• শুক্রবার, জুন ০৫, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৫ রাত

খালিফা হাফতারের দুর্বৃত্তায়ন: লিবিয়ায় শান্তির কফিনে শেষ পেরেক

  • প্রকাশিত ০৬:৪৫ সন্ধ্যা মে ১১, ২০২০
খালিফা হাফতার-লিবিয়া
খালিফা হাফতার এএফপি

গণতন্ত্রের নামে দুর্বৃত্তায়ন এই যুগে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতিদের তালিকা দীর্ঘ। মজার ব্যাপার হলো প্রত্যেকেই আবার পশ্চিমা সমর্থিত

লিবিয়ায় পশ্চিমাদের প্রধান মিত্র যুদ্ধবাজ খালিফা হাফতার নিজেকে লিবিয়ার সর্বময় শাসক বলে ঘোষণা করেছেন। নির্বাচিত সংসদকে উপেক্ষা করে হাফতার এই পদক্ষেপ নিয়েছেন যা পরিষ্কারভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি নীরব সেনা অভ্যুত্থান। একই সাথে হাফতার ২০১৫ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় এবং নিরাপত্তা পরিষদের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে মরক্কোয় স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক চুক্তিও বাতিল করেছেন। সাম্প্রতিক ইতিহাসে ইসরাইল ব্যতীত জাতিসংঘকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে খুব একটা দেখা যায় না। হাফতারের এই স্বৈরাচারী পদক্ষেপের দরুণ লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে, দুর্ভোগ বাড়বে এককালের আফ্রিকার সবচেয়ে সম্পদশালী দেশটির সাধারণ মানুষের।

সাম্প্রতিককালে বলিভিয়ার জেনিন আনেজ, ভেনিজুয়েলার হুয়ান গুয়াইদোর পর হাফতার যুক্ত হন এই তালিকায়। গত বছর ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রায় পঞ্চাশটি দেশের সমর্থন নিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেছিলেন। মার্কিনীরা বিলম্ব না করে গণতন্ত্র রক্ষার নামে পাইক পেয়াদা (বিশ্বব্যাংক, অর্থনৈতিক অবরোধ, আইএমএফ)  নিয়ে হাজির হলেন ভেনিজুয়েলাতে। গনত্রন্ত্রের নামে উস্কে দেয়া হল সাধারণ মানুষের আবেগকে। রক্তাক্ত করা হল রাজপথ। 

আদতে গণতন্ত্র নয় বরং ভেনিজুয়েলার তেল, গ্যাস ক্ষেত্রসমূহকে পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সুযোগ খুঁজছিল ওয়াশিংটন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই সুযোগ এনে দিয়েছিল। স্বচ্ছ ভোটের রাজনীতিতে মাদুরাকে ডিঙ্গানো সম্ভভ নয় জেনেই হুয়ান গুয়াইদো ও তার পশ্চিমা বন্ধুরা নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চেষ্টায় সফল হয়। কারণ নিকোলা মাদুরো তার পূর্ববর্তী হুগো চাভেজের পথ ধরেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ বহুজাতিক কোম্পানির হাত থেকে মুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করেছিলেন। ফলে নাটকীয় উন্নতি হয়েছিল স্বাস্থ্য, শিক্ষা আর সামাজিক নিরাপত্তায়। 

মাদুরোর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত স্ক্রিপ্টের ব্যবহার হয়েছে বলিভিয়ার ইভো মরালেসের ক্ষেত্রেও। পশ্চিমা ধাঁচের গণত্রন্ত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এখানেই। পশ্চিমারা নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের আয়না দিয়ে অ-ইউরোপীয় দেশসমূহের নির্বাচনী ফলাফলকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান। সাধারণ মানুষের চাওয়া পাওয়া তাই মূল্যহীন। সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনের হামাস, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড, ভেনেজুয়েলার মাদুরো, বলিভিয়ার ইভো মরালেস কিংবা ইরানের মানুষ পশ্চিমাদের চোখে গনতান্ত্রিক হতে সক্ষম নয়। কারণ তারা পশ্চিমাদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। 

হুয়ান গুয়াইদো এবং জেনিন আনেজ মার্কিন মদদে যা করেছিলেন, মোটাদাগে হাফতার লিবিয়ায় সৌদি বলয়ের যোগসাজশে একই কাজ করেছেন। জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করেই নিজেকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করেছেন হাফতার। তবে পশ্চিমাদের এই নগ্ন হাফতার প্রীতির তথ্য মিলছে ওপেকের প্রতিবেদনে। 

ওপেকের তথ্যানুসার, লিবিয়ার রয়েছে দুনিয়ার নবম এবং আফ্রিকার সর্ববৃহৎ তেলের মজুদ। যা অঙ্কের হিসেবে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ব্যারেল থেকেও বেশি। প্রতিদিন লিবিয়ার উৎপাদন ১০ লক্ষ ব্যারেলেরও বেশি তেল। যা লিবিয়ার কোষাগারে প্রতি বছর যোগ করে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। পশ্চিমাদের সহযোগিতায় বেনগাজিসহ খলিফা হাফতারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে লিবিয়ার দুই-তৃতীয়াংশ তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল। এই দুই-তৃতীয়াংশ তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলের মধ্যেই রয়েছে লিবিয়ার বৃহৎ তেল ও গ্যাস খনিসমূহ, আল-সারারা, এল-ফিল। দখলে রয়েছে সিরতে বাসিন অঞ্চল যা লিবিয়ার দুই তৃতীয়াংশ পেট্রোল উৎপাদন করে। একইসাথে হাফতারের দখলে রয়েছে লিবিয়ার বৃহত্তর গ্যাস ক্ষেত্র আল-ওয়াফাতেও। পক্ষান্থরে জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাজধানী ত্রিপোলি এবং তার আশেপাশের এলাকাসহ লিবিয়ার এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল রয়েছে । রয়েছে বউরি এবং আল-জারফের মতন ছোট ছোট তেলক্ষেত্রসমূহও।

পশ্চিমাদের সহযোগিতায় লিবিয়ার তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলে হাফতারের দখল থাকলেও অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বৈধতা ছিল না। সেই বৈধতা অর্জনের জন্য পশ্চিমারা আর্থিক ও সামরিক সাহায্য  সরবরহ করে হাফতারকে ত্রিপোলি দখলে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমিরাতের অর্থে হাফতারের পক্ষে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ২০ হাজার যোদ্ধা ভাড়া খাটছে। 

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে প্রকাশ, রাশিয়ারও প্রায় হাজারখানেক সৈন্য হাফতারের পক্ষে যুদ্ধ করছে। কিন্তু হাফতারের এই সংঘটিত সৈন্যবাহিনী গত দুই বছর ধরে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও ত্রিপোলির দখল নিতে পারেনি। বরং গত কয়েক মাস ধরে ত্রিপোলির নিকটবর্তী শহরসমূহের নিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করেছে হাফতারের বাহিনী। লিবিয়ার জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের  তুরস্কের উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি এবং তুরস্কের প্রেরিত সিরিয়ান যোদ্ধাদের কৌশলগত ব্যবহার ছিল হাফতারের হারের অন্যতম কারণ। 

বিগত কয়েক বছরের মধ্যে এই প্রথম জাতীয় ঐকমত্যের সরকার ত্রিপোলির সীমানার বাইরে এসে হাফতারকে তাড়িয়ে দখল করে নিয়েছে সাবরাথা, সুরমান ও আল-আজাইলাটসহ আটটি শহর। অবরোধ করে রেখেছে তারধুনা শহর যা পশ্চিম লিবিয়ার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। তারধুনার পতন হলে হাফতারের ত্রিপোলি আক্রমণের লাইনটি ভেঙে পড়তে পারে। 

তবে যুদ্ধের ময়দানের মতো রাজনীতির ময়দানেও বেকায়দায় পড়েছেন হাফতার। তবরুখ কেন্দ্রিক লিবিয়ান পার্লামেন্ট (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস), যারা ২০১৫ সাল থেকে হাফতারকে শর্তহীন সমার্থনের জোগান দিয়ে আসছেন, তাদের একটি অংশ এখন হাফতারের নেতৃত্ব মানতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। 

যার নেতৃত্বে রয়েছেন জাতীয় সংসদের প্রধান আগিলা সালেহ। মস্কো থেকে যুদ্ধ বিরতি সাক্ষর না করে পালিয়ে যাওয়া, লিবিয়ান পার্লামেন্টকে এড়িয়ে অর্থনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ক্রমাগত ত্রিপোলির জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের নিকট ভূমি হারানোর কারণে আগিলা সালাহ ও তার অনুসারীদের মধ্যে অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়। এই অনাগ্রহ থেকেই হাফতারের বিকল্প খোঁজা শুরু হয়। লিবিয়ার পার্লামেন্ট সদ্যসদ্যের বিদ্রোহের গন্ধ টের পেয়ে হাফতার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য তড়িঘড়ি করে নিজেকে শাসক ঘোষণা করেছেন। হঠকারি এই সিদ্ধান্তের পেছনে কলকাঠি নাড়ছে হাফতারের অর্থের প্রধান যোগানদাতা আরব আমিরাত। সপ্তাহান্তের ব্যবধানে আরব আমিরাতের মদদে ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় জোটের স্বায়ত্তশাসন এবং লিবিয়ায় হাফতারের নিজেকে শাসক ঘোষণা নিঃসন্দেহে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে গভীরভাবে দুর্বৃত্তায়ন করবে। 

নিজেকে শাসক ঘোষণার মাধ্যমে হাফতার এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করেছেন এবং ত্রিপোলির জাতীয় ঐকমত্যের সরকারসহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেকে একমাত্র বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত করেছেন। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী গ্রীষ্মের আগে হাফতার আন্তর্জাতিক বৈধতা চান। বৈধতা অর্জনের জন্য সিরিয়ার কুর্দিদের মত পশ্চিমাদের হাতে লিবিয়ার তেল, গ্যাসের পরিচালনার ভারও দিতে আগ্রহী হাফতার। বেশ কয়েকবার হাফতার সে কথা বলেছেন। তবে ভিন্নভাবে বলছেন। হাফতারের ভাষায় অর্থনৈতিক উন্নতি, সামাজিক সুব্যবস্থা আর গণতন্ত্রের জন্য পশ্চিমাদের বিকল্প নেই। ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, কলাম্বিয়া, সিরিয়া আর ইরাকে তো বিশ্ববাসী পশ্চিমা সামাজিক সুব্যবস্থা আর গণতন্ত্রের প্রয়োগ দেখে আসছেন। 


রাহুল আনজুম

তুরস্কে বসবাসরত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

58
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail