• মঙ্গলবার, মার্চ ০২, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪১ রাত

প্রধানমন্ত্রীর মানহানি এবং আইনি প্রতিকার

  • প্রকাশিত ০২:৩০ দুপুর ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২১
pm-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফাইল ছবি: ফোকাস বাংলা

আল-জাজিরা ডকুমেন্টারিটিতে অনেক কিছুই দেখিয়েছে যার ব্যাপারে সুষ্ঠু ও সঠিক অনুসন্ধান হওয়া উচিত, তবে আইনের দৃষ্টিতে তার কিছুই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গায়ে লাগেনি

সম্প্রতি কাতারভিত্তিক আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের প্রচারিত “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামক ডকুমেন্টারি নিয়ে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীতে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ডকুমেন্টারিটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রবণতা নিয়ে বর্তমান সরকার বেশ জোরালোভাবেই বিবৃতি দিয়েছে। আমি ডকুমেন্টারিটির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা ডকুমেন্টারিটি তৈরি করার নেপথ্যে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে লিখতে বসিনি। 

আমি আইনজীবী হিসেবে ডকুমেন্টারিটি একটি নিরাবেগ এবং পক্ষপাতশূন্য জায়গা থেকে দেখার চেষ্টা করেছি। আর সেই দৃষ্টিকোণটি পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি।

এখানে দুটো কথা পরিষ্কার করা দরকার। প্রথমত, আমার মতামতগুলো সম্পূর্ণ একটি আইনি বিশ্লেষণ যার সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক পদটির মর্যাদা, গরিমা ও গাম্ভীর্য ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক পদটিকে সম্মান করি যার সাথে আমার রাজনৈতিক মতাদর্শের কোনও সম্পর্ক নেই। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী নামক সাংবিধানিক পদ এবং এই পদে আসীন ব্যক্তির ওপর যদি বিদেশি কোনও সরকারি বা বেসরকারি সংস্থা অন্যায্য অপবাদ আনে, তাহলে তার বিরোধিতা করা আমাদের নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আওয়ামী লীগ বা বিএনপি দেখে পালন করলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, ডকুমেন্টারিটির অন্যান্য চরিত্রগুলোর বাংলাদেশের আইন-কানুন ভঙ্গের যে সকল তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে তার সঠিক অনুসন্ধান হওয়া উচিত।

“অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামটি “অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন” নামক একটি বই থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ব্যবহার করা হয়েছে। “অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন” হল ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকার সাংবাদিক যুগলবন্দী কার্ল বার্নস্টিন ও বব উডওয়ার্ডের ১৯৭৪ সালের লেখা এক কালজয়ী বই যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭২ সালে সংঘটিত কুখ্যাত ওয়াটার গেইট কেলেঙ্কারি এবং এই কেলেঙ্কারির মূলহোতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের সম্পৃক্ততার সত্যতা তুলে ধরে। বইটিতে প্রেসিডেন্ট’স মেন শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয় সেসব কর্মকর্তা-কর্মচারিদের চিহ্নিত করতে যারা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের আজ্ঞাবহ ছিলেন এবং রিচার্ড নিক্সনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত এবং ধামাচাপা দেওয়ার কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন।

সুতরাং প্রথমেই আইনজীবী হিসেবে আমি দেখতে চেয়েছি আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের প্রচারিত “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামক ডকুমেন্টারিটি ১৯৭৪ সালের বই “অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন”-এ উল্লিখিত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনও অপরাধ বা দুর্নীতির প্রতিবেদন দেয় কিনা। আমি শুরুতেই লিখেছি, দেখার বিষয় হচ্ছে ডকুমেন্টারিটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপর কোনও অন্যায্য অপবাদ এনেছে কিনা এবং যদি অপবাদটি অন্যায্য হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কোনও আইনি প্রতিকার আছে কি না। ডকুমেন্টারিটিতে চিত্রায়িত অনেকেরই কার্যকলাপ প্রশ্নবিদ্ধ। তবে ডকুমেন্টারিটির অন্যান্য চরিত্রগুলোর কৃতকর্মের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনও রকম যোগাযোগ দেখা যায়নি।

এখন প্রশ্ন হলো, যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই, যে ডকুমেন্টারিটির অন্যান্য চরিত্রগুলো কোনও অপকর্মের সঙ্গে জড়িত, সেক্ষেত্রে কোনও যুক্তিতে এ কথা বলা যাবে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সে সকল অপকর্মের সঙ্গে জড়িত? মানহানিসংক্রান্ত আইনে একটি তাত্ত্বিক বিষয় আছে যাকে বলা হয় “আরোপ” (Imputation)। “আরোপ” (Imputation) একটি মানুষের বা সংস্থার সম্মান বা মর্যাদার সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। “সম্মান" ও “মর্যাদা” শব্দগুলো দেখতে হবে সমাজ বা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে। অর্থাৎ, মানহানি মামলায় প্রধান বিচার্য বিষয় হবে কোনও “আরোপ” (Imputation) সমাজ বা সম্প্রদায়ের চোখে একটি মানুষের বা সংস্থার যে সম্মান বা মর্যাদা বা কোনও সমাজ বা সম্প্রদায় সে মানুষ বা সংস্থাকে যে সম্মান বা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে, তার কোনও ক্ষতি করল কি না বা সে সম্মান বা মর্যাদার দৃষ্টিকোণের উপর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ল কি না।

যেহেতু ডকুমেন্টারিটির অন্যান্য চরিত্রগুলোর কৃতকর্মের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোনও রকম যোগাযোগ আল-জাজিরা নেটওয়ার্ক দেখাতে পারেনি, সুতরাং, মানহানিসংক্রান্ত আইনেরতত্ত্ব অনুসারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের দেওয়া অপরাধ বা দুর্নীতির “আরোপ” (Imputation) বাংলাদেশের বা বাঙালি সমাজ বা সম্প্রদায়ের চোখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে সম্মান বা মর্যাদা বা বাঙালি/বাংলাদেশি সমাজ বা সম্প্রদায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যে সম্মান বা মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখে, তার ক্ষতি করেছে বা সে সম্মান বা মর্যাদার দৃষ্টিকোণের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে বিতর্ক করা যায়।

বাংলাদেশের দেওয়ানী মানহানি সংক্রান্ত আইন এখনো পরিপক্ব হয়ে উঠেনি। কমনওয়েলথ দেশগুলোর মানহানি সংক্রান্ত আইনের বিশ্লেষণসমূহ বাংলাদেশের আইন প্রয়োগে আমলযোগ্য। সে হিসেবে যদি দেখানো যায় যে, ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত কুখ্যাত ওয়াটারগেইট কেলেঙ্কারির মূলহোতা তৎকালীন রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সনের সম্পৃক্ততার উপর লিখিত “অল দ্য প্রেসিডেন্ট’স মেন” নামকবই এর নামকে অবলম্বন করে আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামীয় ডকুমেন্টারি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর দেওয়া অপরাধ বা দুর্নীতির “আরোপ” (Imputation) বাংলাদেশের বা বাঙালি সমাজ বা সম্প্রদায়ের চোখে উনার সম্মান বা মর্যাদার ক্ষতিসাধন করেছে, তাহলে বাংলাদেশের আদালতে আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে মানহানি সংক্রান্ত দেওয়ানী মামলা (tort of defamation) করা যায়। বাংলাদেশি আদালতের এই মামলার অধিক্ষেত্র তৈরি হয়েছে কারণ ডকুমেন্টারিটি বাংলাদেশের জনগণ বাংলাদেশে বসে দেখেছেন এবং আন্তর্জাতিক মানহানি সংক্রান্ত আইন ও কমনওয়েলথ দেশগুলোর উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে যে দেশে মানহানিকর খবর বা ডকুমেন্টারি পাঠক বা দর্শক দেখলেন বা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করলেন, সে দেশের আদালত অধিক্ষেত্র জাহির করতে পারেন। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হল আল-জাজিরা নেটওয়ার্ক কাতারে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ বা কাতার– এ দুটি দেশের মধ্যে কোনও দেশের আইন আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের মানহানি সংক্রান্ত আইনি দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করবে। আন্তর্জাতিক মানহানি সংক্রান্ত আইন ও কমনওয়েলথ দেশগুলোর উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুসারে যে দেশে সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে মানহানি হয়েছে সে দেশের আইন মানহানিকারীর আইনি দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করবে (ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় lex loci delicti)। সে দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে যেহেতু ডকুমেন্টারিটি পাঠক বা দর্শক বাংলাদেশে দেখেছেন বা ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করেছেন, সেহেতু বাংলাদেশের আদালত আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের ওপর মানহানি সংক্রান্ত অধিক্ষেত্র জাহির করতে পারেন।

বিখ্যাত ইংরেজ চিন্তাবিদ এবং দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন বলেছিলেন –“সাহসের সাথে নিন্দা করুন – কিছু না কিছু লেগেই যাবে” (Hurl your calumnies boldly; something is sure to stick)। আল-জাজিরা নেটওয়ার্কের প্রচারিত “অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার’স মেন” নামক ডকুমেন্টারিটি অনেক কিছুই দেখিয়েছে যার ব্যাপারে সুষ্ঠু ও সঠিক অনুসন্ধান হওয়া উচিত; তবে আইনের দৃষ্টিতে তার কিছুই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গায়ে লাগেনি। প্রশ্ন হল আমরা দল-মতের বাইরে থেকে জাতি হিসেবে বিদেশি কোনও সরকারি-বেসরকারি সংস্থাকর্তৃক উনার ওপর আনীত এই অপবাদ প্রতিহত করব কি না। আমি শুরুতেই লিখেছি- এটা কোনও দলীয় প্রশ্ন না; এটা আমাদের জাতিগত সম্মানের প্রশ্ন।

 আপনারা নির্ধারণ করুন।


জুনায়েদ চৌধুরী,  আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।



56
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail