• শনিবার, এপ্রিল ১৭, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৩১ রাত

ছেলেকে রান্না শেখালে, ওর বউ কী করবে?

  • প্রকাশিত ০৫:০০ সন্ধ্যা মার্চ ২৯, ২০২১
শিশু

শারীরিক গঠনের জন্য নারী ও পুরুষের আলাদা ভূমিকা আছে কিন্তু এই আলাদা হবার কারণে তারা কেউ মানুষ হিসেবে কম বা বেশি নয়। নারী-পুরুষ একই সমান

আমার চার বছর বয়সী ছেলে রান্না করতে খুব পছন্দ করে। আমি বা আমার স্বামী যখন রান্নাঘরে থাকি তখন সে নানারকম মজার মজার প্রশ্ন করে আমাদের ব্যস্ত করে তোলে। মশালাগুলোর নাম থেকে ওর প্রশ্ন শুরু হয়। তারপর চায়ে লবণ দিলে কেমন হবে বা দোকান থেকে কেনা ডিমের ওপর আমরা বসে থাকলে বাচ্চা ফুটবে কিনা এমন অদ্ভুত প্রশ্নও করতে থাকে।

কখনও কখনও আমরা ওকে ডালে লবণ ছড়িয়ে দিতে বলি বা ওর ছোট্ট ছোট্ট দু' আঙুলের মাঝে টিপ দিয়ে ভাত ফুটেছে কিনা দেখে দিতে বলি। যদিও ও নানারকম জিনিসপত্র একসাথে মিশিয়ে কিছু একটা তৈরি করতে বেশি পছন্দ করে।

রান্না করার সময়টা আমাদের তিনজনের একসাথে কাটানো সব থেকে প্রিয় মুহূর্ত। মজাদার সব গল্পের মধ্যে দিয়ে শুধু যে আমাদের বন্ধনই গভীর হচ্ছে তা কিন্তু নয়, আমাদের ছোট্ট ছেলেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি জীবন-দক্ষতাও শেখাতে পারছি। রান্না করা শেখানোর থেকে দারুণ সুযোগ আর কি হতে পারে? 

একবার আমার এক শুভাকাঙ্ক্ষী আমাদের রান্নার এই সুন্দর মুহূর্তটি দেখে ফেলেছিল। তারপর তিনি সরাসরি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোমার ছেলে রান্না শিখে ফেললে ওর বউ কী করবে?

সেই ছদ্মবেশী শুভাকাঙ্ক্ষীর উদ্দেশে বলছি, "যদি কখনও সেই দিনটি আমার ছেলের জীবনে আসে তবে আমি দোয়া করি আর বিশ্বাস করি আমার ছেলের বউ অবশ্যই ওর এই প্রচেষ্টা আর রান্নার দক্ষতার প্রশংসা করবে।"

একটি তিক্ত শ্রুতিকথা

উপরের এই ধরনের প্রশ্নগুলো কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই সাধারণ ঘটনা। আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, কীভাবে আমরা ছোট বাচ্চাদের সাথে কথা বলার সময় প্রায়ই "বিয়ের পর কী করবে" ধরনের প্রশ্ন ছুড়ে দেই?

আমি খেয়াল করেছি ছোট্ট জেদি মেয়েদের অনেকেই বিজ্ঞের মতো বলেন,  "বিয়ের পর আর এমন বদমেজাজ দেখাতে পারবি না" অথবা, সারা ঘর অপরিষ্কার করে ফেলা ছোট্ট মেয়েটাকে বলেন, "এই রকম অগোছালো স্বভাব নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যেয়ে কীভাবে থাকবি?"

এসব কথা থেকে কিন্তু ছেলেরাও রেহাই পায় না। নরম স্বভাবের ছোট ছেলেদের অনেকেই বলেন, "তোকে তো তোর বৌ শাড়ির আঁচলে পেচিয়ে ঘুরবে"। আবার ঘরের কোনো কাজে টুকটাক সাহায্য করলে সেই ছেলেটাকে শুনতে হয়, "কিরে 'ঘরজামাই' হবার ইচ্ছা হলো নাকি"।বিয়ের প্রত্যেক ব্যক্তিরই হয়ত চূড়ান্ত লক্ষ্য। কিন্তু এ ধরনের ঘটনার জন্য বিয়ে দায়ী নয়। দায়ী আমাদের সমাজ। বাংলাদেশে বিবাহ কাঠামোর পরিবর্তন ঘটলেও সমাজে নারী-পুরুষের ভূমিকা তথা জেন্ডার রোল এখনও আগের মতই রয়ে গেছে।

আমাদের সমাজে লিঙ্গভেদে লক্ষ্য করে ছোড়া মন্তব্য বা প্রশ্নের ধরনের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অল্প বয়সী মেয়েদের বেলায় প্রশ্নগুলো হয় "সম্মতি সম্পর্কিত" আর ছেলেদের ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো হয় "ক্ষমতা সম্পর্কিত"।আমরা মেয়েদের ঘর গোছানো, নৈতিকতা মেনে চলা, মানিয়ে চলা, মেনে নেওয়া, আপস করা আর ক্ষমা করতে পারা শেখাই যা তাকে একজন আদর্শ বাংলাদেশি গৃহবধূ হতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে ছেলেদের শেখানো হয় আত্মবিশ্বাস আর দৃঢ়তা। 

আমরা আমাদের ছেলেদের শেখাই তাদের জীবন মূলত ঘরের বাইরে। ঘর শুধুমাত্র খাওয়া, ঘুম আর এগুলোর বিল পরিশোধের জায়গা। আমরাই তাদের শিখিয়েছি বাড়ি হচ্ছে তাদের ময়লা কাপড় অন্য কেউ ধুয়ে দেবার লন্ড্রি, তাদের জন্য গরম গরম খাবার পরিবেশনের রেস্তোরাঁ। যা একসময় হয়ত তাদের মায়েরা করে দিত, পরবর্তীতে তাদের স্ত্রীরা এসে করবে।এই ধারণা এতটাই বদ্ধমূল হয়ে দাঁড়িয়েছে যে একে এখন পারিবারিক কাঠামোর মৌলিক আদর্শে ভাবা হয়। এবং এর ফলে বিদ্রূপজনকভাবে নারীরাই অপরাধী হচ্ছেন। 

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অধিকাংশ নাটকের বউ-শাশুড়ি দ্বন্দ্ব শতভাগ বাস্তব জীবন থেকে নেওয়া হয়েছে। পুরুষদের প্রাথমিক যত্নদাতার স্থান যেহেতু নারীদের, তাই কে তাকে সবচেয়ে ভালোভাবে সেবা করতে পারবেন তা প্রমাণের দীর্ঘ লড়াইয়ে নেমে পড়েন স্ত্রী ও মায়েরা। আর যদি ভুলেও কোনো পুরুষ গৃহস্থালির কাজ সম্পাদন করতে যান, তখন আশেপাশের সবাই সর্বসম্মতিক্রমে ঘোষণা করেন, "ছেলেরা এইগুলো পারে না”, কিংবা "ছেলেরা জানেনা কীভাবে ঘরের কাজ করতে হয়"।

তাই যদি হয় তাহলে মেয়েরা কি মায়ের পেট থেকে ঘরের কাজকর্ম শিখে আসে? অবশ্য বলে লাভ কী? আমাদের দেশে তো ছেলের ঘরের কোনো কাজ করাকে "কী কিউট!" হিসেবে গণ্য করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো ছেলে নিজের চা নিজেই বানিয়ে নেয়, কোথাও যাবার আগে নিজের ব্যাগ একাই প্যাকিং করে ফেলে কিংবা কোনো বাবা তার ছোট সন্তানকে একাই গোসল করিয়ে দেয় এগুলোকে আমাদের সমাজ "বিশাল বড় কিছু করে ফেলেছে" হিসেবে দেখে।

ভয়াবহ পরিণতি

সমাজে নারী-পুরুষ ভূমিকার এই ধারণাটি এখন আর আধুনিক পারিবারিক কাঠামোর জন্য পরিপূরক নয়। আজকাল, কর্মসংস্থানের সুযোগ বা আর্থিক স্বচ্ছলতা পরিবারগুলোকে ভেঙে ছোট হয়ে উঠতে উৎসাহী করছে। 

প্রায়শই, দেখা যায় স্বামী-স্ত্রী উভয়ই বাইরে কাজ করেন এবং দুজনেই পারিবারের উপার্জনে অবদান রাখেন,  তারপরও কেবলমাত্র স্ত্রীর উপরেই ঘরের কাজের চাপ পড়ে যায়। বাংলাদেশের প্রতিটি নারীকেই একটি অবান্তর এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয় যে কোনো চাকরির ইন্টারভিউয়ে আর তা হল "আপনার কি বাচ্চা আছে? ঘরের কাজ সামলে অফিসে মনোযোগ দিতে পারবেন তো?" ফলস্বরূপ, প্রচুর সংখ্য নারী যারা কাজ করতে পছন্দ করেন তারা অতিমানব (এবং অস্বাস্থ্যকর) রূপ ধারণ করে ঘর এবং অফিস সামলানোর দীর্ঘ চেষ্টা করে যান। সারাদিন অফিসে কাজ করে ঘরে এসে রান্না করা, পরিবারের সবার মনোরঞ্জন করার কাজ করে যান।

নিজেদের সুবিধার জন্য আমরা ভুলে যাই যে সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টার কর্মসময় এ জন্যই প্রস্তুত করা হয়েছিল যেন একজন অফিস করলে তার পরিবর্তে অন্য (অবশ্যই নারী) কেউ ঘরের কাজ করতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজ পুরুষকে সকল ঘরের কাজ থেকে মুক্ত করে সেই ভারটিও নারীর উপরেই দ্বিগুণ মাত্রায় চাপিয়ে দিয়েছে।

পুরাতন নিয়মগুলো একসময় কাজ করেছিল। কারণ, তখন সময়ের প্রয়োজন তেমন ছিল। তবে আজকের বিশ্বের সাথে এসব নিয়ম সমন্বয়হীন। বাংলাদেশি পুরুষদের বলপূর্বক নির্ভরশীলতা এবং বাংলাদেশি নারীদের পরাধীনতার কেন্দ্রবিন্দুতে এই তত্ত্বটিই এখনও রয়ে গেছে যে পুরুষরা "প্রাথমিক উপার্জনকারী" এবং তাই তারা উচ্চতর। এই তত্ত্বটি এখনও আর না খাটলেও আমাদের সমাজ আর আমরা সেখানেই আছি।

এই সমাজে আমরা পুরুষদের উপাসনা করি, যেন তারা একরকম উচ্চতর প্রাণী। তবে একই সাথে তাদের প্রাথমিক জীবন-দক্ষতা শেখাতে অস্বীকার করি যা তাদের জীবনকে আরও সহজ করে তুলতে পারে। অনেক বাংলাদেশি পরিবারেই পুরুষরা খাবারের চামচটিকেও নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে জানে না। কারণ, এই কাজগুলোকে নিম্নমানের মনে করা হয়। 

অনেক পরিবারেই বাবাদের প্রতি ভীতি ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের নাম করে তাদেরকে পিতৃত্ব ও এ ধরনের মধুর সম্পর্কগুলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। এই বিকৃত শ্রদ্ধা পুরুষদের কোনও উপকার তো করেই না বরং ক্রমাগত তাদেরকে পুরুষতন্ত্রের পুরানো ধারণাগুলো পরিপক্ক করতে বাধ্য করে।

নারীদের বেলায় যেমন "পারিবারিক দায়িত্ব পালন করবেন এবং তাদের ক্যারিয়ারকে সালাম জানিয়ে বিদায় দেবেন" এমন প্রত্যাশা করা হচ্ছে, পুরুষদের বেলায়ও তেমন "অনুভূতিহীন, অর্থ-উপার্জনকারী মেশিন" হয়ে ওঠার আশা করা হয়। যারা পরিবারে পরবর্তী পিতৃপুরুষের ভূমিকা গ্রহণ করবে।

আমাদের সমাজের অনেক পুরুষই স্ত্রীদের সাথে সমান অংশীদারিত্ব গঠন করতে অসুবিধায় পড়েন কারণ তারা নিজেদের "প্রভু এবং সরবরাহকারী" ট্যাগটি সরিয়ে রাখতে পারেন না। পুরুষদের মানসিক চাহিদাকেও হয় উপহাস, নয় উপেক্ষা করা হয়। তাদের একটি আবেগকেই আমরা প্রশংসা করি আর তা হলো রাগ।

পুরুষরা যখন যৌন নির্যাতিত হয় তখন আমরা তাদের দেখে হাসি। এমন কী তাদের প্রতি কোনো সহানুভূতিও প্রদর্শন করি না। বরং আমরা "পুরুষরা বিকৃত যৌনতা উপভোগ করে" এই চরম নিষ্ঠুর এবং তিক্ত প্রবাদটা বলে নির্যাতিতদের মানসিক কষ্টকে লুকানোর চেষ্টা করি।

পুরুষরা যখন ঘরের কাজ ও দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহ দেখায় আমরা তখন তাদের লজ্জা দেই। আমার প্রশ্ন যখন আমরাই আমাদের মানবিকতা বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছি তখন শুধুমাত্র পুরুষদের উন্নত করে কী লাভ?

পরিবর্তন প্রয়োজন

আসুন সত্যের মুখোমুখি হই। নারীর সাথেও ঠিক তেমই আচরণ করা উচিত যেমনটা পুরুষের সাথে করা হচ্ছে। পুরানো নিয়মগুলো এখন আর কাজ করছে না। 

এমন এক বিশ্বে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য এবং জীবনমানের উপর এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা আরও বেশি সচেতন হয়ে উঠছি, পুরুষদের অদম্য বলে ঘোষণা করা লজ্জাজনক। পরিবর্তনটি অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে ধীর। তবে আধুনিক তরুণেরা ঘরের সাথে আরও জড়িত হওয়ার জন্য পুরোনো চক্রটি ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছেন।

আপনি যদি চারপাশে তাকান, দেখবেন  তরূণ বাবা তাদের বাচ্চাদের জন্য সময় বের করছে। পুত্র এবং স্বামীরা পরিবারের দায়িত্বগুলো পালন করার চেষ্টা করছেন এবং তাদের মা এবং স্ত্রীদের পাশে এগিয়ে এসেছেন।

আসুন এই পুরুষদের প্রশংসা করি, তাদের উৎসাহিত করি এবং তাদের পুরানো গল্পগাঁথাগুলো বদলানোর এই চেষ্টার প্রসংশা করি। শারীরিক গঠনের জন্য নারী ও পুরুষের আলাদা ভূমিকা আছে। অবশ্যই নারী ও পুরুষ একে অন্যের থেকে আলাদা। কিন্তু এই আলাদা হবার কারণে তারা কেউ মানুষ হিসেবে কম বা বেশি নয়। নারী-পুরুষ একই সমান।


সামিরাহ নাসরিন আহসান পেশায় একজন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। তবে লেখক হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকেই লেখালেখি শুরু করেন তিনি। তার লেখা আরও বিস্তারিত পড়তে চাইলে অনুসরণ করতে পারেন ইনস্টাগ্রামে @booksnher



50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail