• শুক্রবার, মে ২৯, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০২:১১ দুপুর

‘সমতার’ ভাইরাস, অসমতার বিশ্ব

  • প্রকাশিত ১০:১৯ রাত এপ্রিল ১২, ২০২০
করোনাভাইরাস
ফাইল ছবি: রয়টার্স

ছাপড়া ঘরগুলোতে থাকা মানুষগুলো যারা অনেকজন মিলে একটা গোসলখানা বা একটা টয়লেট ব্যাবহার করে তাদের জন্য আইসোলেশন বা হোম কোয়ারেন্টাইনের ভাবনা ভাবা হাস্যকরই শুধু নয়, নির্মম রসিকতাও বটে

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) জাতপাত মানে না বা এই ভাইরাস ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোন বৈষম্য করে না-এমন ধরনের কথা প্রায়শই পরিচিতদের মুখে কিংবা ফেসবুক পোস্টে দেখতে পাই। এমন বয়ান আমরা এমনকি বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধানদের মুখেও শুনতে পাচ্ছি প্রায়শই। বলা হচ্ছে, এই ভাইরাসের তোপ থেকে কারো নিস্তার নেই। একভাবে বলতে গেলে আসলেই ভাইরাসটি নিজে কোন জাতপাতের বিচার করে না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রিটিশ সিংহাসনের বর্তমান উত্তরাধিকার প্রিন্স চার্লসসহ আরও অনেকজন হোমড়া চোমড়া মানুষজনের করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার নজির ভাইরাসটির “সাম্যবাদীতার” জ্বলজ্বলে প্রমাণ হাজির করে, আমরা আতঙ্কিত হই বহুগুণ। 

আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ভাইরাসটির সাম্যবাদী চরিত্র নিয়ে আলাপ জমাই। এই নিবন্ধে আমি এ ধরনের বয়ানগুলোকে পরীক্ষা করে দেখতে চাই। এই বয়ানগুলো আদতে কোন বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসে আর কোন বিষয়গুলোকেই বা চাপা দেয়? করোনাভাইরাস কি সবাইকে একইভাবে সংক্রমন ও প্রভাবিত করছে? সর্বোপরি প্রাণঘাতী এই ভাইরাস ও এর দরুন সৃষ্ট মহামারী সবার জন্য সমান বিপদ নিয়ে হাজির এমনটা বলার বিপদটাই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখে কিছু তথ্য-উপাত্ত হাজির করে আমি বলতে চাই, করোনাভাইরাস বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে অন্য সব ভাইরাসের মতনই যে কোন মানব শরীরের সংস্পর্শে আসলে সেই শরীরকে হোস্ট হিসেবে গ্রহণ করে সংক্রমিত করতে পারে এ নিয়ে সংশয় নেই, অর্থাৎ ভাইরাসটি সমতার, কিন্তু বিষয়টি আদতে এত সরলও নয়। 

একটু গভীরভাবে আমরা যদি কাঠামোগত অসমতার বিষয়টি মাথায় নিয়ে বয়স, লিঙ্গ, শ্রেণি, পেশা এবং বর্ণ ইত্যকার ফ্যাক্টরগুলোর সাপেক্ষে করোনাভাইরাস সংক্রমনের হার, মৃত্যুর সম্ভাবনা এবং কারা সংক্রমনের ঝুঁকিতে বেশি আছে এমন সব বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিই তবে করোনাভাইরাসের “সাম্যবাদীতা”র মিথটি ধোপে টিকবে না। তাহলে চলুন এক এক করে দেখা যাক করোনাভাইরাস আদতে কতটা সাম্যবাদী?

বয়স ও পূর্ববর্তী অসুস্থতা

ঠিক এই মুহূর্তে যখন এই লেখাটি লিখতে বসছি তখন বিশ্ব সাস্থ্য্ সংস্থার ওয়েবসাইট দেখাচ্ছে যে এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ২১৩টি দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হলো ১৫,৬৯,৫০৪ এবং মোট মৃত্যু সংখ্যা হলো ৯৫,২৬৯। করোনাভাইরাস সংক্রমনের প্রথম থেকেই যে বিষয়টি আলোচনায় ছিলো তাহলো বয়স্ক এবং যাদের আগে থেকে ডায়াবেটিস, শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা, হাঁপানি ও নিউমোনিয়া আছে তথা যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য এই ভাইরাস ভয়ঙ্কর বিপদজনক তথা প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এখন পর্যন্ত মৃত্যুহার সেই আশঙ্কাকে সত্যি বলে প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে। 

বিশ্ব সাস্থ্য্ সংস্থার হিসেব অনুযায়ী যেখানে মার্চ এর তিন তারিখ পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত মানুষজনের মধ্যে মৃত্যুহার ৩.৪%, সেখানে Worldometer হিসেব করে দেখাচ্ছে যে সেই মৃত্যুহার আশি বছরের বয়সের অধিক মানুষজনের ক্ষেত্রে ২১.৯%, সত্তর থেকে ঊনআশি বছরের মধ্যে বয়সীদের ক্ষেত্রে ৮% এবং ষাট থেকে ঊনসত্তর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩.৮%। জনস্বাস্থ্য গবেষক এবং লেখক Sharon Begley তার নিবন্ধেও এই বিষয়টি তুলে এনেছেন। তিনি হিসেব করে দেখিয়েছেন যে চীনের মোট আক্রান্তদের ৮৭% হলো ৩০-৭৯ বছর বয়স সীমার মধ্যে। আবার চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এটিও বের করেছে যে চীনে মোট মৃত্যুহার যেখানে ২.৩%, সেখানে আশি বছরের উপরে যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের মধ্যেকার মৃত্যুহার ১৪.৮%। এটা একেবারেই স্পষ্ট যে অপেক্ষাকৃত তরুণদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস ততটা প্রাণঘাতী নয় যতটা বৃদ্ধদের জন্য। 

Beagley আরও দেখান এমনকি সংক্রমনের হারেও বয়স্করা তরুণদের তুলনায় অনেক এগিয়ে, এটা এমন এক রেস, যে রেসে নিশ্চিত করেই বলা যায় বয়স্করা এগিয়ে যেতে চাননি। কিন্তু ভাইরাসটির সংক্রমনের জোর দূর্ভাগ্যজনকভাবে বয়স্কদের এই রেসে বহুগুণ এগিয়ে নিয়ে গেছে। অর্থাৎ তরুণদের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কাছে এটি ততটা প্রতাপশালী নয়। সুতরাং ভাইরাসটি আদতে বয়স্ক ও তরুণ উভয়ের কাছে একইরকম ভয়ঙ্কর নয়, যা তার সাম্যবাদী স্ট্যাটাসকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

‘লিঙ্গ’

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের আগের দিনও বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বশেষ যে ক্লাসটিতে আমি পাঠদান করি এবং ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে নিজের জানা-বোঝাকে শক্তিশালী করি সেটি ছিলো Gender Issues নামক একটি কোর্সের ক্লাস। তো এই কোর্সটি পড়াতে গিয়ে এবং দেশে-বিদেশে পড়তে গিয়ে মোটামুটি যে বিষয়টি মাথার ভিতরে স্পষ্ট করে গেঁথে গেছে, তা হলো বিশ্বব্যাপী নারীরা কোন না কোনভাবে পুরুষালী ধ্যান-ধারণা এবং পিতৃতান্ত্রিক মতাদর্শের কারণে অন্যায়, অন্যায্যতা, নিপীড়ন, সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার। নারীদের ক্ষমতা, প্রতিরোধ, এজেন্সির ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার উদাহরণ থাকলেও এখনো মোটাদাগে নারী যে “ভিক্টিম” তা “বাস্তবতা” বলে মেনে নেওয়া হয়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এখন অব্দি করোনাভাইরাস সংক্রমনের যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে ভাইরাসটির নারীদের তুলনায় পুরুষদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট। 

Sharon Beagley এর কাছে আবারো ফিরে যেতেই হচ্ছে। তিনি তার নিবন্ধে যে তথ্য-উপাত্ত হাজির করেছেন সেটা পড়ে জানা যায় যে, করোনাভাইরাসের প্রভাব বয়সভেদে যতটা স্পষ্ট লিঙ্গভেদে ততটা না হলেও একটা প্রবণতা হাজির করা যায়, আর তাতে পুরুষরা স্পষ্টতই এগিয়ে। চীনের রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার হিসেব মতে প্রতি ১০০ জন নারীর বিপরীতে ১০৬ জন পুরুষ করোনাক্রান্ত হয়েছে, চীনে বিশ্ব সাস্থ্য্ সংস্থার গবেষণা দেখাচ্ছে করোনাভাইরাসে পুরুষের সংক্রমনের হার ৫১%। ভাইরাসটি যে অঞ্চল থেকে ছড়িয়েছে সেই উহান প্রদেশে ১০৯৯ জন কোভিড-১৯ আক্রান্তদের মধ্যে গবেষণা করে দেখা যাচ্ছে পুরুষের সংক্রমনের হার ৫৮%। তবে গবেষকদের মতামত হলো পুরুষদের সংক্রমনের হার বেশি হওয়ার সাথে সম্ভবত জৈবিক কোন কারণ নেই, বরং চর্চা ও আচরণগত কারণই নির্ধারক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল, যেহেতু মোটাদাগে এখন অব্দি পুরুষরাই তুলনামূলকভাবে নারীদের তুলনায় ভ্রমণ ও জনপরিসরে যাতায়ত বেশি করছে, তাই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা পুরুষদেরই বেশি। তবে কিছুটা হলেও চমকে দেওয়ার মতন তথ্য হলো মৃত্যুহারেও নারীদের তুলনায় পুরুষরাই এগিয়ে আছে। 

Worldometer তাদের পরিসংখ্যনে দেখাচ্ছে যে চীনে নারীদের মৃত্যুহার যেখানে ১.৭%, পুরুষের মৃত্যুহার সেই তুলনায় ২.৮%। এই পরিসংখ্যনও কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে জৈবিকতার সাথে সম্পর্কিত নাও হতে পারে। কেন না এখন অব্দি চীনে নারীদের তুলনায় পুরুষরা অধিক ধূমপান করে, ফলে তাদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নারীদের তুলনায় বেশি হওয়া মোটেও বিষ্ময়ের কিছু নয় এবং করোনাভাইরাস যেহেতু এ ধরনের অসুস্থতাকে বুকে টেনে নিয়ে আরও বাড়িয়ে দেয় তাই পুরুষের মৃত্যুহার বেশি হওয়াটা চোখ কপালে তোলার মতন কিছু নয়। বাংলাদেশ বা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমনটা হলে অবাক হবার মতন কিছু থাকবে বলে মনে হয় না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো করোনাভাইরাস জৈবিক কারণে না হলেও আচরণগত কারণের জন্য পুরুষদের বেশি ঘায়েল করতে সক্ষম হচ্ছে।

কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রভাবে নারীদের সংক্রমন ও মৃত্যুহার কম থাকার স্বস্তি উবে যেতে সময় লাগবে না যদি অন্য একটি দিকে খেয়াল করা হয়। করোনাভাইরাসের সাথে লড়াইয়ে সারা বিশ্বে (যেহেতু এটির কোন প্রতিষেধক এখনও আবিষ্কৃত হয়নি) ঘরে থাকা বা কোয়ারেন্টাইনকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। এতে করে গবেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে এ সময়ে নারীদের পারিবারিক সহিংসতার শিকার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। বিশ্ব সাস্থ্য্ সংস্থা এমন আশঙ্কা করে ইতিমধ্যেই সতর্ক করে দিয়েছে। 

ব্রিটিশ পত্রিকা The Gurdian গত শুক্রবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক সহিংসতা রিপোর্ট করার জন্য যে হটলাইনগুলো আছে সেগুলো অতীতের তুলনায় এখন অনেক বেশি পারিবারিক সহিংসতার রিপোর্ট পাচ্ছে। নারী ও পুরুষ উভয়েরই পারিবারিক সহিংসতায় ভোগার তথ্য আসলেও তুলনামূলকভাবে নারীদের সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় বেশি বলে পত্রিকাটি জানিয়েছে। আবার কোভিড-১৯ এর প্রভাবে নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে Gurdian জানাচ্ছে, তারা আমেরিকার উদাহরণ দিয়েছে- আমেরিকার নিন্ম আয়ের চাকুরিগুলোর দুই-তৃতীয়াংশই নারীদের দখলে ছিলো, করোনার প্রভাবে ইতিমধ্যেই বেশিরভাগ তাদের চাকরি হারিয়েছেন, ফলে পারিবারিক জীবনে তারা আরো বেশি অনিরাপত্তার মধ্যে পড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করা নারীদের অবস্থাও ভবিষ্যতে কী হতে পারে তা এই তথ্য থেকে কল্পনা করা যেতে পারে। 

আবার নারী-পুরুষ বাদে সমাজে থাকা অপর আরেক লিঙ্গের মানুষ যাদেরকে “তৃতীয় লিঙ্গ” (ব্যক্তিগতভাবে আমি এই টার্মটি পছন্দ করি না), কিংবা প্রচলিতভাবে “হিজড়া” বলা হয়, তাদের অবস্হাও নাজুক। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে হিজড়ারা দোকানপাট থেকে অর্থ সংগ্রহ করে জীবন-যাপন করেন, করোনাভাইরাসের প্রভাবে লকডাউন বা কোয়ারেন্টাইন এবং ঘরের বাইরে না যাওয়ার জন্য নির্দেশ এই লিঙ্গের মানুষদের জীবন ও জীবিকাকে ফেলেছে হুমকির মুখে।

যাহোক, এখান থেকে আমরা যেটা বুঝতে পারছি যে তাহলো করোনার সংক্রমন ও মৃত্যুহার এবং করোনা সৃষ্ট উদ্ভুত পরিস্থিতিতে এর প্রভাব লিঙ্গভেদে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে ভিন্ন ভিন্ন। এখানেও সাম্যর কোন চিত্র দেখতে পাওয়া যায় না।

শ্রেণি ও পেশা

শ্রেণি ও পেশাভেদে করোনাভাইরাসের সাম্যবাদী চরিত্রটি কেমন-এ বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য উপাত্ত না থাকায় কোন ফয়সালায় যাওয়া মুশকিল। তবে চারপাশে চোখ-কান খোলা রাখার দরুন নিজের পর্যবেক্ষন ক্ষমতার উপর ভরসা করে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে কয়েকটি মিম খুব দেখা যায়। সেগুলোতে দেখা যায় এক শ্রেণির মানুষ হোম কোয়ারান্টাইনে থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে আমোদে সেলফি তুলছে আর আরেক শ্রেণির মানুষ বাইরে কাজের জন্য নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হন্য হয়ে ঘুরছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মার খাচ্ছে। আরও দেখা যায় এক শ্রেণির মানুষ ফেসবুকে সুস্বাদু খাবারের ছবি শেয়ার করছেন, আর অন্য শ্রেণির মানুষ কোনরকমে টিকে থাকার চেষ্টায় আছে। 

নিশ্চিতভাবেই প্রথম দলের মানুষরা শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে আর দ্বিতীয় দলের মানুষজন সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের প্রতিনিধিত্ব করেন। আবার আমি যখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুবাদে প্রতিমাসে সুনিশ্চিত নির্দিষ্ট অঙ্কের মাইনে পাই, সেখানে ঢাকা শহরের খেটে খাওয়া মানুষজন (দিনমজুর, রিকশাচালক, ময়লা সংগ্রহকারী) কাজের অভাবে হাপিত্যেশ করছেন, তাদের আমার মতন মাস গেলে মাইনে পাওয়ার ব্যাবস্থা নেই। উনারা দিনে আনে দিনে খান, কোন সঞ্চয়ও থাকে না। তাদের জন্য এই অবস্থা ভীষণ কঠিন হয়ে দেখা দিয়েছে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণি যেখানে বাড়ির বাইরে না গিয়ে থাকতে পারছে, সেখানে নিম্নবিত্ত বা গৃহহীন মানুষের সেরকমটা করার সুযোগ নেই। মানবিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা না পেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বের না হয়ে পারবেন না, ফলে ভাইরাস সংক্রমনের আশঙ্কায় এই শ্রেণি-পেশার মানুষজনরাই বেশি আছেন। 

আবার চে্াখ বন্ধ করে যদি ঢাকা শহরের বস্তিবাসীর কথা ভাবি তবে কি দেখতে পাই? গাদাগাদি করে একটি পরিবারের কয়েকজন সদস্য একটা ছোট ছাপড়ার ঘরে থাকছে। গায়ে গা ঘেঁষে থাকা এই ছাপড়ার ঘরগুলোতে থাকা মানুষগুলো যারা অনেকজন মিলে একটা গোসলখানা বা একটা টয়লেট ব্যাবহার করে তাদের জন্য আইসোলেশন, বা হোম কোয়ারেন্টাইনের ভাবনা ভাবা হাস্যকরই শুধু নয়, নির্মম রসিকতাও বটে। এমনকি তাদের সবচেয়ে ভালো সময়েও এই মানুষগুলো স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যায় বহন করতে পারে না। আর মহামারীর এই সময়ে তারা কেউ আক্রান্ত হলে কী অবস্থা হতে পারে তা ভাবতেও যথেষ্ট মনোবল প্রয়োজন। অর্থাৎ, করোনাভাইরাস সংক্রমনের আশঙ্কা ও ঝুঁকি এবং এ থেকে সৃষ্ট জীবন-জীবিকার অনিশ্চয়তাও শ্রেণিভেদে এক নয়। ভবিষ্যতে এ সংক্রান্ত গবেষণা বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট করবে বলেই আমার বিশ্বাস।

জাতি-বর্ণ

করোনাভাইরাস জাতি-বর্ণ বিচার করে না, সম্ভবত ভাইরাসটি সম্পর্কে সবচেয়ে বড় অপপ্রচার। আমি বলছি না ভাইরাসটি বেছে বেছে সাদা বা কালো অথবা বাদামী বর্ণের মানুষদের সংক্রমিত করে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো ভাইরাসটির নিজের বর্ণ চেনার ক্ষমতা না থাকায় তার প্রয়োজন শুধু মানব বা প্রাণী শরীর, আর আমেরিকা, ইউরোপ ও পশ্চাত্য সমাজ ব্যবস্থায় কাঠামোগত অসমতার কারণে নির্দিষ্ট বর্ণের মানুষরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। 

এপ্রিলের সাত তারিখে প্রকাশিত কয়েকজন অনিসন্ধৎসু প্রতিবেদক New York Times এর এক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে ও বড় বড় শহরগুলোতে কালো আমেরিকান বিশেষ করে আফ্রিকান আমেরিকান নাগরিকরা করোনা ভাইরাসে সাদাদের তুলনায় অনেক বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ও মারা যাচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে এখনো পর্যন্ত নিশ্চিত কোন পরিসংখ্যন হাতে না আসলেও সিয়েটল বা শিকাগোর মতন বড় বড় শহরগুলো থেকে যে ইঙ্গিত মিলেছে তাতে নীতি-নির্ধারকরা কালো সম্প্রদায়ের মানুষজনের ভয়ঙ্কর পরিণতিরই আশঙ্কা করছেন। শিকাগোর মেয়র লরি লাইটফুট জানিয়েছেন যে তার শহরে করোনাক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি কালো সম্প্রদায়ের, অথচ তারা শিকাগোর মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। ইলিনয়েস-এ আক্রান্তদের মধ্যে ২৮% কালো আমেরিকান এবং ভাইরাস সৃষ্ট অসুস্থতার জন্য মৃত্যুবরণকারীদের মধ্যে ৪০% হলো কালো আমেরিকান সম্প্রদায়ের মানুষ, অথচ ইলিনয়েস এ মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৪% হলো কালো আমেরিকান। লুইজিয়ানাতে এই পরিসংখ্যন আরও ভয়ঙ্কর, সেখানে মারা যাওয়াদের ৭০% হলো কালো আমেরিকান, যেখানে তারা মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও কম। একই অবস্থা উত্তর ও দক্ষিণ ক্যারোলিনা, লাস ভেগাস, সিয়েটল ও মিনেসোটাতেও, যেগুলোতে কালো আমেরিকানদের সাদাদের তুলনায় সংক্রমিত হওয়া এবং মারা যাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এইসব পরিসংখ্যনের জন্য ভাইরাসকে দায়ী করাটা হবে বোকামি। 

তবে দীর্ঘকাল ধরে চলতে থাকা কাঠামোগত অসমতার দরুণ কালো আমেরিকানরা যে সাদাদের তুলনায় এখনো সমাজের তলানিতেই আছে তা এই মহামারি আরও তীব্রভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে। কালো আমেরিকানরদের আবাসস্থল হয়ে উঠেছে এই বড় বড় শহরগুলোর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন এলাকাগুলোতে, তাদের চিকিৎসা বীমাও খুব দুর্বল ধরনের। তাছাড়া অভিযোগ উঠেছে যে, কালো আমেরিকানরা যখন কোন লক্ষণ নিয়ে ক্লিনিকগুলোতে যায়, ডাক্তাররা তাদের টেষ্ট এর জন্য পাঠায় না, ফলে আক্রান্তের ও মৃত্যুহার কালো আমেরিকানদের মধ্যে বেড়েই চলছে। এটা স্পষ্টতই যেই বার্তা আমাদের সামনে হাজির করে তাহলো, কালো সম্প্রদায়ের মানুষজন কিংবা আফ্রিকান আমেরিকানদের করোনা ভাইরাস চিনে চিনে “আয় ভাই, বুকে আয়” বলে জড়িয়ে ধরেনি, বরং কাঠামোগত অসমতা কালো বর্ণের মানুষদের ভাইরাসটির গতিপথে ঠেলে দিয়েছে। অর্থাৎ বর্ণভেদেও ভাইরাসটি সাম্যবাদী চরিত্র নিশ্চিতভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ যদিও এতে খোদ ভাইরাসের নিজের কোন হাত নেই।

শেষ কথা

উপর্যুক্ত এই ফ্যাক্টরগুলো বাদেও অন্যান্য আরও অনেক ফ্যাক্টর আছে যেগুলো ভাইরাসটির সাম্যবাদী চরিত্রের যে মিথ নির্মাণের প্রয়াস তার সাথে যায় না। “অবৈধ” অভিবাসী এমনকি বৈধরাও একই হুমকির সামনে আছে, এছাড়া শরণার্থী, রাষ্ট্রহীন মানুষ যাদের কোন স্বাস্থ্য্ বীমা নেই, সঠিক কাগজগত্র নেই, সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত নেই তাদের জন্য করোনাভাইরাস যতটা প্রাণঘাতী ও ভয়ঙ্কর তা সবার জন্য একই রকম না হবার কথা। শুধু একবার ভাবুন কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা মানুষগুলোর কথা। এই শিবিরগুলোতে করোনার প্রকোপ একবার শুরু হলে কী হতে পারে? নিশ্চয়ই আশাপ্রদ কোন কিছু ভাবতে পারছেন না। সুতরাং করোনা ভাইরাস সাম্যবাদী, এটি ধনি-দরিদ্র, সাদা-কালো, জাতি-বর্ণ, নারী-পুরুষ কোন কিছুর ভেদ-বিচার করে না, এগুলো বলার আগে সাবধান হওয়া জরুরি, কেন না এই ধরনের বয়ানগুলো বিশ্বব্যাপী সমাজ ও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার অসমতার ও অবিচারের চিত্রগুলোকে আড়ালে ফেলে দেয়। পলিসি নির্ধারণের বেলায়ও এইসব সাধারণীকরণ বয়ানগুলো সমস্যা তৈরি করতে পারে, কারণ তলিয়ে না দেখে ভাসা ভাসা চিত্র হাজির করলে নীতি নির্ধারনের বেলায়ও একই ভুল হবার সম্ভাবনা প্রবল। কারণ, এক মাপের জুতো যেমন সবার পায়ে লাগে না, তেমনি বহুবিধ ও বহুমাত্রিক সমস্যার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ও গৎবাঁধা পলিসি কার্যকর হবে না। এজন্য প্রয়োজন বহুস্তরীয় গভর্নেন্স ও বহুমাত্রিক নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়া, যা জাতি-বর্ণ, শ্রেণি, পেশা, বয়স, লিঙ্গ ইত্যকার নানাবিধ ফ্যাক্টরগুলো আমলে নিয়ে পলিসি ঠিক করবে।


মো. মিজানুর রহমান সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



57
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail