ঘটবে। দুই রাষ্ট্রেই উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রবণতা শক্তিশালী হবে। জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে একদিকে মার্কিন সরকার আর অন্যদিকে আয়াতোল্লাহরা সর্বপ্রকার ভিন্নমতাবলম্বীকে দেশদ্রোহী অপবাদ দেওয়ার সুযোগ পাবে। তাতে দুই দেশেই উদার বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণায় বিশ্বাসী মানুষেরা কোণঠাসা হবে, দুই দেশেই মানবাধিকার কর্মীরা কোণঠাসা হবে। ফিরে আসবে “বুশ ডকট্রিনঃ হয় তুমি আমার পক্ষে, আর না হয় আমার বিরুদ্ধে”। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসবে নাগরিক অধিকার সংকুচিত করা নানাপ্রকার নিপীড়নমূলক আইন, ফিরে আসবে গুয়ানতানামো বে আর আবু ঘারিব। ইরানে এভিন আর কাহরিজাখের মতো ভয়ংকর নিপীড়নমূলক কারাগারগুলোও কথিত দেশদ্রোহীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে, সিরিয়া যুদ্ধে যেমনটা ঘটেছিলো কুখ্যাত সেদেনিয়া কারাগারের ক্ষেত্রে।

ফিরে আসবে জিহাদিরাও। আইএসের খেলাফতের পতন ঘটলেও তারা এই যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যে দেশে দেশে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে। অন্য জিহাদী মতাদর্শী গোষ্ঠীগুলোও ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগটা হাতছাড়া করবে না। ইরান বিরোধিতার নামে তারা আক্রমণ চালাবে শিয়াদের ওপর। ইরাকে আইএসের উত্থানের পেছনে নূরী আল-মালিকীদের যে সুন্নিবিরোধী নীতি অংশত দায়ী ছিলো, তার পুনরাবির্ভাব দেখা যাবে, ইরান-ব্যাকড শিয়া মিলিশিয়া বাহিনীগুলো জিহাদিদের বিরুদ্ধে লড়ার নামে সুন্নিদেরকে আক্রমণ করবে। ঘটবে সাম্প্রদায়িকতার বিস্তার। এতে আখেরে সব সম্প্রদায়ের মানুষই বিপন্ন হবে।

তুরস্ক আর ইসরায়েলও এই যুদ্ধের ফায়দা নেবে। কুর্দিদের বিরুদ্ধে এরদোগান যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছেন, তা মার্কিন-ইরান যুদ্ধের কারণে আড়ালে পড়ে যাবে, এতে তুরস্কেরই লাভ। একই ঘটনা ঘটবে ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি জুলুমনিপীড়ণের ক্ষেত্রেও।

আরব বসন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ফিরে আসছে মনে হচ্ছিলো। কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত ভেদবুদ্ধিজনিত কারণে নয়, নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে, ইরাক থেকে লেবাননে জ্বলে উঠছিলো বিদ্রোহের আগুন। এই যুদ্ধ সেই আগুনে পানি ঢেলে দেবে।

একমাত্র প্রতিরোধযুদ্ধ ছাড়া, আর কোনো যুদ্ধে, দুনিয়ার কোথাও জনগণের কোনো ফায়দা হয় না। ফায়দা হয় অস্ত্র ব্যবসায়ী আর অদূর দৃষ্টিসম্পন্ন রাজনীতিবিদদের। আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়।

আশার কথা, অনেকেই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছেন। আগামী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অন্যতম প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সম্ভাব্য মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। এই অন্ধকার সময়ে এমন মানুষেরাই আশান্বিত করেন। যুদ্ধের জন্য মাস হিস্টেরিয়া তৈরি করা সহজ। ডুগডুগি বাজানো সহজ। ঢের বেশি কঠিন যুদ্ধের অমানবিকতা বুঝতে পারা। আমাদের উচিত এই কঠিন কাজটাই করাঃ মৃত্যুবণিকদের তাবৎ উসকানি উপেক্ষা করে আসন্ন মার্কিন-ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।


ইরফানুর রহমান রাফিন রাষ্ট্রচিন্তার সদস্য এবং মুক্তিফোরামের সম্পাদকমণ্ডলীর অন্যতম সদস্য

*****************************************************************************************************************

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনও ধরনের দায় নেবে না।

55
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail