• সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৭:১৪ রাত

মহামারি ব্যবস্থাপনায় ‘ধর্ম বনাম বিজ্ঞান’ নাকি ‘ধর্ম ও বিজ্ঞান’

  • প্রকাশিত ০৯:০৪ রাত এপ্রিল ১৯, ২০২০
লকডাউন
প্রতীকী ছবি মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

সম্প্রতি করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারির দরুণ সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের মধ্যেকার এই বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে

ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। বিগ ব্যাং তত্ত্বের প্রবক্তা স্টিফেন হকিং এই বিতর্কে অবস্থান নিয়েছিলেন বিজ্ঞানের পক্ষে। ২০১০ সালে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, “বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হলো ধর্মের ভিত্তি যেখানে কর্তৃত্ব, বিজ্ঞানের ভিত্তি সেখানে পর্যবেক্ষন ও কারণ (রিজন), ফলে জয় হবে বিজ্ঞানের কারন এটি কার্যকর।” পরিষ্কারভাবেই হকিং বিজ্ঞান বনাম ধর্ম বিতর্কে বিজ্ঞানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। 

অন্যদিকে, খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন বিজ্ঞান এবং ধর্ম উভয়কেই একাধারে চর্চা করেছেন, ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত তার বই “ম্যাথমেটিক্যাল প্রিন্সিপ্যালস অফ ন্যাচারাল ফিলোসফি”তে তিনি বলেছেন, “মধ্যাকর্ষণ গ্রহগুলোর গতিবিধি ব্যাখ্যা করতে পারে ঠিক, কিন্তু কে এই গতি প্রকৃতি ঠিক করে দিয়েছেন তা ব্যাখ্যা করতে পারে না।”। নিউটনের এই উক্তি এটা স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি একাধারে ধার্মিক ও বিজ্ঞানী উভয় সত্তাকেই ধারণ করতেন, এজন্য ওনাকে একাধারে বিজ্ঞানের মানুষ ও ধর্মের মানুষও বলা হতো। 

অতি সম্প্রতি করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারির দরুণ সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের মধ্যেকার এই বিতর্ক আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিখ্যাত এই দুইজন বিজ্ঞানীর দু’টি ভিন্ন অবস্থানকে বোঝানোর জন্য সামনে নিয়ে এসেছি। যেখান থেকে বোঝা যায় যে খোদ বিজ্ঞানীদের মধ্যেই এ নিয়ে মতবিভেদ আছে। তেমনি সারাবিশ্বে মানুষজনের মধ্যেও ধর্ম এবং বিজ্ঞান নিয়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মতামত।

করোনাভাইরাস আবির্ভাবের পরে অনেকেই সম্প্রদায় পর্যায়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণের জন্য সরাসরি দায়ী করছেন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলোকে। বাংলাদেশের লক্ষ্মীপুরে বিশ হাজারেরও বেশি মানুষসহ করোনাভাইরাস থেকে উদ্ধারের বা মুক্তির আশায় গণ-প্রার্থনার আয়োজন করা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিলো, তাছাড়া সরকারি প্রজ্ঞাপনের আগে মসজিদে মসজিদে জমায়েত করে নামাজ পড়া নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তর্ক-বিতর্কের ঝড় উঠেছিলো। এই চিত্র শুধু বাংলাদেশে নয় বরং ভারত, চীন, কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোতেও ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে জমায়েতে গণপ্রার্থনার আয়োজন হয়েছিলো এবং সেগুলো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। 

অভিযোগ উঠেছিলো যে, করোনাভাইরাসের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তারে ধর্মীয় এইসব আচার ও জমায়েতগুলো প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্বাসীদের নিয়ে নানারকম ব্যাঙ্গাত্মক মন্তব্যের ছড়াছড়ি দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।তাদের “অসচেতন”, “কুসংস্কারাচ্ছন্ন” এবং “বিজ্ঞান বিরোধী” বলে মন্তব্য করা হয়েছে। 

অন্যদিকে, বিশ্বাসীরাও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন না, তারাও প্রশ্নকারীদের অবিশ্বাসী, নাস্তিক, কাফের, মোনাফেক ইত্যাদি নানা উপাধি দিয়ে মনের খেদ মিটিয়েছেন। অর্থাৎ, বিজ্ঞান বনাম ধর্মের মধ্যকার বিতর্ক ও উত্তেজনা আমরা দেখতে পাই। 

এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমেই আমাদের যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে তা হলো, কোভিড-১৯ এর মত ভাইরাসের আক্রমণ ও সংক্রমণের বিষয়টি যখন বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন মিডিয়ার কল্যাণে সবাই জানতে পারছে, এবং কোনো ভ্যাক্সিন না থাকার দরুণ সবাইকে ঘরে থেকে ও সাবধানতা অবলম্বন করার মধ্যে দিয়ে এ ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষার উপায় বলে দেওয়া হচ্ছে, তবুও কেন বিশ্বব্যাপী মানুষ দলে দলে ঘর থেকে বাইরে গিয়ে ধর্মের শরণাপন্ন হয়েছে, কেনই বা ঘরে থেকেও মানুষ তাদের নিজ নিজ ধর্মের সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চাইছেন? আধুনিক এই বিজ্ঞানের যুগে মানুষের ধর্মের প্রতি কেন এই অগাধ বিশ্বাস? বিজ্ঞানের ওপর তবে কি মানুষের ভরসা নেই?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সঙ্কটকালে ধর্মের প্রতি মানুষের এই বিশ্বাস বা ভরসা কি আদৌ নতুন কিছু? মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই ধ্রুব কোনো সত্যি যদি থেকে থাকে তাহলো মানুষের আবিষ্কার ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা। মানুষ কখনো ধীরে ধীরে আবার কখনো খুব দ্রুতই তাদের দক্ষতা, বুদ্ধি ও শক্তি দিয়ে নিত্যনতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন করেছে এবং করে চলেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি মানব ইতিহাসে আরেকটি যে ধ্রুব সত্য আমরা দেখি তা হলো তাদের ধর্মবিশ্বাস বা অতিপ্রাকৃতের উপর বিশ্বাস। 

পৃথিবীতে এমন কোনো গোষ্ঠী বা সংস্কৃতি পাওয়া যাবেনা যেখানে কোনো না কোনো ভাবে ধর্মের অস্তিত্ব নেই। সমাজবিজ্ঞানীরা বিশেষ করে নৃবিজ্ঞানীরা এই তথ্য তাদের মাঠ গবেষণার মধ্যে দিয়ে আমাদের সামনে বহুকাল আগে হাজির করেছেন এবং এখনো সে ধারা অব্যাহত আছে। ধর্মের আবির্ভাব ও ক্রিয়া নিয়ে নানা মত আছে। বিশ্বাসীদের কাছে ধর্ম ঐশ্বরিক, প্রাকৃতিক এবং এ নিয়ে তর্কের কোনো অবকাশ নেই। সমাজবিজ্ঞানী এবং নৃবিজ্ঞানীরা ধর্মকে দেখেছেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বোঝাবুঝির ফলাফল হিসেবে। আদিম মানুষেরা যখন প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে পেরে উঠতো না কিংবা তারা তাদের দক্ষতা দিয়ে প্রকৃতির সাথে মোকাবেলা করতে পারতো না তখন তারা যাদুবিদ্যা ও ধর্মের শরণাপন্ন হতো, তারা বিভিন যাদুবিদ্যা, মন্ত্র, এবং আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে ঝড়, বিদ্যুৎ চমক, সাগরের খরস্রতো ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া করতো। আর এভাবেই ধর্মের আবির্ভাব ঘটে বলে সমাজ বিজ্ঞানী এবং নৃবিজ্ঞানীরা তত্ত্বায়ন করেছেন। 

এখানে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো “অনিশ্চয়তা”। মানুষ যখন তার শক্তি, সামর্থ্য, বুদ্ধি দিয়ে কোনো কিছু ব্যাখ্যা করতে পারেনা বা সে বিষয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভোগে তখনই ধর্মের গুরুত্ব তার কাছে বাড়তে থাকে। 

সাম্প্রতিক করোনাভাইরাসও সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে প্রধানত যে অনুভূতি সঞ্চার করেছে তাহলো অনিশ্চয়তা। ভাইরাসটির সংক্রমণের ধরণ ও এর নাছোড়বান্দা প্রকৃতি সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য এই অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে দিতে সহায়তা করেছে। যেমন, সম্প্রতি জানা গেছে ভাইরাসটি তার জেনেটিক কোড পরিবর্তন করতে সক্ষম এবং এই কারণে এই ভাইরাস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন সব তথ্য মানুষকে আরো বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তা মানুষকে অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় আরো বেশি ধর্মমুখী করেছে বলে আমার বিশ্বাস। 

নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনস্কি ১৯২২ সালে প্রকাশিত তার “যাদু, বিজ্ঞান ও ধর্ম” নামক প্রবন্ধে চমৎকার এক উদাহরণ দিয়ে অনিশ্চয়তার সাথে ধর্ম কিংবা যাদুবিদ্যার সম্পর্ককে তুলে ধরেন। 

তিনি পর্যবেক্ষণ করেন যে, পাপুয়া নিউগিনির ট্রবিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জের মানুষ মৎস্য শিকারে যখন তীরবর্তী অঞ্চলে যায়, যে জায়গার জনস্রোতে তাদের চেনা, যেখানে তাদের বিপদে পড়ার তেমন সম্ভাবনা নেই, সেক্ষেত্রে তারা কেবল নিজেদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে বেরিয়ে পড়ে। 

কিন্তু তারা যখন সাগরের দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে যায়, যেখানকার জনস্রোত সম্পর্কে তারা জানেনা, যেখানে বিপদের প্রবল ঝুঁকি আছে, সেসব ক্ষেত্রে তারা শিকারে বের হবার আগে বেশ কিছু মন্ত্র ও আচারাদি পালন করে। 

ম্যালিনস্কি এই উদাহরণ দিয়ে বলেন, যাদু এবং ধর্ম উভয়ই আসলে এমন সব পরিস্থিতি থেকে মানুষের মুক্তির পথ খোঁজার জন্য পালন করা হয় যেসব পরিস্থিতি থেকে দৃশ্যতঃ মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় তাদের জানা থাকে না। 

ম্যালিনস্কির এই উদাহরণ থেকে আমরা যা বুঝতে পারি তা হলো, অনিশ্চয়তা যত বড় ধর্মেও প্রভাব তত বেশি। অনিশ্চয়তা না থাকলে ধর্মের তেমন কোনো প্রয়োজন নেই।

এই অনিশ্চয়তাবোধ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় মহামারির সময়ে। 

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ফ্র্যাঙ্ক স্নোডেন “মহামারি এবং সমাজ” নামক তার বিখ্যাত গ্রন্থে বলেছেন, মানুষের নথিবদ্ধ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে মহামারি দেখা দিয়েছে এবং তা মানুষের সমাজকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইনফ্লুয়েঞ্জা, প্লেগ, কলেরা, ম্যালেরিয়া, এইডস, সার্স, ইবোলা ইত্যকার মহামারিগুলো ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া সৃষ্ট। 

এর কারণ ভিন্ন ভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া হলেও এগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সংক্রমণ এবং মৃত্যু ঘটানো। মানুষ যতই সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও বিজ্ঞানের অগ্রগতি সাধন করুক না কেন দিনশেষে তারা মানুষ, তারা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া কর্তৃক আক্রান্ত হতে পারে। প্রকৃতিতে এমন জানা ও অজানা অসংখ্য ভাইরাস এবং ব্যাক্টেরিয়া আছে। ফলে যখনই কোন প্রাণঘাতি নতুন ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়ার সংস্পর্শে মানুষ চলে আসে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে, অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক তাদের গ্রাস করে। যতক্ষন অব্দি সমাধান না পাওয়া যায় মানুষ ফিরে যায় তথাকথিত কুসংস্কার আর ধর্মের কাছে। 

স্নোডেন তার গ্রন্থে দেখিয়েছেন ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে তাই হয়ে আসছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ মহামারির সামনে নিজেদের অসহায় ও ক্ষমতাহীন বোধ করেছে, আর ফিরে গেছে এমন সময়ে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তারা যা করে এসেছে তার কাছে, ধর্মের কাছে, দেব-দেবীর কাছে তথা অতিপ্রাকৃত শক্তির কাছে। কাজেই মানুষের এই সময়েও তাদের ধর্মের কাছে ফিরে যাওয়াটাকে আর যাই হোক অস্বাভাবিক বলা যায় না। তাই বিজ্ঞানের যুক্তির দোহাই দিয়ে যারা ধর্ম পালন করতে বাইরে গিয়েছে তাদের “অসভ্য”, “মূর্খ” বলে গালি দেওয়া কোনো সমাধান নয়, বরং এমনটা মানুষে মানুষে বিভেদ আরো বাড়িয়ে তুলবে। 

কিন্তু এমন আচরণও বৈজ্ঞানিকভাবে বিপদজনক কেননা মহামারির সংক্রমণকে এই ধরনের আচরণ বাড়িয়ে তোলার আশঙ্কা মোটেও অমূলক নয়। 

এক্ষেত্রে, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রায়ই ধর্ম ও বিজ্ঞানকে যেভাবে পরস্পরের থেকে আলাদাভাবে দেখা হয় তা সবসময় সঠিক নয়। সত্যি বলতে আমরা আমাদের নিত্যদিনের আচার-আচরণে অনেকেই ধর্ম ও বিজ্ঞানকে পাশাপাশি নিয়েই চলছি। কীভাবে? যেমন- গ্রামে থাকতে ছোটবেলায় দেখেছি একজন কৃষক  “বিসমিল্লাহ” বলে তার জমি চাষের জন্য ব্যবহৃত ট্রাক্টর চালু করে কিংবা সেচ দেওয়ার মেশিন স্টার্ট দেয়। 

এখানে ধর্ম ও বিজ্ঞান উভয়ের অস্তিত্ব আছে। কৃষক জানে ট্রাক্টর ও পানি সেচের মেশিন মানুষের হাতের তুলনায় কম সময়ে অনেক বেশি মাটি চাষ ও পানি উত্তোলন করতে পারবে আবার একইসঙ্গে সে “আল্লাহর নামে শুরু করিলাম” বলার মধ্যে দিয়ে বিশ্বাস করে যে এতে করে জমি চাষ ও পানি উত্তোলন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হবে। 

অর্থাৎ ধর্মীয় ঐতিহ্য বা চর্চা বিজ্ঞানের সাথে এই প্রেক্ষিতে সাংঘর্ষিক হচ্ছে না। আবার ইলেইন হাওয়ার্ড ইকলান্ড বিখ্যাত টাইম পত্রিকায় মার্চ মাসের বিশ তারিখে তার গবেষণার বরাত দিয়ে একটি নিবন্ধে দেখান যে, খোদ আমেরিকায় ধার্মিক বিজ্ঞানীদের সংখ্যা কম নয়। তিনি গবেষণা করে দেখতে পান যে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজগুলোতে কাজ করা বিজ্ঞানীদের মধ্যে ২৫% এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাইরে কাজ করা ৬৫% বিজ্ঞানী খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী। 

বাংলাদেশে এই ধরনের গবেষণা করলে ফলাফল কি তে পারে আন্দাজ করা যায়। বছর দুয়েক আগে আমার বাবার বাইপাস সার্জারির সময় সার্জনকে দেখেছি একজ ধর্মভীরু মানুষ হিসেবে, তিনি আমার বাবাকে সার্জারি সফল হওয়ার বিষয়ে এবং বাঁচা-মরার বিষয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে বলেন। এতে করে আামার ধর্মপ্রাণ বাবা প্রভূত মানসিক শান্তি লাভ করেছিলেন। সুতরাং বিজ্ঞানীরা ও ধার্মিকরা একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির না বলে যে সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে তা সবার বেলায় ঠিক নয়। ইকলান্ডও তার নিবন্ধে ধার্মিক বিজ্ঞানীদের সাথে সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে বলেন, এসব বিজ্ঞানীরা যেসব মূল্যবোধ দিয়ে তাড়িত তা হলো- সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, শান্তি এবং মঙ্গল। 

সুতরাং ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরবিরোধী এই ধারণাকে প্রশ্ন করা যায় এবং আমরা দেখতে পাই ধর্ম ও বিজ্ঞানের সহাবস্থান। মহামারির বর্তমান এই অনিশ্চয়তার সময়েও “ধর্ম বনাম বিজ্ঞান” নয় বরং “ধর্ম ও বিজ্ঞান” এই নীতি বেশি কার্যকর হবে বলে আমি মনে করি।

তাহলে বিজ্ঞান এবং ধর্ম উভয়ের ভূমিকা মহামারির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রনে কীভাবে গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে? ক্যাথরিন ব্রাউন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লগে দেখান কীভাবে ১৯১৮-১৯ এর ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির সময়ে আমেরিকা এবং ইউরোপের অনেকগুলো শহরে ধর্মীয় মূল্যবোধ তাড়িত হয়ে মানুষ স্বেচ্ছাসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলো, যার ফলাফলে সেসব অঞ্চলে এবং শহরে সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পূর্বের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, জাতিগত, এবং বর্ণগত উত্তেজনার অবসান হয়েছিলো। 

একইভাবে পোলিওর সময়ে পাকিস্তান মাওলানা সামি-উল-হক’কে (পাকিস্তানে তথাকথিত “তালেবান’” এর জনক) দায়িত্ব দিয়েছিলো পোলিওর টিকা নেওয়ার জন্য মানুষকে উৎসাহ প্রদান করার জন্য, যা নাটকীয়ভাবে পোলিওর টিকা গ্রহণকে বাড়িয়ে দিয়েছিলো। 

করোনাভাইরাসের এই সময়েও ধর্ম ও বিজ্ঞানের এমন পারস্পরিক মেলবন্ধন দেখতে পাওয়া যায়। মার্চের ১২ তারিখে প্রকাশিত এপি নিউজের এক প্রতিবেদন দেখিয়েছে যে কিভাবে কিছু কিছু চার্চ এবং পাদ্রিরা ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে বিজ্ঞানকে সমন্বয় করে মহামারি থেকে সংক্রমিত হওয়া থেকে বিশ্বাসীদের রক্ষা করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করছে। তারা বিশ্বাসীদের ঘরে থাকতে বলেছে এবং প্রার্থনা করতে করতে বিশ সেকেন্ড করে হাত ধুতে পরামর্শ দিয়েছে। 

কল্পনা করুন বাংলাদেশেও যদি ধর্মীয় নেতা বা ইমামগণ কর্তৃক কলেমা বা অন্য কোনো দোয়া পড়তে পড়তে বিশ সেকেন্ড হাত ধোয়ার পরামর্শ আসত তবে এর প্রভাব কী হতে পারতো, কিংবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ এমন ধর্মীয় বার্তার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করলে কী হতে পারতো?

ক্যাথরিন ব্রাউনের মতে, বিশ্বব্যাপী সরকার এবং তাদের নীতি নির্ধারকেরা করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য সেবায় ধর্মের ভূমিকা বুঝতে দেরি করে ফেলেছে। আমিও তার সাথে একমত পোষণ করে বলতে চাই, করোনাভাইরাসের সময়ে শুরু থেকে মানুষের মূল আচরণগুলো গড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে এবং পরিচালিত করার ক্ষেত্রে ধর্মের ভূমিকা ও গুরুত্ব বুঝতে বাংলাদেশসহ অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো ব্যর্থ হয়েছে। 

খুব বেশিদিন হয়নি বাংলাদেশে মসজিদ গুলো থেকে ঘরে বসে নামাজ পড়ার ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশ সরকার যদি শুরু থেকেই মসজিদগুলোর ইমামদের এবং ধর্মীয় নেতাদের মানুষকে ঘরে থেকে প্রার্থনা করার জন্য নির্দেশ দিত এবং সহায়তা কামনা করতো তবে বোধহয় ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের এই বিতর্ক করোনা পরিস্থিতিতে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো না। 

তাছাড়া, খ্রিস্টধর্মে খোদ যিশু খ্রিস্টকে দেখানো হয়েছে একজন রোগ নিরাময়কারী হিসেবে। যতদূর জানি ইসলাম ধর্মে এবং অন্যান্য ধর্মেও অসুস্থদের ত্যাগ করা বা এড়িয়ে যাওয়া নিষেধ আছে- এই ধরনের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতি-নৈতিকতা মহামারির এই্ সময়ে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ও সংক্রমণ এড়ানোর জন্য মিডিয়ার মাধ্যমে এবং ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে, যা মানুষকে সহমর্মী করে তুলতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। 

সবশেষে আমি বলতে চাই, অনিশ্চয়তার মুখে ধর্ম বরাবরই মানুষের সামনে বড় হয়ে আসে, ভবিষ্যতেও কোনো নাটকীয় পরিবর্তন না হলে তাই তবে। এক্ষেত্রে ধর্মকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে বরং মহামারির মত সঙ্কটে কিভাবে বিজ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহার করা যায় সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ অধিক কার্যকর হবে বলে আমার বিশ্বাস।


মো. মিজানুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না। 

76
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail