• সোমবার, জানুয়ারি ১৮, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ০১:৪৮ দুপুর

ভাস্কর্য প্রশ্নে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্ব

  • প্রকাশিত ০৫:২২ সন্ধ্যা ডিসেম্বর ১৪, ২০২০
ভাস্কর্য-তুরস্ক
তুরস্কের এস্কিহির প্রদেশের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে বাদ্যযন্ত্রসহ একটি সংগীত পরিবেশনকারী দলের ভাস্কর্য। টার্কিস ফর লাইফ.কম

বিতর্কটাকে আরও ধূমায়িত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে আলেম উলামাদের সাথে বসে তাদের উত্থাপিত আপত্তিসমূহ ধৈর্য্য সহকারে শুনে এগুলো কতটুকু ধর্মীয় বিচারে উত্তীর্ণ আর কতটুকুই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা নির্ধারণের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা দরকার

বিষয়টি অবশেষে আদালত পর্যন্ত গড়াল। বিতর্কটি শুধুই ভাস্কর্য নিয়ে হলে হয়তো এতটা উত্তাপ ছড়াত না। পরিস্থিতি এতটা উতপ্ত হওয়ার কারণ, নির্মীয়মাণ ভাস্কর্যটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, যিনি এ দেশটির স্থপতি। এ দেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য ‘৭১-এ মুক্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তদীয় কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা আজ দেশ পরিচালনা করছেন। 

বঙ্গবন্ধুর অসংখ্য গুণগ্রাহী এ উদ্যোগটিকে এই মুজিব বর্ষে তার স্মৃতিকে ভাস্কর করে রাখার একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, এ দেশের আলেম-উলামাদের একটি বড় অংশ ভাস্কর্য নির্মাণকে অনৈসলামিক বিবেচনা করে এর কঠোর বিরোধিতায় নেমেছেন। শুরুতে বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে বিতর্কটা উতপ্ত বাক্য বিনিময় ও পাল্টা-পাল্টি মিছিল সমাবেশে সীমাবদ্ধ থাকলেও কুষ্টিয়ায় নির্মীয়মাণ বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্যের অংশবিশেষ কে বা কারা রাতের অন্ধকারে ভেঙে ফেললে বিষয়টি একটি ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। সারাদেশে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। আপনি খেয়াল করে থাকবেন, বিতর্কটিতে একাধারে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উপাদান যুক্ত হয়ে এক জটিল আকার ধারণ করেছে।

আগেই যেমন বলেছি, চলমান বিতর্কের একটি স্পর্শকাতর দিক হল, এতে বঙ্গবন্ধুর নাম জড়িয়ে আছে। অন্যদিকে, এ দেশের সিংহভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তাদের উপর আলেম-উলামাদের গভীর প্রভাব রয়েছে। এ কারণে এর ধর্মীয় দিকটাও অত্যন্ত স্পর্শকাতর। একটি বিষয় আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, বিবাদমান দুটি পক্ষের কেউই ধর্মকে অগ্রাহ্য করে এগুতে চাচ্ছেন না। আলেম-উলামারা যখন কুরআন-হাদিস থেকে দলিল দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণে ব্যস্ত, অন্যদিকে যারা ভাস্কর্য নির্মাণের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন তারাও বিভিন্ন মুসলিম দেশে ভাস্কর্যের উপস্থিতির উদাহরণ টেনে বুঝানোর চেষ্টা করছেন, ইসলামের সাথে ভাস্কর্যের কোনো বিরোধ নেই।

পুরো বিতর্কের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এর ধর্মীয় দিকটা। আলেম উলামাদের মূল বক্তব্যটা কী? তারা মনে করছেন, বিষয়টির সাথে ইসলামের মৌলিক আকিদা-বিশ্বাসের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। ইসলামী বিশ্বাসের মূল স্তম্ভই হচ্ছে একাত্মবাদ। এখানে আল্লাহর সাথে কাউকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরীক করাকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের ঘোষণা মোতাবেক তিনি যাকে চাইবেন, সব ধরনের অপরাধ মার্জনার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন, কিন্তু শিরকের অপরাধ কোনো অবস্থায় মার্জনা করবেন না। রাসূল (সা:) আরব উপদ্বীপ থেকে মূর্তি পূজাকে সমূলে উৎপাটন করেন, যা বিগত ১৫ শ’ বছরে মুসলিম সমাজে কোনোভাবেই আর ফিরে আসতে পারেনি। আলেম উলামাদের দাবি, রাসূল (সা:) থেকে বর্ণিত একাধিক নির্ভরযোগ্য হাদিস থেকে মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর ত্রিমাত্রিক ইমেজ তৈরি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাছাড়া, হাদিস থেকে এমন ইঙ্গিতও মিলে যে, পূর্ববর্তী নবীদের যুগে মূর্তি পূজার সূচনাটা ঘটেছিল অনুপ্রেরণা লাভের উদ্দেশ্যে জাতির গুণী ব্যক্তিদের ছবি টাঙানো বা ইমেজ তৈরির মাধ্যমে। 

এদিকে, ভাস্কর্য তৈরির বিরোধিতা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এবং শিল্পমনষ্ক মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তারা এটাকে শিল্প-সংস্কৃতির উপর একটি বড় ধরনের আঘাত হিসেবে দেখছেন। আধুনিক বিশ্বে ভাস্কর্যকে কেবল একটি অপরূপ শিল্পকর্ম হিসেবেই নয়, জনতার আবেগ-অনুভূতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য কিংবা আদর্শিক-সামাজিক চিন্তা-চেতনা রূপায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি হতে পারে ইতিহাসের কোনো গৌরবময় মুহূর্তের স্মারক, জাতির কোনো শ্রেষ্ঠ সন্তানের স্মৃতিফলক কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে কোনো ধর্মীয় দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি। অধুনা মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই জাতীয় ইতিহাসের বরেণ্য ব্যক্তিদের ভাস্কর্যের উপস্থিতির রিপোর্ট পাওয়া যায়। এদের মধ্যে আছেন তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, পাকিস্তানের কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনি, মিশরের জামাল আব্দুল নাসের, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এবং প্রয়াত মুসলিম মনীষীদের মধ্যে আল্লামা ইকবাল, আবুল কাশেম ফেরদৌসী, জালালুদ্দিন রুমি প্রমুখ। এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে যে বিষয়টি আসে তা হল, এসব দেশের কোথাও কি জাতীয় বীর বা মনিষীদের এসব ভাস্কর্য মূর্তির ন্যায় পূজিত হচ্ছে কিংবা নিকট বা দূর ভবিষ্যতে পূজিত হওয়ার আদৌ কোনো সম্ভাবনা আছে? এ দেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি বিশেষভাব প্রণিধানযোগ্য একারণে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশটির স্থপতি এবং বিবিসির মত সংবাদ মাধ্যমের জনমত জরিপে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এটি যদি মুসলিম সমাজ না হয়ে ভিন্নতর সমাজ হতো, তা হলে অনেকেই হয়তোবা তাকে রীতিমত দেবতা জ্ঞান করে পূজা করত। 

এখানে, একটি বিষয় আপনি লক্ষ্য করে থাকবেন, মুসলিম বিশ্বে উপরে উল্লিখিত ভাস্কর্যসমূহের বেশিরভাগই নির্মিত হয়েছে, মুসলিম রেনেসাঁর সময়কালে জাতীয় বীর/মনীষীদের সম্মানে/স্মরণে, যখন বিভিন্ন মুসলিম জাতিগোষ্ঠী পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পরাধীনতার নিগড় থেকে সবে মুক্তি পেয়েছে কিংবা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত থেকে নিজেদের স্বাধীনতা কোনো রকমে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। দীর্ঘদিন পশ্চিমা শক্তির অধীণে থাকার ফলে কিংবা অর্থনৈতিক, সামারিক ও রাজনৈতিক পরিমন্ডলে পশ্চিমারা অধিকতর শক্তিশালী হওয়ায় একদিকে আমরা যেমন তাদের সাহচর্যে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ হয়েছি, অন্যদিকে সব বিষয়ে তাদেরকে মডেল হিসেবে গণ্য করে তাদেরকে অনুকরণ করার একটি প্রবণতাও আমাদের অনেকের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেও তেমন কিছু ঘটেছে বা ঘটছে, তেমনটি আমি বলতে চাচ্ছি না। তবে, আপনি আপনি একটু খেয়াল করে দেখুন তো, ইসলামের ইতিহাসের সোনালী অধ্যায়ে যখন ইসলাম বিশ্বশক্তি হিসেবে স্বমহিমায় বিরাজমান ছিল, সে সময়কার মুসলিম জাতির জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিদের ভাস্কর্য নির্মাণের কোনো উদাহরণ দেখা যায় কি? সে রকম হলে, আজকে খলিফা উমর (রা:), সেনানায়ক খালেদ বিন ওয়ালিদ (রা:), সেনানায়ক তারিক বিন জিয়াদ, খলিফা হারুনুর রশীদ, সুলতান মাহমুদ, সম্রাট বাবর, সম্রাট আকবর কিংবা সম্রাট আওরঙ্গজেবের মতো ব্যক্তিদের অনেক ভাস্কর্য মুসলিম বিশ্বের আনাচে-কানাচে শোভা পেত। ক্রুসেড বীর সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর একটি ভাস্কর্যের রিপোর্ট এসেছে, তবে এটি নির্মিত হয়েছে হালে প্রয়াত সিরিয়ান প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল আসাদের সময়কালে।

তাহলে কি ইসলামী সংস্কৃতি স্থাপত্য-কলার বিরোধী। ব্যাপারটি তেমন নয়। ইসলামের ইতিহাস জুড়ে স্থাপত্য কলা শাসককূলের পৃষ্ঠেপোষকতায় বিকশিত হয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে... মূলত মসজিদ-মিনার, দুর্গ, প্রাসাদ, সমাধি সৌধ ইত্যাদির মাধ্যমে। এসবের মধ্য দিয়ে মুসলিম স্থাপত্য কলার একটি নিজস্ব শৈলী গড়ে ওঠে। এমনকি, এ ধরনের কিছু স্থাপত্য-কর্ম বিশ্ব ঐতিহ্যের অমর কীর্তি হিসেবেও স্থান লাভ করেছে। স্পেনের আল হামরা, আফগানিস্তানের জামের মিনার, আগ্রার তাজমহল, দিল্লির কুতুব মিনার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি উদাহরণ। দিল্লির কুতুব মিনার ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীন মুসলিম সুলতান কুতুব উদ্দিন আইবেকের স্মারক হিসেবে ৮০০ বছর ধরে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। বাহাদুর শাহ পার্কে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ, পাকিস্তানের লাহোরে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের স্মারক হিসেবে নির্মিত মিনার-এ-পাকিস্তান, বাংলাদেশে ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত শহীদ মিনার এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি দৃষ্টান্ত।

ভাস্কর্য নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কটি বিশেষ উত্তাপ ছড়ানোর আরেকটি কারণ সম্ভবত এর রাজনৈতিক উপাদান। এদেশে ধর্মীয় বিষয়ে দল-মত নির্বিশেষে সবাই আলেম-উলামাদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সমস্যা দেখা দেয়, যখন এখানে কোনো রূপ রাজনৈতিক যোগ-সাজশ কাজ করছে বলে অনুমিত হয়। এ রকম সন্দেহ দেখা দেওয়ার কারণ, যারা ভাস্কর্যের বিরোধিতায় সোচ্চার তাদের অনেকেই সরাসরি রাজনীতিতে জড়িত। কেউ কেউ এমনও ভাবছেন, উনারা এক বা একাধিক বড় দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন। বিষয়টির ধর্মীয় দিকটি গ্রহণযোগ্যভাবে তুলে ধরতে চাইলে আলেম উলামাদের এ সন্দেহটি অপনোদন করতে হবে। যে সব বরেণ্য আলেম-উলামা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, তারা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। 

অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুকে সব ধনের ঊর্ধ্বে রাখা আমাদের প্রায়োরিটি হওয়া উচিৎ। আমরা জানি, তিনি একজন ধর্মপরায়ণ মুসলিম ছিলেন। তদীয় কন্যা মাননীয়া প্রধানমন্ত্রীও নিয়মিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন বলে আমরা জানি। তার স্মৃতি চির-জাগরুক রাখার জন্য তার সম্মানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তাকে অবিতর্কিত রাখা এবং একজন মুসলিম হিসেবে আমরা যে কাজ করলে তার আত্মা শান্তি পাবে সেটার প্রতিও গুরুত্বারোপ করা জরুরি। কাজেই, নীতি-নির্ধারকদের বিতর্কটাকে আরও ধূমায়িত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে আলেম উলামাদের সাথে বসে তাদের উত্থাপিত আপত্তিসমূহ ধৈর্য্য সহকারে শুনে এগুলো কতটুকু ধর্মীয় বিচারে উত্তীর্ণ আর কতটুকুই বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত তা নির্ধারণের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা দরকার।

সবাই ভাল থাকুন।


ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন, অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

52
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail