• শুক্রবার, মে ২৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৪ দুপুর

রাত খুব গভীরে, প্রভাত আরও দূরে

  • প্রকাশিত ১০:৩৫ রাত এপ্রিল ৩, ২০২০
প্রবীণ নাগরিক
প্রতীকী ছবি/পেক্সেলস

আজকের যুবকরাও শিখলেন- পুঁজিপতিদের লভ্যাংশ বৃদ্ধিতে কোনো কার্যকরী অবদান রাখতে বিন্দুমাত্র অক্ষমতা মানে আপনাকে এ সমাজের আর দরকার নেই

করোনাভাইরাস আক্রমণের সময় ধনী কিংবা গরীব, উচু কিংবা নিচু শ্রেণী, বিশ্বাসী অথবা অবিশ্বাসী, ধার্মিক অথবা অধার্মিক, শিশু-যুবক-প্রবীণ কারও প্রতিই বাছ-বিচার করছে না ঠিকই, কিন্তু প্রাণহানির মতো সর্বোচ্চ ক্ষতিসাধনের ক্ষেত্রে অন্যান্যদের চেয়ে প্রবীণদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রদর্শন করছে। 

একটি শান্তিপূর্ণ, পক্ষপাতহীন ও কার্যকর অংশীদারিত্বমূলক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মোট ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ১৯৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানেরা ‘‘ট্রান্সফরমিং আওয়ার ওয়ার্ল্ড: দ্য ২০৩০ এজেন্ডা ফর সাসটেইনেবল ডেভলপমেন্ট’’ শীর্ষক একটি কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ২০১৬ সাল থেকে শুরু হওয়া (চলবে ২০৩০ সাল পর্যন্ত) বিশ্বমানবতার সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে প্রণীত এই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সুফল থেকে ‘‘কেউই বাদ যাবে না’’ মর্মে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও আন্তঃরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসণে জোর দেওয়া হয়। নির্ধারিত ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে অন্যতম হলো ‘‘স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করা ও সব বয়সের সবার কল্যাণে কাজ করা।’’ 

আমরা দেখেছি করোনাভাইরাস মহামারিতে সাড়াদানের ক্ষেত্রে, উন্নত ও পিছিয়ে পড়া উভয় সমাজ ব্যবস্থায় প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রতি অমানবিক, অনভিপ্রেত রূঢ় ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসে মৃত্যুহার প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বেশি হওয়ায় আমরা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সম্ভাব্যতা যাদের বেশি, আর্থিকমূল্য বিবেচনায় যারা বেঁচে থাকলে পুঁজি সমৃদ্ধ হবে, তাদের প্রতিই গুরুত্ব দিয়েছি। পক্ষান্তরে আজকে যারা প্রবীণ, যারা এক সময় আমাদের মতোই যুবক ছিলেন, যারা জামার আস্তিনে লুকানো প্রেম আর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে জমানো শক্তি দিয়ে গড়ে তুলেছেন ভবিষ্যতের পৃথিবী। তাদেরকে অবহেলা করেছি সুনিপুণ কৌশলে, সুচারুরূপে। 

ফলে, আজকের যুবকরাও শিখলেন- পুঁজিপতিদের লভ্যাংশ বৃদ্ধিতে কোনো কার্যকরী অবদান রাখতে বিন্দুমাত্র অক্ষমতা মানে আপনাকে এ সমাজের আর দরকার নেই। এই আচরণ আজকের যুব সমাজকে আরও বেশি স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক ও পক্ষপাতপ্রবণ হয়ে উঠতে প্রলুব্ধ করল এবং একইসঙ্গে বেঁচে যাওয়া প্রবীণদেরকে আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করা হলো। আমাদের ভয় হয় আজ থেকে ৩০ বছর পরে অর্থাৎ ২০৫০ সালে বিশ্বের মোট প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে, সেদিন হয়তো আজকের অন্যায্য সুবিধাভোগী যুবকেরা আজকের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবেন।

এই মহামারীতে সাড়া প্রদানের জন্য আমরা যথেষ্ট সক্ষম ছিলাম। তবে-

১. সচেতনতা কার্যক্রমে স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। ৪,৫৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিটিতে ৫-৭ সদস্য বিশিষ্ট ১৩টি করে স্থায়ী কমিটি আছে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে রয়েছে ৩৬-৪০ সদস্য বিশিষ্ট ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, ২২-২৭ সদস্য বিশিষ্ট ইউনিয়ন ওয়াটসান কমিটি। প্রতিটি ইউনিয়নে ১৩জন করে জনপ্রতিনিধি এবং ১০জন গ্রাম পুলিশ সদস্য আছেন। প্রতিটি ওয়ার্ডে ৯-১৪ সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্ড ওয়াটসান কমিটি ও ওয়ার্ড উন্নয়ন কমিটি আছে। সারা বাংলাদেশে ১৩,৭০২ বা অধিক সংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিক আছে যেখানে প্রতিটিতে ৩জন মূল সেবাদানকারী, ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি করে কমিউনিটি গ্রুপ ও ৩টি করে কমিউনিটি সাব গ্রুপ আছে। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে যেখানে এটি পরিচালনার জন্য ১৭ সদস্য বিশিষ্ট একটি করে কমিটি আছে। এছাড়াও, গ্রাম পর্যায়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল পরিচালনা কমিটিসহ বিভিন্ন এনজিও'র গ্রাম উন্নয়ন কমিটি বা সমমনা কমিটি বা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত সব সদস্যই সংশ্লিষ্ট গ্রাম বা ইউনিয়নের প্রতিনিধি ব্যক্তি। তারা প্রত্যেকেই সরকার ও এনজিও কর্তৃক বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এসব কমিটির মোট সদস্য নির্ধারণের জটিল অঙ্ক না মিলিয়েই নিঃসন্দেহে এটা বলা যায় যে, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবেলা ও করোনাভাইরাসসহ নানাবিধ মহামারিতে সাড়া প্রদানে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, জনসংযোগ (কমিউনিকেশন উইথ কমিউনিটি) স্থাপন এবং সচেতনতা সৃষ্টিতে সাধারণের চেয়ে তুলনামূলকভাবে দক্ষ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে কার্যকরিভাবে ব্যবহারের সমস্ত সুযোগ আমাদের রয়েছে। 

২. আমরা কি ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীকে অসচেতনভাবে বাদ দিচ্ছি? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৭ ভাগেরও অধিক ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠী, যা সংখ্যায় বর্তমানে ১৬ লাখ ৬৫ হাজার ৭০৮ জন। অন্যদিকে, পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের তথ্য অনুযায়ী ষাট ও তার বেশি বয়সী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪৬% এরও বেশি এক বা একাধিক প্রতিবন্ধিতার শিকার। ভিন্নভাবে সক্ষম এই জনগোষ্ঠী বিভিন্ন ধরনের অ্যাসিস্টিভ প্রোডাক্টের সহায়তা নিয়ে চলাফেরা করেন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ব্যবস্থার জন্য সচেতনতা সৃষ্টিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন এসবিসিসি উপাদান আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ভিডিও বার্তা তৈরিতে ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর দিকটি বিবেচনা ক্ষেত্রে ঘাটতি পরিলক্ষিত। এক্ষেত্রে আমরা শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ভিডিওতে ইশারা ভাষা সংযোজন প্রত্যাশা করি। অন্যদিকে, ভিন্নভাবে সক্ষম জনগোষ্ঠীর নিত্যদিনের চলাফেরার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন অ্যাসিস্টিভ প্রোডাক্টের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার দিকে খেয়াল রাখতে হবে, সেগুলো কীভাবে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করতে হবে এবিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা আমরা দেখি না। গবেষণায় দেখা যায়, প্রবীণদের মধ্যে প্রায় ১১%-ই দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাওয়া, গোসল, কাপড় পরাসহ বিছানা করার ক্ষেত্রে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। সংখ্যায় বর্তমানে প্রায় ১৫ লাখেরও বেশি যারা শয্যাশায়ী ও শুশ্রুষাকারীর সহায়তা ছাড়া চলাফেরা করতে অক্ষম তাদের জন্য প্রতিরোধ ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা কেমন হবে সে বিষয়েও আমরা সুনির্দিষ্ট দিক-

নির্দেশনা আশা করি। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও ডিমেনশিয়ার রোগীদের জন্য উপযোগী সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার জরুরী। হোম ‘‘কোয়ারেন্টাইন’’ শব্দটি নিজে থেকেই একটি ভীতিকর শব্দ। আমরা এসব ভীতির উদ্রেককারী শব্দের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত সহজ, সরল ও সকলের বোধগম্য হয়, এমন বার্তাবাহী শব্দের ব্যবহারে দৃষ্টি দিতে পারি।

৩. আবারও আমরা আমাদের সমাজের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারীদের প্রতি উদাসীনতা দেখাচ্ছি। দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে সারাজীবন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা নারীরা আরও বেশি হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলছেন। কিন্তু এর ফলে তারা নিরাপদে আছেন, এমনটা ভাবা যায় না। পুরুষদের মধ্যে বাইরে চলাফেরার ক্ষেত্রে মাস্ক ও হ্যান্ডগ্লাভসের ব্যবহারের সক্ষমতা থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে, যারা বাড়িতেই থাকেন তাদের জন্য এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে আমরা দেখেছি ঋতুস্রাবকালীন সময়ে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা রজঃস্রাব পরিচ্ছন্নতা মেনে চলেন ত্যানা দিয়ে। অথচ পরিবারের ছেলেটার খৎনার জন্য ডাক্তার, হাসপাতাল, গরু জবেহ দিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীদের আয়োজন করে খাওয়ানোর জন্য যা খরচ হয়, তার চেয়ে হয়তো অনেক কম খরচে একটা মেয়ের সারাজীবনের স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা যাবে। সুতরাং এক্ষেত্রেও আমরা উদ্বিগ্ন হতে পারি যে, বাংলাদেশের গ্রামের নারীরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ ও সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। গৃহস্থালী কাজে তারা প্রথাগতভাবে নিয়োজিত থাকার ফলে সামাজিক দূরত্বও কতটুকু মেনে চলতে পারেন সেটাও ধর্তব্যের বিষয়। আবার বাজারে সরবরাহের ঘাটতি ও উচ্চমূল্য নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষজন এবং অবধারিতভাবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী করোনাভাইরাস সুরক্ষার জন্য মাস্ক, হ্যান্ডগ্লাভস ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। 

করোনাভাইরাস মহামারি আমাদের আবারও শিক্ষা দেয়, দেয়ালে আগুন লাগলে, ধর্মগ্রন্থও যেমন বাদ যায় না, তেমনি যুবকদের বাঁচিয়ে প্রবীণদের মারলে, পুরুষদের রেখে নারীদের বাদ দিলে কেউই বাদ যাবে না আগুন থেকে। কিন্তু আমরা পণ করেছি, কিছুই আর শিখব না, কারও কাছ থেকেই।

সুর্যাস্ত প্রমাণ করে শেষটাও স্নিগ্ধ হয়, যদি – 

১. সিনেমা পরিচালক ফখরুল আরেফীন খান "গন্ডি" সিনেমায় অত্যন্ত সাবলীলভাবে নিঃসঙ্গ প্রবীণের সঙ্গলাভের প্রয়োজনীয়তা এবং তাদের ব্যক্তি সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে আধুনিক চিন্তাসম্পন্ন সন্তানেরা কী প্রবলভাবে বিরূপ সাড়া দেন তা সুচারূরুপে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু সিনেমা হল থেকে বেরিয়ে আসা যুবকদের বলতে শুনি এটা "বুড়োদের সিনেমা"। কার্যত টিউবার জেনারেশন কি সত্যিই চিন্তায়, চেতনায়, মনন ও মগজে এগিয়েছে? এদেশে এখনও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টাকে আর দশটা সাধারণ রোগ হিসেবে বিবেচনা করা অথবা মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়নি। যতজনকে আমরা অর্থকরী বিষয় নিয়ে পড়াশোনার গুরুত্ব দিতে তার সিকিভাগকেও দেখি না, সাইকোলজি নিয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী হতে। 

প্রবীণদের জন্য দরকার হয় সমন্বিত সেবার, যার মধ্যে মানষিক স্বাস্থ্যসেবা, মনঃসামাজিক পরামর্শ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অংশ। সাধারণত আমাদের পরিবর্তিত পারিবারিক জীবন ব্যবস্থায় প্রবীণরা গল্প করার জন্য তাদের নাতী-নাতনীদেরকেই কাছে পান। আর দিনের বেশিরভাগ সময়ই কেটে যায় প্রায় অন্ধকার একটি ছোট্ট ঘরে, শক্ত বিছানায়, তেল চিটচিটে বালিশে মাথা গুঁজে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের জন্য সত্যিকারার্থে চিত্তবিনোদনের সুযোগ সীমিত। আমরা কি শ্রদ্ধার সঙ্গে মিডিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করব? প্রবীণরা মসজিদ-মন্দির-গির্জায় শুধু প্রার্থনা করতেই যান, এটা ভুল ধারণা। তারা সমবেতভাবে প্রার্থনায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে মেলামেশা, বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, সুখ-দুঃখের আলাপ করা, সামাজিক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সক্রিয় থাকার সুযোগ পান। 

করোনাভাইরাস মহামারীর ‘‘সামাজিক দূরত্ব’’ বজায় রাখা আমাদের সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অবহেলিত এই জনগোষ্ঠীর সেই সুযোগটাও কেড়ে নিল। আবার করোনাভাইরাস মহামারির মৃত্যহার তাদেরকে মানসিকভাবে আরও বেশি দুর্বল করে তুলছে, ফলে অন্যান্য বার্ধক্যজনিত রোগের সঙ্গে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত হারানোর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আমরা দেখেছি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া বাবাকে নিজ হাতে কবরে শায়িত করতে না পারা সন্তানদের আর্তনাদ। মরার ওপর খাড়া ঘাঁ হচ্ছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আশঙ্কা। করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে বিশ্বব্যাপী চাকরি হারাবেন আড়াই কোটি মানুষ। আড়াই কোটি মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আড়াই কোটি পরিবার। সুতরাং এটা অনুমেয় যে, একটা বড় জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড রকমের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছেন। মানসিক স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সময় এখনই।

২. প্রবীণবান্ধব সমাজব্যবস্থা সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুসারে, একদিকে প্রবীণদের মধ্যে মৃত্যু হার হ্রাস পাওয়া, অন্যদিকে গড় আয়ুও বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০৩০ সালে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ২২% হবে প্রবীণ। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা হবে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ, ২০৫০ সালে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ  এবং ২০৬১ সাল নাগাদ হবে প্রায় ৫ কোটি  ৬০ লাখ। ২০৫০ সালে এই দেশে শিশু ও প্রবীণের অনুপাত হবে মোট জনসংখ্যা ১৯:২০%। শয্যাশায়ী, নিত্যদিনের চলাফেরার কাজে অন্যের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, ব্যক্তিগত পরিচর্যার জন্য অন্যের সাহায্য প্রয়োজন এ ধরনের প্রবীণ ব্যক্তি ও ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তির জন্যই আজকাল এমনকি শহর কিংবা গ্রামে, কোথাও সনাতনী কিংবা পেশাদার পরিচর্যাকারী পাওয়া যায় না। এ ধরনের কাজ করার জন্য যে মানসিক ও শারীরিক দক্ষতা থাকা দরকার, তেমন দক্ষ জনগোষ্ঠী আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। ঐতিহ্যগতভাবেই আমরা আমাদের প্রবীণদের দেখা-শোনা পারিবারিকভাবে করে থাকি। কিন্তু বর্তমানে পরিবর্তিত বৈশ্বিক ব্যবস্থা আমাদের আর সে সুযোগ দিচ্ছে না। স্বচ্ছল কিংবা নিম্নবিত্ত উভয় ধরনের পরিবারের ক্ষেত্রেই বিষয়টি একই। 

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রবীণদের জন্য সরকারিভাবে বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে মাত্র একটি। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু বৃদ্ধাশ্রম মিলিয়ে খুব অল্প কিছু প্রবীণের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।

ক্রমবর্ধমান এ বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে বিশেষ চাহিদা মেটানোর জন্য যে ধরনের আর্থ-সামাজিক সক্ষমতা এবং পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা থাকা দরকার তা আমাদের নেই। অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের মতো আমাদের গত ৪৫ বছরের জনসংখ্যার ধারা প্রবীণদের জন্য ভাববার সুযোগ করে দেয়নি। কিন্তু আগামীর দিনগুলোতে প্রবীণদের নিয়ে চিন্তা না করার অবকাশ আর নেই। এখনই আমাদের প্রবীণ স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা, গবেষণা, দক্ষ প্রফেশনাল তৈরি করা ও অবকাঠামো সৃষ্টি করা দরকার। প্রবীণদের পরিচর্যার জন্য পারিবারিক, পেশাদার ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সেবাদানকারী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া সময়ের চাহিদা।

৩. প্রয়োজন সার্বজনীন পেনশনের ব্যবস্থা। সাধারণত প্রবীণদের মধ্যে পুরুষের তুলানায় নারীরা বেশিদিন বাঁচেন। সুতরাং বিধবা হওয়ার হারও তাদের মধ্যে বেশি। আমরা দেখি, যতদিন প্রবীণ পুরুষটি বেঁচে থাকেন, ততদিন পর্যন্ত তার পাশাপাশি তার প্রবীণ নারী সঙ্গীটিও সন্তান আর নাতী-নাতনীদের সেবা পান। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে পিতার হাতে সম্পত্তি থাকে। এই সম্পত্তির লোভে অথবা যে কোনো কারণে প্রবীণ পুরুষটির বর্তমানে তার প্রবীণ নারী সঙ্গীটিও পরিবারে গুরুত্ব পান। প্রবীণ পুরুষটির মৃত্যু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবারে প্রবীণ নারীটি সন্তান, পুত্রবধু, জামাতা সর্বোপরি নাতি-নাতনির কাছে প্রতিনিয়ত দুর্ব্যবহার, বঞ্চনা ও অবহেলার শিকার হন। সুতরাং টাকা কিংবা সম্পদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারক।

করোনাভাইরাস আমাদের শিখিয়ে দিলো, গ্লোবালাইজেশন খুবই ভঙ্গুর এবং অত্যন্ত অকার্যকরী একটি ধারণা। এমন একটি মহামারি যার কারণে রাষ্ট্রই নিজেকে একঘরে করতে বাধ্য হলো। কেউ কারও কাজে লাগেনি এখন পর্যন্ত। উন্নত রাষ্ট্রগুলোই তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাজুক হাল টের পেলো। আমরা আরও দেখলাম, সম্মানের সঙ্গে একজন প্রবীণকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে না দিতে পারার ব্যর্থতা। 

কিন্তু প্রবীণরা আমাদের সমাজেরই অংশ। তারা নিজ অভিজ্ঞতা দিয়ে এখনও আমাদের সেবা করে যাচ্ছেন যেমনটি যৌবনে করে গেছেন কায়িক ও মানসিক শ্রম দিয়ে। প্রবীণ হওয়া প্রকৃতিরই স্বাভাবিক নিয়ম। সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার অধিকার আছে সবারই। তাই বয়স বৈষম্যমুক্ত ‘‘কেউই বাদ যাবে না’’ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এই সুফল সবার জন্যই অবধারিত হোক।

অতএব, আমরা যখন প্রত্যন্ত গ্রামের ৭২ বছর বয়সী মকবুল আহমদকে বলতে শুনি, ‘‘কী গজব আসলো রে বাবা, আমার জানাজায় তিন কাতার মানুষ হবে না?’’ ঠিক তখন তারই বড় সন্তান জয়নাল আবেদীনকে খুব বিমর্ষ হয়ে ভাবতে দেখি, বাবা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে তিনি হয়তো তার লাশ কাঁধে নিতে পারবেন না, হয়তো নিজের হাতে বাবাকে কবরস্থ পারবেন না। এই ভাবনায় তারা যখন নির্ঘুম রাত পার করেন, তখন আমাদের চিরচেনা সেই সামাজিক মূল্যবোধ আর দৃঢ় পারিবারিক বন্ধনে হ্যাঁচকা টান পড়ে। তবুও আমরা টিভিতে পণ্য ও খেলাধুলার বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি প্রতিদিন অসংখ্য মৃত্যুর খবর নিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি।


শাহ মোহাম্মদ দীদার,
প্রোটেকশন অ্যান্ড ইনক্লুশান অ্যাডভাইজার, হেল্পএইজ ইন্টারন্যাশনাল


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

86
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail