• শনিবার, এপ্রিল ১৭, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১ রাত

একটি বিজ্ঞানমনস্ক প্রজন্ম গড়ার প্রচেষ্টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাব

  • প্রকাশিত ১১:০৯ রাত ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২১
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
সৌজন্যে

একটি জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতি ও প্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে এর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম - কিশোর-তরুণেরা কীভাবে গড়ে উঠছে তার উপর

একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ কী? কোথায় নিহিত এর শক্তিমত্তার সবচেয়ে বড় আধার? জাতি কি সামনে এগুবে না পিছিয়ে পড়ে হামাগুড়ি দিতে থাকবে তার নিয়ামকই বা কী? এর প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ? ভূমির উর্বরতা? অর্থের যোগান? সমর সম্ভার? সন্দেহ নেই, এর সব কটিই গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে, মনে হয়, এগুলোর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর মানব সম্পদ--একটি দক্ষ, শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী, যারা দেশ ও জাতির প্রয়োজনে নিজেদের সর্বস্ব নিংড়ে দিতে সদা প্রস্তুত। একটি জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতি ও প্রগতি বহুলাংশে নির্ভর করে এর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম - কিশোর-তরুণেরা কিভাবে গড়ে উঠছে তার উপর। 

একটি দূরদর্শী জাতি এ কারণে তাদের তরুণ প্রজন্মকে ভবিষ্যতের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ ও সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে। আপনি একটু ক্ষুদ্র পরিসরে ভাবুন। একটি হতদরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা যখন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সুশিক্ষিত হয়ে  সমাজে আলো ছড়াতে শুরু করে, এক প্রজন্ম আগেও যারা চারিদিকে অর্থ-বিত্তে প্রবল প্রতিপত্তিশীল ছিল তাঁরা কেমন যেন এদের সামনে ছায়া হয়ে যায়। একইভাবে একটি জাতি যদি তার তরুণ প্রজন্মকে শিক্ষিত ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে, এক প্রজন্মের ব্যবধানেই আপনি হয়তো একটি যাদুকরী পরিবর্তনের দেখা পেতে পারেন। বিপরীতে, একটি জাতি যখন বিত্ত-বৈভবে বিভোর হয়ে বিলাস-ব্যসনে গা ভাসিয়ে দেয়, এর তরুণ-যুবারা পরিশ্রম-বিমুখ হয়ে পড়ে, শিক্ষা-দীক্ষায় পিছিয়ে পড়ে, তাদের মধ্যে অদক্ষতার পাশাপাশি বিভিন্ন নৈতিক বিচ্যুতিও দেখা দেয়, সমাজে নানাবিধ অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। ফলে, উন্নতি-প্রগতির শিখরে উড্ডয়মান একটি জাতিকে দু-এক প্রজন্মের ব্যবধানেই হয়তো ভূতলে পতিত হতে দেখতে পারেন। এটি স্রেফ তত্ত্বের কচকচানি নয়, পৃথিবীর ইতিহাস এরকম বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী।

তরুণরাই একটি জাতির মূল সম্পদ। এদের মধ্যে থাকে তীব্র অনুসন্ধিৎসা ও অদম্য কর্মস্পৃহা, কিছু একটা করার জন্য সদা অস্থিরতা ও আকুলি-বিকুলি। তাদের এই মনোদৈহিক চাহিদাকে আপনি কিভাবে মেটাবেন, তার উপর নির্ভর করবে তাদের মধ্যে যে প্রতিভা ও কর্মশক্তি নিহিত রয়েছে তা কোন খাতে প্রবাহিত হবে। শৈশব পেরিয়ে যখন কৈশোরে পৌঁছে, তারুণ্যে পদার্পণ করে, চারিদিকে অনেক কিছুই তাদের হাতছানি দেয়, কাছে টেনে নিতে চায়। পরিবার ও শ্রেণীকক্ষের বাইরেও বিশাল এক জগতের সাথে তাদের নিরন্তর মিথস্ক্রিয়া ঘটে। এখানে তাদের যেমন নিত্য-নতুন অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়, অভিজ্ঞতার অভাবে ও এডভেঞ্চারাস এটিচ্যুডের কারণে যে কোন মুহুর্তে ভুল পথে পা বাড়ানোর আশংকাও থেকে যায়।

এ অবস্থায় কিশোর-তরুণদের এই মনোদৈহিক চাহিদার যোগানে এবং বিপথগামী হওয়া থেকে সুরক্ষা দানে প্রয়োজন তাদের বিভিন্ন রকম সৃষ্টিশীল ও গঠনমূলক কর্মকান্ডে ব্যাপৃত করা। এতে করে তারা তাদের সমবয়সীদের পাশাপাশি সিনিয়র-জুনিয়রদের সাথে মেশার সুযোগ পায়, সামষ্টিক পরিসরে কাজ করার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে কাজ করার উপযোগী দক্ষতা ও নেতৃত্ব গুণের বিকাশ ঘটে এবং সর্বোপরি সমাজ-বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কমে যায়। পাড়া-মহল্লায় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন কিশোর-তরুণদের এ ধরণের কর্মকান্ডে ব্যাপৃত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। 

মানব সভ্যতা আজ যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তাতে মূল ভূমিকা রেখেছে বিগত কয়েক শতকে বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার। বিজ্ঞানের কল্যাণে কৃষি ও শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। শত-সহস্র বছর ধরে মানুষ যে সব রোগ-ব্যাধির কাছে অসহায় ছিল, তার অনেকগুলোই আজ মানুষের নিয়ন্ত্রণে। মানুষের বিচরণ আজ কেবল ভূপৃষ্ঠে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্রের তলদেশ কিংবা মহাবিশ্বের অসীম শূন্যতা সবখানেই মানুষ চষে বেড়াচ্ছে। তবে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এ মহাবিস্ফোরণে আমাদের মতো বহু জাতি নিতান্তই দর্শক মাত্র। আমরা চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকি, ওরা কখন কী আবিষ্কার করবে আর আমরা তার এঁটো-জুটো কিছু পাব। বিজ্ঞানের এ যুগে একটি জাতি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে না পারলে তার ভাগ্যাকাশে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা সুদূর পরাহত। যে প্রশ্নটি অনেকের মনে আসবে, জাতি হিসেবে কি আমাদের সামর্থ্যে ঘাটতি রয়েছে? ১৬-১৭ কোটি মানুষের এ বিশাল জনগোষ্ঠীতে মেধার কি এতই আকাল? তা তো হওয়ার কথা নয়। আসলে, প্রয়োজন আমাদের এটিচ্যুডে পরিবর্তন--প্রয়োজন এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা যারা হবে বিজ্ঞান চর্চায় নিবেদিত, আত্মোৎসর্গীকৃত।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান ক্লাবসমূহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান মনস্ক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাব একটি অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশের বৃহত্তম ক্যাম্পাস-ভিত্তিক এই বিজ্ঞান ক্লাবের বর্তমানে তিন শতাধিক সক্রিয় সদস্য রয়েছে। ৪৬ সদস্যের একটি কার্যকরী পরিষদ ক্লাবের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয় সাধন করে। প্রতি মাসে একবার সাধারণ সদস্যগণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকরী পরিষদ সভায় মিলিত হন। তাছাড়া, তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দিয়ে সহায়তা করার জন্য বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদভূক্ত শিক্ষকদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ রয়েছে। পদাধিকার বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য এ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে ক্লাবের একটি কার্যালয় রয়েছে, যেখান  থেকে এর সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। 

২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংগঠনটি বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক নানাবিধ কর্মসূচির মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের বিজ্ঞান চর্চায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যুগিয়ে আসছে। এসব কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ম্যাথ অলিম্পয়াড, সায়েন্স ফেস্টিভ্যাল, সায়েন্টিফিক ওয়ার্কশপ, সায়েন্স ট্যুর, কুইজ কম্পিটিশন, সায়েন্টিফিক টকিং ইত্যাদি। এছাড়া এ ক্লাবের নিউক্লিয়াস নামে একটি নিয়মিত বার্ষিক প্রকাশনা রয়েছে। সমসাময়িক বিজ্ঞানভিত্তিক বিষয়াবলী নিয়ে মাঝে মাঝে অরবিট নামে আরও একটি ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। একদিকে যেমন বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকমন্ডলী এ সংগঠন পরিচালনায় নিয়মিত নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়ে আসছেন,  অন্যদিকে প্রতি বছর ম্যাথ অলিম্পিয়াড ও বিজ্ঞান মেলার মতো অনুষ্ঠানমালার মাধ্যমে স্কুল-কলেজ এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে সংগঠনটি একটি যোগসূত্র স্থাপন করে আসছে। এছাড়াও প্রতি বছর সংগঠনটি এ দেশে বিজ্ঞানে অবদান রাখার জন্য কৃতী ব্যক্তিদের সম্মাননা দিয়ে থাকে। 

এ সব কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে সংগঠনটি জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘরের নিবন্ধন লাভ করে। বর্তমানে ক্লাবটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ১৫৭টি সংগঠনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুদান লাভ করছে। আগামী মাসের ১ম সপ্তাহে প্রতি বছরকার মতো ক্লাবের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে গণিত অলিম্পিয়াড। দেশের অন্যতম শীর্ষ টেকনোলজি ফার্ম নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর লিমিটেড অনলাইনে অলিম্পিয়াডের পরীক্ষা পরিচালনা এবং এজন্যে প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আশা করা হচ্ছে, এবারও স্কুল-কলেজের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী ম্যাথ অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করবে।

এ দেশে বিজ্ঞান চর্চায় তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহিত করতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাব যে পথ দেখাচ্ছে, সেটা অনুসরণীয়। তবে, সময়ের নিরিখে এ কার্যক্রম কিভাবে আরও আধুনিকায়ন করা যায় তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান ক্লাবসমূহকে নিয়ে একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে বিজ্ঞান চর্চায় তরুণদের উৎসাহিত করার এ কার্যক্রম আরও জোরদার করা যায় কিনা তা বিবেচনা করা যেতে পারে। তাছাড়া বহির্বিশ্বের খ্যাতনামা বিজ্ঞান ক্লাব সমূহের সাথেও যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা যেতে পারে। এভাবে, আগামী দিনগুলোতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাবের কর্মকাণ্ড আরও বেগবান হবে এ প্রত্যাশা রইল।


ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন, অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, জাবি ও উপদেষ্টা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাব

(নিবন্ধটি রচনায় বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান ক্লাবের বর্তমান সভাপতি তারেক আজিজ আমাকে সহযোগিতা করেন।)



50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail