• বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০১, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৭ সকাল

করোনাভাইরাস মহামারি পরবর্তী পৃথিবীর দৃশ্যপট

  • প্রকাশিত ১০:০৩ সকাল জুন ১৯, ২০২০
উদীয়মান অর্থনীতি বাংলাদেশ
কোভিড-১৯ মহামারিকালে বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির ৬৬ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৯ম। ফাইল ছবি: মেহেদি হাসান/ ঢাকা ট্রিবিউন

আগামীর অনিশ্চিত বিশ্বকে মানবিক এবং বাসযোগ্য করে তোলার সুযোগটি এখনও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়নি

মানব সম্প্রদায় যখন ভিনগ্রহে বসতি স্থাপনের চিন্তায় ব্যস্ত, ঠিক তখন  অতি নগণ্য, করোনাভাইরাস নামে এক মহামারি থমকে দিয়েছে প্রযুক্তির চূড়ান্ত উৎকর্ষতায় ধন্য এই সভ্যতাকে। কেউ হয়তো ভাবতেও পারেনি পৃথিবী এভাবে থমকে যেতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ১০ কোটি মানুষ প্রান হারায় কিন্তু সেবারও পৃথিবী এভাবে স্থবির হয়ে পড়েনি। আদিম মানবজাতি যাযাবর জীবনযাত্রা ছেড়ে কৃষিযুগের সূচনা করেছিল প্রায় ১২ হাজার বছর আগে। 

এরপর একের পর এক আবিস্কার-উদ্ভাবনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আধুনিক সভ্যতা, আর এরভেতরেই আমরা  পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত ঘটিয়েছি প্রায় ৮৩% প্রানি এবং ৫০% উদ্ভিদের, যার অর্ধেকেই পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে গত ৫০ বছরে। করোনা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে,  আমারা যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি তা মোটেই টেকসই নয়। আজকের শহুরে মানুষেরা একমাস কর্মহীন থাকলেই বাড়ি ভাড়া দিতে পারেন না, সন্তানদের শিক্ষা বা স্বাস্থ্য ব্যায় বহন করতে অক্ষম হয়ে পড়েন। সেই তুলনায় গ্রামীণ সমাজ নিজেরাই খাদ্য উৎপাদন করে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় একেবারেই কম, আধুনিক লাক্সারি সুবিধা না থাকলেও মাসের পর মাস তারা নিজেদের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরেই স্বাচ্ছন্দে চলতে পারবে। সামগ্রিক বিবেচনায় এখন বড় বড় শহরগুলো অসাড় হয়ে পড়েছে , ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একেবাড়েই সারশূন্যহীন তত্ত্বে পরিণত হয়েছে।

অনেকের কপালেই এখন চিন্তার রেখা, কেমন হতে পারে করোনা পরবর্তী পৃথিবীর চেহারা? এডিবির দেয়া তথ্যমতে করোনার কারনে বৈশ্বিক আর্থিক ক্ষতির পরিমান প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার। শুধুমাত্র উন্নয়নশীল দেশগুলোর এই ক্ষতি পুষিয়ে নেবার জন্য দরকার প্রায় ২.৫ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে দেবে অর্থের যোগান? করোনাভাইরাস মহামারি পরবর্তী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিশ্বব্যাপী চাকরি হারাবে কোটি কোটি মানুষ, যাদের অধিকাংশই তুলনামুলক নিম্ন আয়ের। পর্যটন নির্ভর দেশগুলতেও দেখা দেবে আর্থিক মন্দা। তেল-গ্যাস ভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য দেশগুলতেও পড়বে ব্যাপক প্রভাব। 

ইতোমধ্যেই যানবাহন ও শিল্প কারখানাতে নেমে এসেছে অচলাবস্থা , ফলশ্রুতিতে তেলভিত্তিক অর্থনীতিতে দেখা দেবে বৈশ্বিক মন্দা। এই মহামারির কারণে উন্নত দেশগুলতেও দেখা দেবে সঙ্কটময় পরিস্থিতি, ইতোমধ্যে ইউরোপে তার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এর ফলে একটি ব্যর্থ সংগঠনে পরিণত হতে পারে। বৈশ্বিক দুর্যোগ যখন হয় তখন ধনীদের প্রাসাদেও পৌঁছে যায় ধ্বংসের আগুনের উত্তাপ। তাই হয়তো স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যারাঞ্জা গঞ্জালেস এ বিষয়ে অনেকটা খোলামেলাই বললেন, ‘‘পুরো জাহাজ যখন ডুবছে, তখন ফার্স্ট ক্লাস কেবিন তোমাকে সুরক্ষা দেবে না।’’

বিশ্বব্যাপী বেসামাল পরিস্থিতিতে উন্নত দেশগুলো হয়ে উঠবে আরও বেশী উগ্র জাতীয়তাবাদী, ফলশ্রুতিতে অভিবাসন আইন হয়ে উঠবে আরও বেশী কঠিনতর। অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশগুলোর যেসকল রেমিট্যান্স যোদ্ধারা গরীব দেশগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহ এতদিন ধরে সচল রেখেছিল, সেই রেমিট্যান্সের প্রবাহে স্বভাবতই ভাটা পরবে সামনের দিনগুলোতে। এতদিন ধরে আমরা যে গ্লোবালাইজেশনের বুলি শুনে আসছিলাম আগামিতে সেই গ্লোবালাইজেশন হয়ে পড়বে সংকুচিত, রাষ্ট্রগুলো চাইবে রপ্তানির পরিবর্তে আগে নিজেদের জন্য ভোগ্যপণ্য নিশ্চিত করতে, তাই সাপ্লাই-চেইন , গ্লোবালাইজড এর পরিবর্তে হয়ে উঠবে লোকালাইজড। 

 করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে সামগ্রিক বিশ্বের জিডিপির প্রবৃদ্ধি কমে এসে ঠেকবে ১.৫%-এ। স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারায় অনেক রাষ্ট্রই পরিনত হবে ব্যারথ রাষ্ট্রে। অনেক দেশে এর ফলে দেখা দেবে সামাজিক অস্থিরতা। বিপুল পরিমাণ কর্মহীন ও ক্ষুধার্ত মানুষ বেচে থাকার তাগিদে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়বে, এরফলে ধনিক শ্রেণিও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। 

করোনাভাইরাসের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে সামাল দিতে না পারলে অনেক দেশের সরকারই নাজুক পরিস্থিতিতে পড়বে। করোনাভাইরাস মোকাবেলায় রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে কেন্দ্র করে একধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হবে। সম্প্রতি কসোভোতে সরকারের পতন ঘটেছে। এটি আমাদের জন্য একটি উদাহরন। আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের ঘটনা  আরও প্রত্যক্ষ করার সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক উন্নত রাষ্ট্রই তাদের ক্ষমতার বলয় হারাবে, ইতোমধ্যে চীন-রাশিয়ার দিকে বৈশ্বিক ক্ষমতা বলয়ের বাতাস বইতে শুরু করেছে, অন্য দিকে ক্রমেই বেসামাল হয়ে পড়ছে ইউরোপ-আমেরিকা।

করোনাভাইরাস আমাদের উপলব্ধি করিয়েছে, মানবজাতি আসলে কতখানি অসহায় এবং একই সাথে স্বার্থপর। নিজেদের সুখভোগের জন্য আমরা যুগ-যুগ ধরে প্রকৃতির উপর অত্যাচার করেছি, আমাদেরই কারণে পরিবেশ থেকে হারিয়ে গিয়েছে হাজার হাজার প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতি। আমরা শুধু পরিবেশের উপর অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হইনি, যেখানেই দুর্বল মানুষদের পেয়েছি সেখানেই ক্ষমতার বলয়কে বাড়াতে তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়েছি। তাই ২০২০ সালে এসেও আফ্রিকা, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন কিংবা মিয়ানমারে মধ্যযুগের বর্বরতার পুনরাবৃত্তি ঘটে। আমরা মানব কল্যাণের চেয়ে ধ্বংসের প্রতি বেশী বিনিয়োগ করছি।  পৃথিবীর নেতাদের কাছে ঔষধের গবেষণার চেয়ে রং ফর্সা করার ক্রিম তৈরিতে বিনিয়োগ বেশী আকর্ষণীয়, তাতে বাণিজ্যিক লাভ বেশি থাকে। 

অথচ যুদ্ধাস্ত্র বা বিলাসিতার জন্য ব্যায়িত অর্থ যদি মানব কল্যাণে বিনিয়োগ হতে তবে আজকের দিনে ক্ষুধা ভরা পেট নিয়ে কেউ খোলা আকাশের নিচে কেউ ঘুমাতে যেত না। লেখাটি শেষ করবো ইউভ্যাল নোয়া হারারির একটি উক্তিতে, তিনি বলেছেন “ দ্য আনিম্যাল বিকেম এ গড।”

হাজার বছর আগের আফ্রিকান জঙ্গলের সেই যাযাবর আদিম মানুষ আজ বিশ্ব শাসন করতে করতে এই গ্রহটিকেই ধ্বংসের দারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এই হোম স্যাপিয়্যান্সের কাছে প্রানি বা উদ্ভিদকুল কেউই নিরাপদ নয়, এতকিছুর পরেও কি আমরা নিজেদের সুখী করতে পেরেছি? আমাদের নতুন করে ভাবা দরকার আদিম কৃষি যুগের তুলনায় আজকের আধুনিক যুগে একজন মানুষ কতখানি প্রশান্তি নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারে? বিশ্ব নেতাদের এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সেরা সময়, মানবজাতি কি এই ধ্বংসের যাত্রা অব্যাহত রাখবে নাকি একটি সুখী মানবিক পৃথিবী গঠনের জন্য নতুন করে যাত্রা শুরু করবে? 

আগামীর অনিশ্চিত বিশ্বকে মানবিক এবং বাসযোগ্য করে তোলার সুযোগটি এখনও আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়নি।


ফজলে রাব্বী খান, গবেষক শিক্ষার্থী এবং প্রকৌশলী


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

53
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail