• রবিবার, মে ০৯, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৩১ রাত

ধর্ষণ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে না

  • প্রকাশিত ১১:৩২ রাত এপ্রিল ২৯, ২০২১
ধর্ষণ-মৃত্যু
চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজধানীতে “ও” লেভেলের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি ছাত্র সংগঠনের প্রতিবাদ। মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

শুধু সচেতন হলে চলবে না, ধর্ষকের সুষ্ঠ বিচার হতে হবে, ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে হবে, সন্তানদের শিশুকাল থেকে ধর্ষণকে ঘৃণা করা শেখাতে হবে এবং পারিবার ও সমাজ ধর্ষককে বয়কট করবে এমন চর্চা গড়ে তুলতে হবে

আফসানা মীম (ছদ্মনাম, বয়স ১৬) তার নিজ বাড়িতে প্রতিবেশী ৪৩ বছর বয়স্ক এক পুরুষের মাধ্যমে ধর্ষিত হন। ঐ সময় মীমের বাড়িতে কেউ ছিল না। মীম বলেন, “আমি যার মাধ্যমে ধর্ষিত হয়েছি তার কথা শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। কেননা তার বাহ্যিক আচরণ অনেক ভাল, তিনি ক্ষমতাবান এবং আমাদের পরিবারের সাথে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই বিষয়টি আমি পরিবারের কাউকে জানাতে পারিনি এবং আমি এও জানি আমি কোনো সুষ্ঠ বিচার পাব না। বরং ঐ লোক আমাকে বলেছে, তুমি ভয় পেয় না। আমি অনেক সাবধান ছিলাম। তাই তোমার গর্ভবতী হওয়ার সুযোগ নেই।” 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের না বলা কথা বহু রয়েছে। উচ্চবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজে এ ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণত প্রকাশ পায় না। তাই এদেশে দিনে কতগুলো ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তারা বলছেন, সাধারণত ধর্ষকদের সুষ্ঠভাবে বিচার হয় না বা তারা জবাবদিহিমূলক শাস্তি পায় না বলে এ ধরনের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। 

বেসরকারি সংস্থা “অধিকার” এর একটি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০১-২০১৯ পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৪,৭১৮ জন। এর মধ্যে ৬৯০০ জন নারী এবং ৭৬৬৪ জন শিশু। ১৫৪ জনের বয়স নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৮২৩ জন। ধর্ষণের পর খুন ১৫০৯ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ১৬১ জন।

এ রকম পরিস্থিতিতে সকলেই জানতে চায়, কারা এই কুৎসিত পথের পথিক? অর্থাৎ প্রশ্ন হচ্ছে কারা ধর্ষক? গত ১৮ নভেম্বর ২০২০-এ প্রকাশিত “দৈনিক প্রথম আলো” সংবাদপত্র গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলো বিশ্লেষণ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখান থেকে জানা যায়, “অভিযুক্তদের বেশির ভাগই ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগীর পরিচিত, প্রতিবেশি, আত্মীয়, প্রেমিক ও স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক। অপরিচিত ব্যক্তিদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৮ জন। মুদি দোকানি, সেলুনের কর্মী, ইজিবাইক চালক, বাসচালক, চালকের সহকারি, রিকশা চালক, কবিরাজ, সবজি বিক্রেতা, ফায়ার স্টেশনকর্মী, পুলিশ সদস্য, বিজিবি সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্যকর্মী, সরকারদলীয় নেতা ও কিশোরদের দ্বারা ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।” 

সারা দেশে ধর্ষণের ঘটনা ব্যাপকহারে বেড়ে যাওয়ায় জনগণের দাবির চাপে সরকার সম্প্রতি “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন” সংশোধন করে। যা ১৩ অক্টোবর ২০২০ থেকে কার্যকর হয়। প্রথম আলোর ঐ একই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, “১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে ১৩ অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত ১১৬ জন এবং ১৪ অক্টোবর থেকে ১৩ নভেম্বর ১৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে একক ঘটনা ঘটেছে ১৪০টি এবং দলবদ্ধ ঘটনা ঘটেছে ৪৩টি।” 

এ থেকেই বোঝা যায়, আইন সংশোধনের পর গত এক মাসে ধর্ষণের ঘটনার পরিমাণ আরো বেড়েছে। পহেলা নভেম্বর ২০২০ তারিখে বিডি নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, “শুধু নোয়াখালীতে গত অক্টোবর  মাসে ১৯টি (গণমাধ্যমে প্রকাশিত) ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।”

সংশোধিত এ আইনে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। এরপরও কেন ধর্ষণ কমছে না? তাহলে কি আইন বা প্রশাসনের মাঝে কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম রয়েছে? মামলাগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে জটিলতাগুলো কেমন এবং এতে আইন কতটা কার্যকর বা প্রয়োগ হচ্ছে বিষয়গুলো জানতে চাইলে “জাতীয় মহিলা আইনজীবি সমিতি”র সভাপতি অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, “যারা ধর্ষণের শিকার বা মুখোমুখি হন তারা যখন মামলা করেন তাদেরকে কেন্দ্র করে থানার যে ধরণের বৈরিভাব, কোর্টের যে ধরনের প্রসিডিউর বা “কোর্টরুম ড্রামা” হয়, কিংবা থানার যে রকম পরিবেশ থাকা দরকার সে রকম পরিবেশ অনুস্থিত, এমনকি কোর্টের স্বল্পতা এবং মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি কারণে অনেক সময় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিরা মামলা চালাতে পারে না বা মামলা তুলে নেয়। এমনকি তারা ধর্ষকের সাথে আপোষ করে। বলা যায় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিদের জন্য আমাদের পুরো পরিবেশ নারীবান্ধব নয় বা তাদের যে ধরনের সহায়তা দরকার তারা তা পায় না। ফলে বেশিরভাগ মামলা খারিজ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, প্রতিপক্ষরা ক্ষমতাবান হওয়ায় সাধারণত প্রশাসনও ধর্ষকের পক্ষে থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “মামলাগুলোতে জয়লাভ করতে হলে ধর্ষণের মুখোমুখি হওয়া নারীদের প্রতিরোধ বলয় থাকতে হবে। তাদেরকে সাহসের সাথে মামলা চালাতে হবে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে কাজ করে যে সব প্রতিষ্ঠান তাদেরকে সাথে রাখতে হবে। মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ভিকটিমের চাপ থাকতে হবে এবং তাকে লেগে থাকতে হবে। যত বাধা আসুক না কেনো মামলা গতিশীল রাখলে এবং জোরালো প্রতিরোধ বলয় থাকলে প্রতিপক্ষ জয়ী হতে পারবে না।” 

তাহলে কি বলা যায়, দেশে প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের জবাবদিহিতার জায়গা নেই? নাকি সামাজিক অবক্ষয় অর্থাৎ আমাদের পারিবারিক শিক্ষা ও নৈতিকতার অভাব এবং পাশবিক চর্চা এজন্য দায়ী?  

এর সবগুলোই হয়তো ঠিক জানালেন “নিজেরা করি”র সমন্বয়কারী এবং সমাজকর্মী খুশী কবির। তিনি বলেন, “এটা বন্ধ করতে দলমত নির্বিশেষে আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা উচিত। এক্ষেত্রে আমাদের শুধু সচেতন হলেই চলবে না কিছু করণীয় রয়েছে। সবচেয়ে জরুরি পরিবার এবং সমাজের সচেতনতা। অবশ্যই সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে থানা পর্যায় পর্যন্ত সরকারের যে কর্মকর্তা-কর্মচারি রয়েছেন তাদেরকে এ বিষয়ে অনেক দায়িত্বশীল হতে হবে। কিছুদিন আগে একটি মেয়েকে তার পরিবার ধর্ষকের সাথে বিয়ে দিচ্ছিল। যা ভীষণভাবে নেতিবাচক। মেয়েটি ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে। খবর পেয়ে সেখানকার ম্যাজিজট্রেট এবং সাংবাদিক সেখানে গিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে। এভাবে সরকারি কর্মকর্তারা এগিয়ে আসলে অনেক ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। মেয়েদের আরও সাহসী হতে হবে। পুরুষদের জানাতে হবে, এটা একটা অপরাধ।” 

তিনি আরও বলেন, “ভারতে দেখলাম কিছু কোম্পানি ছোট ছোট বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বলছে, এটা করা ঠিক নয়। এভাবে একটা বিষয়ে বারবার ম্যাসেজ দিলে সমাজে একটা পরিবর্তন আশা করা যায়। যেমন আগে আমাদের টিকা দেয়া, হাত ধোয়া, স্যালাইন খাওয়া ইত্যাদি বিষয়ে অনীহা ছিল। কিন্তু এ ধরনের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আমাদের সমাজে পরিবর্তন এসেছে। আমাদের প্রতিষ্ঠানে আমরাও একটা কর্মসূচি শুরু করেছি তরুনদের মাঝে যে, এটা করা ঠিক নয়। পাঠ্যসূচিতে এটা আনতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। মূলকথা সমাজের সব জায়গায় জানাতে হবে এটা খুব খারাপ কাজ।”    

সরকার ধর্ষণ বন্ধে নানাভাবে কাজ করছে বলে জানান মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ড. আবুল হোসেন। তিনি সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটের অবাধ ব্যবহারকে দায়ী করে ধর্ষণ বন্ধে শিশুকিশোরদের ভালোভাবে গড়ে তোলার বিষয়টিকে জোর দেন এবং ধর্ষণ বন্ধে চার ধরনের করণীয় বিষয়ের কথা বলেন। ১.পরিবারের বয়েজ্যেষ্ঠদের শিশু-কিশোরদের নজরদারিতে রাখতে হবে এবং পারিবারিকভাবে তাদেরকে মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। ২. স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও তাদের নৈতিকতা গঠনে সাহায্য করতে হবে।  যেমন, শিক্ষকরা যদি তাদেরকে বলেন খারাপ কাজ করোনা, অন্যের ক্ষতি করো না, কখনো ধর্ষক হইওনা ইত্যাদি তাহলেও ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যাবে। কেন না শিশুকিশোররা শিক্ষকদের কথা শোনে ও মেনে চলার চেষ্টা করে। ৩. স্থানীয় সরকার প্রসাশন- এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের সদস্য, স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার রয়েছেন। তারা এলাকার বিভিন্ন খবরাখবর রাখেন। তারা যাদেরকে এ রকম সন্দেহজনক মনে করবেন তাদের বিষয়ে খোঁজখবর রাখা বা তাদেরকে যদি সচেতন করেন তাহলেও ভালো ফল আশা করা যায়। ৪. এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটিস বাড়াতে হবে। এগুলো এখন অনেক কমে গিয়েছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, খেলাধূলা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাগুলোর মাধ্যমে শিশুকিশোররা নিজেদের ব্যস্ত রাখতে পারে এবং একইসাথে পারস্পারিক সহযোগিতা, সহনশীলতা, ধৈর্য্য ইত্যাদি আচরণ করতে শেখে।”  

শুধু সচেতন হলে চলবে না, ধর্ষকের সুষ্ঠ বিচার হতে হবে, ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে হবে এবং আমাদের অতীত ইতিহাস-ঐতিহ্য স্মরণ করে দিয়ে পাঠ্যপুস্তকে এ বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক পাঠ্যসূচি ও প্রয়োজনীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। সন্তানদের শিশুকাল থেকে ধর্ষণকে ঘৃণা করা শেখাতে হবে এবং পারিবার ও সমাজ ধর্ষককে বয়কট করবে এমন চর্চা গড়ে তুলতে হবে বলছেন সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্টজন। 

এর সাথে খুশী কবির আরও যোগ করেন, “কেনো মামলাগুলো ভালোভাবে পরিচালিত হয় না বা পরিচালনায় বাধা কোথায়, নারী কেনো বিচার পায় না ইত্যাদি বিষয়গুলো জানতে হবে এবং বাস্তবতার নিরিখে এ সবের সমাধান বের করতে হবে। তাহলে ধর্ষণ বন্ধে আমরা কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না

51
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail