• সোমবার, আগস্ট ১০, ২০২০
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:০৮ রাত

মহামারির মাঝে যেমন যাচ্ছে মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাঙালিদের দিন

  • প্রকাশিত ০৯:৫৬ রাত জুলাই ৪, ২০২০
মালয়েশিয়া
ফাইল ছবি/রয়টার্স

কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর অন্যান্য দেশের মতো মালয়েশিয়াতেও লেগেছে ধাক্কা

আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে আড়াইগুণ বড় মালয়েশিয়ায় মোটামুটি সব অঞ্চলে পর্যটকের কম বেশি ভিড় লেগে থাকে সারা বছর, আর ভিড়টা সব চেয়ে বেশি হয় টুইনটাওয়ারের শহর কুয়ালালামপুরে। যার কারণে কুয়ালালামপুরে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে পর্যটক-কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে। 

পুরো শহরজুড়ে অসংখ্য বড় বড় শপিং মল, হেরিটেজ মল, হোটেল, পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র, রেস্টুরেন্ট, ক্লাব, বার, পাব গড়ে উঠেছে। 

এছাড়াও, মালয়েশিয়ার সর্বত্রই নির্মাণশিল্প, ইলেকট্রনিক্স ফ্যাক্টরি, রাবার শিল্প, পামফলের বাগানসহ অসংখ্য কল-কারখানা।

আয়তনে বাংলাদেশের চাইতে বড় হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে অনেক কম হওয়ায় মালয়েশিয়ার অর্থনীতিকে সচল রাখতে প্রয়োজন হয় লক্ষ লক্ষ প্রবাসী কর্মীর। 

বেসরকারি সমীক্ষায় যা সংখ্যায় কমে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় মিলিয়ন, যার মাঝে আড়াই মিলিয়ন মানুষের কাজ করার বৈধ ওয়ার্ক-পারমিট থাকলেও বাকি তিন মিলিয়ন মানুষের নেই কোনো বৈধ ওয়ার্ক-পারমিট।

এখানে কাজ করা শ্রমিকদের বেশির ভাগ ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, ফিলিপিন, নেপাল, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশের।

কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর অন্যান্য দেশের মতো মালয়েশিয়াতেও লেগেছে ধাক্কা। যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী প্রবাসী কর্মীরা। আমি নিজেও একজন মালয়েশিয়া প্রবাসী। গত সাড়ে ছয় বছর ধরে বসবাস করছি রাজধানী কুয়ালালামপুরের জমজমাট এরিয়া বুকিত বিনতাংয়ে। কর্মক্ষেত্রও আশেপাশে।

কোভিড-১৯ মহামারি ঠেকাতে মার্চে মালয়শিয়াতে শুরু হয় মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (লকডাউন)। শুরুর কিছুদিন ঘরে বসে নিরাপদে থাকার জন্য, মোটামুটি জমানো টাকা খরচ করে চালিয়ে নিতে অসুবিধা হয়নি। কিন্তু দিন যত বাড়তে থাকে জমানো টাকায়ও টান পড়ে। 

কারণ এখানে কেউ টাকা ব্যাংকে জমা করে রাখে না, মাস শেষে দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। আমার নিজের কর্মস্থলও ৩১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কাজকর্ম না থাকায় বেতনও বন্ধ, আয় বন্ধ, কিন্তু খরচ বন্ধ নেই। অন্য কোথাও কাজ খুঁজবো তার উপায়ও নেই কারণ সব দিকে একই অবস্থা চলছে কর্মঘণ্টা কমিয়ে কাজ অথবা কর্মী ছাঁটাই। দিন যত যাচ্ছে ততই কঠিন হচ্ছে। 

পরিস্থিতি অক্টোবরের আগে ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু অক্টোবর পর্যন্ত টিকে থাকাটা এখন বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। সাথে থাকা লোকজনের বেশির ভাগেরই একই দশা। সাথে থাকা চারজনের কাজ নেই, দু'জন কাজে যাচ্ছে গত দু সপ্তাহ্ ধরে তবে বেতন অর্ধেক। নেই কোনো ওভার টাইমও। 

অন্যদিকে, দেশে সবার পরিবার-পরিজন এদিকে পথ চেয়ে বসে আছে কবে টাকা পাঠানো হবে। কারণ আমাদের মত প্রবাসীদের পরিবারগুলো মাস শেষে প্রবাসের রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, সব কিছু মিলে চারপাশ অন্ধকার।

চীনে কোভিড-১৯ সংক্রমণের পরপর প্রথম দিকে যে কটি বাইরের দেশে তা ছড়ায় তার মধ্যে মালয়েশিয়া একটি। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে প্রথম কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়। শুরু থেকে বিভিন্ন তৎপরতার কারনে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রনে থাকলেও ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে একটি ধর্মীয় জামায়াত হতে সেটি ছড়িয়ে পড়ে সারা মালয়েশিয়াতে। দ্রুত বাড়তে থাকে রোগীর সংখ্যা। 

হাজার ছাড়িয়ে গেলে ১৮ই মার্চ হতে ৩১শে মার্চ পর্যন্ত ঘোষণা করা হয় ১৪ দিনের মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (MCO) যা পর্যায় ক্রমে আরও তিন দফা বৃদ্ধি করা হয় ৩ মে পর্যন্ত।

এ সময় শুধুমাত্র খাদ্য পণ্যের দোকান, এটিএম বুথ, ক্লিনিক ও হাসপাতাল ব্যতীত সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ জারি করা হয়। এর মাঝে খাদ্য পণ্যের দোকানও শুধুমাত্র সকাল ৮ টা হতে রাত ৮ টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। অপ্রয়োজনীয় চলাচল নিয়ন্ত্রণে প্রতিটি এলাকা চেকপোস্ট দিয়ে বন্ধের পাশাপাশি জেলাভিত্তিক ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। বিনা প্রয়োজনে বের হলে করা হয় জেল-জরিমানা।

এই যখন পরিস্থিতি তখন মূলত বেশিরভাগ প্রবাসী কর্মীর কর্মহীন হয়ে ঘরে বসে থাকতে হয়। প্রথম দু-সপ্তাহ্ মোটামুটি কোনভাবে চালিয়ে নিলেও পরের দিন গুলোতে সমস্যা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে উঠছে। মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (MCO) ৩ মে শেষ হওয়ার পর ৪ মে শুরু হয় কন্ডিশনাল মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (CMCO) যা বলবৎ থাকে ৯ জুন পর্যন্ত।

এই সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল কিছুটা শিথিল করা হলে কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

সর্বশেষ ১০ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে রিকোভারি মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডার (RMCO)। এর মঝে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান খোলা হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভিড়-জনসমাগম এড়িয়ে চলার বিধিনিষেধে কড়াকড়ি থাকায় কিছু প্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ রয়েছে এবং বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে কর্মী সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাতিল করা হয়েছে ওভার টাইমসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা। যার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশী কর্মীদের আয় নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। যা দিয়ে নিজের খরচ যোগাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অন্যদিকে দেশে পরিবার পরিজনের খরচ মেটানোর দুশ্চিন্তা দিন দিন বাড়ছে। 

এছাড়াও মালয়েশিয়াতে অসংখ্য বাংলাদেশি কর্মী রয়েছে যারা নিজ নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ না পেয়ে অন্যত্র কাজ করে। কোভিড-১৯ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ছে এই শ্রেণির প্রবাসীরা। কারণ তাদের বেশিরভাগই বর্তমানে কর্মহীন। অন্যদিকে নিজ নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ না করায় পাচ্ছে না কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও। 

শুরুর দিকে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে কিছু খাদ্য সহায়তার আবেদন গ্রহণ করা হয়। অনলাইনে করা আবেদনপত্র থেকে যাচাই বাছাই করে অনেককে সহযোগিতা করা হয়। তবে এখন তেমন কোনো সুযোগও নেই। 

সবচাইতে শোচনীয় অবস্থায় দিন পার করছেন যাদের বৈধ ওয়ার্ক-পারমিট নেই তারা। কারণ কোভিড-১৯ সংক্রমণের মাঝেও চলছে অবৈধ অভিবাসীদের ধড়পাকড় অভিযান। যার একপর্যায়ে মালয়শিয়ার বিভিন্ন ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ক্যাম্পগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে কোভিড-১৯। 

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ নিয়ে প্রশ্ন তুললেও থেমে নেই ধড়পাকড়। এদের অনেকেই ২০১৬-১৭ সালে বৈধতার জন্য আবেদন করেও প্রতারণা ও একাধিকবার সরকার পরিবর্তনের পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনসহ বিভিন্ন জটিলতায় সফল হতে পারেননি।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজের পাশাপাশি এদেশে অনেক বাংলাদেশি ব্যবসা বাণিজ্যও করছেন। যার বেশিরভাগ মিনি মার্ট-গ্রোসারী ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। নতুন সরকার গঠনের পর হতেই মালয়শিয়াতে বিদেশিদের পরিচালিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চলছে অভিযান, লাইসেন্সসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজ-পত্র, স্থানীয় কর্মী নিয়োগ, বৈধ কর্মী না থাকা সহ নানা কারনে ইতমধ্যে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ফলে এখানে বিনিয়োগকারী বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন সঙ্কটে।

এই যখন অবস্থা তখন সেপ্টেম্বরের টাইমলাইন অনুযায়ী পরিস্থতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। আর ফ্লাইট চালু না হওয়াতে কর্মহীন হয়ে বসে থাকা লোকজন না ফিরতে পারছেন দেশে, না পারছে এখানে টিকে থাকতে। 

এদিকে, দেশের পরিস্থতিও স্বাভাবিক না, দিন দিন বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। মালয়েশিয়াতে কোভিড-১৯ এর বন্ধ ঘোষণার আগে যারা ছুটিতে দেশে গিয়েছেন তারাও ছুটি শেষে ফিরতে পারছেন না। 

সব কিছু মিলিয়ে চলতি বছরের শেষ নাগাদ পরিস্থতি স্বাভাবিক হওয়ার আগ পর্যন্ত এখানকার প্রবাসী কর্মীদের জন্য তেমন কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না।


আবু রাইহান, মালয়েশিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশি


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

53
50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail