• রবিবার, মার্চ ২৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৯:৪০ রাত

করোনাভাইরাস ঝুঁকিতে পর্যটনশিল্প

  • প্রকাশিত ০২:৩৪ দুপুর মার্চ ৮, ২০২০
করোনাভাইরাস
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী কমছে ভ্রমণকারীর সংখ্যা। ছবিতে যাত্রীবিহীন হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ব্লুমবার্গ

বিগত কয়েকদিনে চায়নাগামী অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, কমে গেছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যন্ড, ইন্দোনেশিয়াগামী ফ্লাইট। ফলে স্থানীয় ভ্রমন সংস্থাগুলো এয়ার টিকেট, ভিসা সহায়তা, ট্যুর প্যাকেজ বিক্রয় করতে অসমর্থ হচ্ছে

করোনাভাইরাস, দুনিয়াব্যাপী এক আতঙ্কের নাম। সারাবিশ্বের আমদানি-রফতানি নির্ভর ব্যাবসার পাশাপাশি যে শিল্পটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা হচ্ছে পর্যটনশিল্প।

৩০ শে জানুয়ারি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা COVID-১৯-এর প্রাদুর্ভাবকে জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ইলেকট্রন অণুবীক্ষণ যন্ত্রে ভাইরাসটি দেখতে অনেকটা মুকুটের মত। তাই ল্যাটিন করোনা থেকে নেওয়া হয়েছে এর নাম, যার অর্থ মুকুট। শুরুর দিকে যদিও করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধীর গতিতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে এর দ্রুততা বৃদ্ধি পায়। চীনের বাইরে বিশ্বব্যাপী পর্যটনশিল্পে এই করোনাভাইরাস মহামারি রূপ নিয়েছে।

করোনাভাইরাস প্রথম ১৯৬০-এর দশকে আবিষ্কৃত হয়। শুরুরদিকে এটা মুরগির শরীরে ব্রঙ্কাইটিস ভাইরাস হিসেবে দেখা গেছে। পরবর্তীতে ২০০৩, ২০০৪, ২০০৫ সালে ভিন্ন ভিন্ন রূপে মানবশরীরে অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে চীনের উহান থেকে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে ফিরে আসে “নোভেল করোনাভাইরাস” নামে। প্রথমদিকে এটি চীনে স্থানীয়ভাবে সাধারণ চায়না ভাইরাস নামে পরিচিত ছিলো। পরবর্তীতে মরনঘাতী রূপ নিলে বিশ্বব্যাপী আশংকায় রূপ নেয়।

কোভিড -19 বা করোনাভাইরাস নামের নিউমোনিয়া জাতীয় রোগের প্রভাব মূলত এশীয় মহাদেশজুড়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। যার প্রভাবে সঙ্কুচিত হচ্ছে এশিয়ার পর্যটন শিল্প। ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল এর তথ্য মতে, ২০১৭ সালে চীন তাদের মোট আয়ের ৮৮৪ বিলিয়ন ডলার অবদান রেখেছে। গতবছরের শেষ তিনমাসে ১৭৩ মিলিয়ন চীনা পর্যটক বিদেশে গেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গতবছরের তুলনায় চায়না ভ্রমণকারীদের সংখ্যা ৫৫ শতাংশ কমেছে। সামগ্রিক বিশ্বপর্যটনে চীনা পর্যটকরা সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে। অন্যদিকে সারাবিশ্বের সাথে প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যসেবা ছাড়াও চীনের সৌন্দর্য দেখতেও ভ্রমণ করেন অনেক পর্যটক।

বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী পর্যটন বাজারে চীন ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল। শুধুমাত্র ২০১৭ সালেই তারা প্রায় ২৫৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। আশঙ্কা করা যায় চীনের পরে থাইল্যান্ড ও হংকংয়ের আঘাত করবে।

এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের হোটেল ও এয়ারলাইনসগুলি চরম লোকসানের মুখোমুখি। এখন প্রতিদিনেই ফ্লাইট ক্যান্সেল হচ্ছে আন্তর্জাতিক রুটে। একইভাবে সাধারণ চলাফেরা বেশ নিয়ন্ত্রিত।

পশ্চিমাদের বাজার হরাচ্ছে এশীয় হোটেলগুলো। মেরিয়ট বরাতে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলে তাদের সম্ভ্যাব্য আয়ের থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলার কম আয় হবে। অবস্থা অনুযায়ী এটার হার বৃদ্ধি পেতে পারে। হিলটন (এইচএলটি) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বুকিং ও আয় কমেছে। সংস্থাটির সিইও ও প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টোফার ন্যাসেট্টা বলেছেন কোম্পানির পুরো বছরের উপার্জন থেকে ২৫ মিলিয়ন থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে। এছাড়াও কোরিয়া, ইতালির

কিছু শহর ছাড়াও বেশ কিছু ইউরোপীয় শহরে ক্ষতির আগাম খবর দিয়েছে। বন্ধ হওয়ার আশঙ্কায় আছে অনেক রেস্টুরেন্ট, ক্যাসিনো, ফুডকোর্ট সহ বিভিন্ন ব্রান্ড স্ট্রিট শপ। শপিং কমপ্লেক্সগুলোতেও কমে গেছে মানুষের আনাগোনা। বহির্বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় পর্যাটনশিল্পও ঝুঁকির সম্মুখীন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশ ভারত, ভুটান, নেপাল ছাড়া সবচেয়ে বেশি ভ্রমণের দেশসমূহ হচ্ছে- চীন, থাইল্যান্ড, মালায়শিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, দুবাই।এছাড়াও কর্মসংস্থানের জন্য মধ্যপ্রাচ্যে ভ্রমণকারীর সংখ্যাও কম নয়। বিগত কয়েকদিনে চায়নাগামী অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়েছে, কমে গেছে সিঙ্গাপুর, থাইল্যন্ড, ইন্দোনেশিয়াগামী ফ্লাইট। ফলে স্থানীয় ভ্রমন সংস্থাগুলো এয়ার টিকেট, ভিসা সহায়তা, ট্যুর প্যাকেজ বিক্রয় করতে অসমর্থ হচ্ছে। বেশ বড় অর্থনীতিক ঝুঁকিতে আছে দেশীয় পর্যটন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ। তবে আশার কথা হচ্ছে এখনো বাংলাদেশের ইনবাউন্ড বা ডোমেস্টিক ট্যুরিজমে করোনার প্রভাব পরেনি।

কোন দেশের কেমন ক্ষতি হচ্ছে?

আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান সংস্থা বলেছে যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলি সম্ভবত জাপান ও থাইল্যান্ডের হবে। সংস্থাটি এই মাসের শুরুর দিকে অনুমান করেছিল যে জাপান ১.২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যটন উপার্জনে হারাতে পারে, তারপরে থাইল্যান্ড $ ১.১৫ বিলিয়ন ডলার।

ব্যাংক অব ইন্দোনেশিয়ার তথ্য অনুসারে, এক মাসে তাদের পর্যটন লোকসান করেছে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইন্দোনেশীয় দ্বীপ বালিতে ৪০,০০০ এরও বেশি হোটেল বুকিং বাতিল করা হয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংস্থার এক হিসেব অনুসারে, নতুন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাব থেকে আন্তর্জাতিক বিমানের বিধিনিষেধের কারণে জানুয়ারি-মার্চ মাসে জাপান পর্যটন উপার্জনে ১.২৯ বিলিয়ন ডলার হারাতে পারে।


এইচ, এম, তারিকুল ইসলাম

পর্যটন বিশ্লেষক ও পরামর্শক, এছাড়া তিনি মারভেলাস বাংলাদেশের সিইও ও ফাউন্ডার 

*****************************************************************************************************************

প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।