• রবিবার, মে ০৯, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৪ সকাল

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে কর বৃদ্ধির বিকল্প নেই

  • প্রকাশিত ০৪:১৭ বিকেল এপ্রিল ২৫, ২০২১
সিগারেট
প্রতীকী ছবি সৈয়দ জাকির হোসাইন/ঢাকা ট্রিবিউন

সিগারেটের ৪ মূল্যস্তর ব্যবস্থা বাতিল করে ২ স্তরে আনতে হবে। শুধু তাই নয়, এর সবকিছুর সাথে সাথে তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা তামাকের ব্যবহার হ্রাসের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াবে

জাতি হিসেবে বাংলাদেশ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভ্যস্ত। করোনাকালে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঠিক নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় করোনাকালেও দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ চলমান রাখতে পেরেছি। সংক্রামক রোগের পাশাপাশি আমাদের কিছু নতুন চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে তামাক নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্য। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, শ্বাসরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক ও কিডনিরোগের মতো মরণব্যাধির মূল কারণ তামাক। দেশের ৬৭% অসংক্রামক রোগের জন্য দায়ী তামাক। শুধুমাত্র ২০১৮ সালেই তামাকের কারণে দেশে মৃত্যুবরণ করেছেন ১ লাখ ৬১ মানুষ (টোব্যাকো এটলাস, ২০২০) । এতে করে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতি; দুই ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। সেই ঘোষণা বাস্তবায়নে ৫২ জন সংসদ সদস্য তামাকপণ্যের উপর সুনির্দিষ্ট কর বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি তামাক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকরী পথ তামাকপণ্যে বড় ধরনের কর বৃদ্ধি করা। ২০২১-২২ জাতীয় অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবনা আসন্ন। সেই বাজেটে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে। তামাকপণ্যে যুক্তিযুক্ত কর বৃদ্ধি করতে হবে। 

বাংলাদেশে ১৫ বছর বা তদুর্ধ্ব বয়সী, ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাকজাত পণ্য ব্যবহার করে। যা এই বয়সী মোট জনসংখ্যার ৩৫.৩%। পুরুষদের মাঝে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেশি। অন্যদিকে, প্রায় সোয়া দুই কোটি মানুষ ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্য (জর্দা, গুল) ব্যবহার করে; যার মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ পুরুষের চেয়ে ৮.৬% বেশি। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণা, “তামাকজনিত ব্যাধি ও অকাল মৃত্যুর কারণে ক্রমবর্ধমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে বাংলাদেশ:” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মুহূর্তে দেশে ৩০ বা তদুর্ধ্ব বয়সী ৭০ লাখের অধিক লোক তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত।

এ দেশে তামাকের কর ও রাজস্ব ইস্যুতে প্রচলিত কিছু ভুল জনশ্রুতি রয়েছে। তামাক হতে প্রতি বছর গড়ে সরকার রাজস্ব আয় করে ২২ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। তামাকপণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বারবার এই বিষয়টিকে মুখ্য করে এক ধরণের অলিখিত “প্রশ্রয়” চেয়ে থাকে। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তামাকপণ্য ব্যবহারের কারণে চিকিৎসাব্যয় ও উৎপাদনশীলতা হারানো বাবদ সরকারের ক্ষতি হয় ৩০ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। যা রাজস্ব আয়ের চেয়ে অনেক বেশি। তামাক কোম্পানিগুলো সরকারকে দুই ধরনের কর (প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ) তিনভাবে দিয়ে থাকে। কোম্পানির নিজস্ব আয় থেকে (প্রত্যক্ষ কর), আমদানি/রপ্তানি পর্যায়ে কাস্টম ডিউটি (পরোক্ষ) এবং ভোক্তার কাছ থেকে তাকামপণ্য ব্যবহারের উপর (পরোক্ষ)। 

ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক (পরোক্ষ কর) ভোক্তা পরিশোধ করেন। কোম্পানি কেবল সংগ্রহকারীর দায়িত্ব পালন করে। কাস্টম ডিউটি যেহেতু একধরনের পরোক্ষ কর, তাই এই করের বোঝাও পড়ে ভোক্তার উপরেই। বৃটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর (বিএটিবি) ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৯ সালে তারা কর বাবদ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে ২২ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রত্যক্ষ কর; অর্থাৎ যেটা বিএটিবি’র পকেট থেকে এসেছে তার পরিমাণ মাত্র ১০৮২ টাকা। অর্থাৎ, কোম্পানি নয়; ভোক্তাই তামাকের কর দিয়ে থাকে। তাই তামাক কোম্পানিগুলো বেশি কর দেয়; এই ভাবনাটা একেবারেই অমূলক। যেহেতু বাংলাদেশের বর্তমান তামাক কর কাঠামো অনেকটাই জটিল; তামাক সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেই সুযোগটিই নিয়ে থাকে।  

২০২১-২২ জাতীয় বাজেটে আমরা তামাকপণ্যের কর বৃদ্ধির কথা বলছি। সেই করের পরিধি কেমন হওয়া উচিত? সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ ৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মিলিতভাবে এ বিষয়ক একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে। আমরা জাতীয় বাজেটে এর প্রতিফলন চাই। সিগারেট ও বিড়িসহ সকল প্রকার তামাকপণ্যের খুচরা মূল্যের উপর ১৫% মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখা প্রয়োজন। বাজেটে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের নিম্ন স্তরে খুচরা মূল্য ৫০ টাকা নির্ধারণ করে ৩২.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ করতে হবে; মধ্যম স্তরে খুচরা মূল্য ৭০ টাকা নির্ধারণ করে ৪৫.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ করতে হবে; উচ্চ স্তরে খুচরা মূল্য ১১০ টাকা নির্ধারণ করে ৭১.৫০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক এবং প্রিমিয়াম স্তরে ১৪০ টাকা খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে ৯১ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্ক আরোপ করতে হবে। এর ফলে সকল মূল্যস্তরে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬৫%। বিড়ির ক্ষেত্রে, ফিল্টারবিহীন ২৫ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১১.২৫ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ করতে হবে;  ফিল্টারযুক্ত ২০ শলাকা বিড়ির খুচরা মূল্য ২০ টাকা নির্ধারণ করে ৯.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ করতে হবে। ফলে উভয় ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৪৫%। জর্দা বা গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যে সবচেয়ে কম করারোপ করা হয়। আসন্ন বাজেটে প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার খুচরা মূল্য ৪৫ টাকা নির্ধারণ করে ২৭.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ; প্রতি ১০ গ্রাম গুলের খুচরা মূল্য ২৫ টাকা নির্ধারণ করে ১৫.০০ টাকা সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কারোপ করতে হবে।  এতে করে উভয়ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের হার হবে চূড়ান্ত খুচরা মূল্যের ৬০%।

এই সব সুপারিশগুলো কার্যকর হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পথে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাবো। সিগারেটের ব্যবহার ১৫.১% থেকে হ্রাস পেয়ে ১৪.১% নেমে আসবে। প্রায় ১১ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত হবে এবং ৮ লক্ষাধিক তরুণ ধূমপান শুরু করতে নিরুৎসাহিত হবে। দীর্ঘমেয়াদে ৩ লাখ ৯০ হাজার বর্তমান ধূমপায়ী এবং ৪ লাখ তরুণের অকাল মৃত্যু রোধ সম্ভব হবে। বিগত অর্থবছরের চেয়ে সম্পূরক শুল্ক, স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ এবং ভ্যাট বাবদ ৩ হাজার ৪০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আয় অর্জিত হবে, অর্থাৎ প্রথম বছরে সিগারেট খাত থেকে ১২% বাড়তি রাজস্ব আয় হবে। 

বাংলাদেশের বাজারে সিগারেট অত্যন্ত সস্তা ও সহজলভ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের তথ্যমতে, বিশ্বের ১৫৭টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম মূল্যের সিগারেট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১০২তম। প্রতি অর্থবছরে সিগারেটের উপর করারোপ করা হলে তাতে মূলত দামের পরিবর্তন আসে ব্র্যান্ডের সিগারেটের উপর। কমদামি সিগারেটের মূল্যে খুব একটা হেরফের হয় না। তাই সিগারেটের ৪ মূল্যস্তর ব্যবস্থা বাতিল করে ২ স্তরে আনতে হবে। শুধু তাই নয়, এর সবকিছুর সাথে সাথে তামাক কর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা তামাকের ব্যবহার হ্রাসের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়াবে। 

সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত তামাকমুক্ত বাংলাদেশ বাস্তবায়ন জরুরি। আর এই লক্ষ্য অর্জনে তামাকের উপর বর্তমান শুল্ক-কাঠামো সহজ করে একটি শক্তিশালী তামাক শুল্ক-নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি। 


অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবে মিল্লাত, এমপি; প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ফাউন্ডেশন 


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না

51
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail