• শুক্রবার, জুলাই ০৩, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ০৩:২৮ বিকেল

ধনী ও রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের কৌশলে প্রস্থান বন্ধ করুন

  • প্রকাশিত ০৮:৩৪ রাত জুন ৫, ২০২০
বিমান
সম্প্রতি বেশ কয়েকজন অভিজাত ভাড়া করা উড়োজাহাজে দেশত্যাগ করেছেন। বিগস্টক

দেশের বর্তমান চিত্র হলো শীর্ষস্থানীয় ০.১% অভিজাত শ্রেণি ব্যক্তিগত বিমানে দেশত্যাগ করছেন এবং অন্যদিকে ৯৯.৯% মানুষ মহামারির বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ- যা কোনো দেশ বা সমাজের জন্য খুবই লজ্জাজনক বাস্তবতা

দেশে আজ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা একদিনে সবোর্চ্চ ২৯১১ জন এবং মোট আক্রান্তের সংখ্যাও ৫৫ হাজারে পৌঁছেছে। একই সময়ে কমপক্ষে ৭৫০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে এবং ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হওয়ার উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও অন্তত দুই হাজার মানুষের। 

যে হারে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ছে সেটি ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের মতই। রাজ্যটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ হাজার অতিক্রম করেছে, ফলে প্রায় সব হাসপাতালেই কোভিড-১৯ রোগীদের উপচে পড়া ভিড় এবং এতে দুই হাজারেরও বেশি লোক মারা গেছে।

এমনই সময়ে মহামারিটি যখন ভালোভাবে প্রকাশ পেয়েছে, আমাদের প্রিয়জনদেরকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে, তখন আমরা খুবই হাস্যকর সামাজিক-রাজনৈতিক অনুকরণ দেখতে পাচ্ছি। গত এক সপ্তাহ ধরে, আমরা প্রত্যক্ষ করছি যে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ও অর্থনৈতিক অভিজাতরা ভাড়া করা বিমানে দেশত্যাগ করছেন। এটি কেবল তখনই ঘটতে পারে যখন বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ থেকে ছাড়াপত্র পাওয়া যায়।

তাহলে এটি কিসের সংকেত? এই ধরনের অবিবেচকের মতো কাজ করে কোনও সভ্য জাতি কী টিকে থাকতে বা বড় হতে পারে?

আর কত অন্যায় সহ্য করা হলে রাষ্ট্র দ্বারা সমর্থিত একটি গ্রহণযোগ্য নীতি তৈরি হবে? ধনী ও রাজনৈতিক তারকদের উড়োজাহাজ ভাড়া করে দেশত্যাগ যদি লড়াইয়ের কৌশল হয় তবে বাকী ৯৯% সাধারণ মানুষের জন্য মহামারির বিরুদ্ধে টিকে থাকার কৌশল কী হওয়া উচিত?

নৈতিকতার মাপকাঠিতে এটি কী কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? আর বাংলাদেশকে কীভাবে আমরা এই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করালাম? 

ষোড়শ বা সপ্তদশ শতাব্দীতে, স্পেনের একজন জেনারেল প্রায় ১৫০ জন যোদ্ধা এবং আস্থাভাজন ব্যক্তিদের নিয়ে তিনটি জাহাজে করে দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছান। তারা বন্দরে নোঙর করেন এবং সেখানে বসতি গড়তে শুরু করেন তখন তাদের নতুন ধর্ম, নতুন পোশাক এবং নতুন জীবনযাপন পদ্ধতি কাছাকাছি গ্রামের আদিবাসী মানুষদের শঙ্কায় ফেলে দেয়। 

আদিবাসী গ্রামটিতে একহাজার বা তারও বেশি শক্তিশালী সেনা ছিল। গ্রামবাসীদের শঙ্কার কারণে সেনাদের সহায়তায় সাথে কয়েক দফা আলোচনার মাধ্যমে উপনিবেশকারীদের ২৪ ঘণ্টা সময় বেধে দেওয়া হয় এবং পরদিন সকালের আগেই তাদেরকে দেশত্যাগ করতে হবে।

এই ভয়ানক সতর্কবার্তাটি উচ্চপদস্থ স্প্যানিশ ও সকল সেনাদের উদ্বেগে ফেলে দেয়। সে কারণে তারা তাদের জেনারেলকে অনুরোধ করেছিলেন যেন যত দ্রুত সম্ভব ওই এলাকা ত্যাগ করা হয়।

জেনারেল তার সেনাবাহিনীর কাছে বিষয়টি ভাবতে একরাত সময় চান। এবং সৈন্যরা যখন ঘুমাতে যায় তখন তিনি তার বিশ্বস্ত সৈন্যদের ব্যবহার করে তিনটি জাহাজই পুড়িয়ে ফেলেন।

সকালে, জেনারেল তার সৈন্যদের বলেছিলেন তাদের সামনে দুটো পথ খোলা আছে- হয় যোদ্ধাদের মতো লড়াই করো এবং জয়লাভ করো অথবা লড়াইকরে মৃত্যুবরণ করো এবং স্বর্গবাসী হও। এ অর্থ সেখান থেকে তাদের প্রস্থানের কোনো পথ খোলা ছিল না।

সুতরাং, স্প্যানিশ সৈন্যরা পরের দিন সকালে তাদের সবোর্চ্চ শক্তি ও দক্ষতা দিয়ে লড়াই করে বিজয় অর্জন করেছিল। বাকিটা ইতিহাস;

গল্পের শিক্ষণীয়?

প্রতিটি উন্নয়নশীল দেশ ক্রনিক পুঁজিবাদের (যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার এবং ব্যবসায়ী নেতাদের পারস্পারিক সুবিধা নিশ্চিত হয়) একটি অসুবিধা ভোগ করে। এটি উন্নয়নমূলক প্রক্রিয়ার একটি অংশ যা আমরা মেনে নিয়েছি। দক্ষিণ কোরিয়া পার্কের অধীনে এবং তাইওয়ান চেইং কাই শেকের অধীনে থাকার সময় এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল।

কিন্তু এই দেশগুলো প্রস্থান কৌশল সমর্থনকারীদের কোনোরূপ সুযোগ বা অনুমতি দেয়নি। দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ান দুই দেশই যা কিছু আয় বা অর্জন করেছিল সবটুকু দেশের স্বার্থে বিনিয়োগ করার প্রয়োজন বোধ করে, প্রস্তান কৌশলকে নয়। 

দুর্ভাগ্যক্রমে, প্রাইভেট-জেটের মাধ্যমে প্রস্থান কৌশল প্রত্যক্ষ করার পরে, এটা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে যারা এই কৌশল থেকে লাভবান হয়েছেন এবং এই দেশকে লুণ্ঠন করেছেন, এই খেলাতে এখন আর তাদের কোনো লাভ নেই। 

যখন একদিকে লুণ্ঠনকারীরা মনে করছেন যে,  তারা ব্যাগ গোছাবেন এবং উড়োজাহাজে দেশত্যাগ করবেন, অন্যদিকে দেশের বেশিরভাগ মানুষ মহামারির বিরুদ্ধে লড়াই করে বেঁচে থাকার যুদ্ধে অবতীর্ণ- যা যে কোনও সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বহন করে।  

আমি আশা করি এই মহামারিটি শেষ হলে আমরা এই সামাজিক অসামঞ্জস্য কিছুটা আন্তরিকতার সাথে পুনর্বিবেচনা করব- কারণ, আমরা যদি সত্যই বাংলাদেশ ও জাতিকে একটি অনন্য অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই, তবে আমরা এটিকে এমন একটি দেশের মতো দেখতে দিতে পারি না যেখানে সামান্যতম সততা-ন্যায্যতা নেই।

কারণ, বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে তা হলো শীর্ষস্থানীয় ০.১% অভিজাত শ্রেণি ব্যক্তিগত বিমানে দেশত্যাগ করছেন এবং অন্যদিকে ৯৯.৯% মানুষ মহামারির বিরুদ্ধে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ- যা কোনো দেশ বা সমাজের জন্য খুবই লজ্জাজনক বাস্তবতা।

এটি সেই সামাজিক নীতি নয় যার জন্য আমার বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন।

জাতির এমন পরিস্থিতি দেখে বঙ্গবন্ধু নিশ্চয় গর্বিত হতেন না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক নকশায় রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সততা জাগিয়ে তোলা দরকার, যাতে এই জাতীয় দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আর কখনও না ঘটে।


ড. আশিকুর রহমান, সিনিয়র অর্থনীতিবিদ, পলিসি রিসার্স ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

51
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail