• সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১১:৫৩ রাত

শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা প্রয়োজন

  • প্রকাশিত ০৪:০৪ বিকেল আগস্ট ১২, ২০২১
পোশাক শ্রমিক-নারী শ্রমিক
ফাইল ছবি। মাহমুদ হোসেন অপু/ঢাকা ট্রিবিউন

দেশে যখন কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়, তখন শ্রমিকদের তাদের যৎসামান্য সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না

পোশাক শিল্পের ওপর করোনা অতিমারি অভূতপূর্ব নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল, কোনো সন্দেহ নেই। আশার কথা শিল্প সেই ধাক্কা অনেকটা সামলে নিয়ে অনেকটা পূর্বের ধারায় ফিরে আসছে। বিগত ১৮ মাস ধরে আমাদের আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল শিল্পের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কথা। কিন্তু যে লোকগুলো আমাদের পোশাক উৎপাদন করে তাদের ব্যপারে আমরা কতটা চিন্তা করেছি? বা তাদের অবস্থার কি পরিবর্তন সাধিত হয়েছে? 

করোনাভাইরাস অতিমারিতে পোশাক শ্রমিকরা সর্বাগ্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। আশঙ্কার বিষয় হলো, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারিনি। যার ফলে ভবিষ্যতেও কোনো প্রকার অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিলে তার ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের পোশাক শ্রমিকদের ভোগ করতে হতে পারে। যদি না তাদের স্বার্থ রক্ষায় মৌলিক পরিবর্তন আননয়ন এবং বিধান তৈরি করা না হয়। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনার ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। অন্যন্য দেশের মতো আমাদের দেশে বিশেষ কারণে কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিকদের সরকার কর্তৃক ভাতা প্রদান, বড় অঙ্কের এককালীন অর্থ প্রদান অথবা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সুরক্ষা বলয়ের অংশ হিসাবে শ্রমিকদের সহায়তা প্রদানের মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। 

এর মানে হলো, দেশে যখন কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়, তখন শ্রমিকদের তাদের যৎসামান্য সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প থাকে না। শ্রমিকদের উপার্জনের পরিমাণ এতটা বেশি নয় যে, তারা এক মাসের বাড়ি ভাড়া এবং অন্যান্য বিল পরিশোধের সমপরিমাণ টাকা আলাদা করে রেখে দেওয়ার মতো

যথেষ্ট সামর্থ্য রাখে। যদি তারা তা পারত, তাহলে অধিকাংশ পোশাক শ্রমিকই নিজেদেরকে ভাগ্যবান মনে করত। অতিমারি চলাকালে চাকরি হারিয়ে বা লে-অফের কারণে যখন হাজার হাজার শ্রমিকদের বাড়ি ফিরে যেতে দেখেছি, আর এ কারণেই তখন খুব একটা অবাক হইনি।

পোশাক শ্রমিকদের প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার কি কোনো ব্যবস্থা রয়েছে? বর্তমানে শ্রমিকদের জন্য একটি কল্যাণ তহবিল রয়েছে। যেখানে পোশাক কারখানাগুলো তাদের মোট রপ্তানি করা পণ্যের মূল্যের ওপর ০.০৩% হারে জমা দেয়। যার পরিমাণ বছরে প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার। রপ্তানির পরিমান বাড়লে এর পরিমানও বাড়ে। দুর্ঘটনায় আহত ও মৃত্যুজনিত কারণে এ তহবিল থেকে শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যরা সহায়তা পেয়ে থাকেন।

অতিমারির কারণে অর্ডার আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এবং লকডাউনের ফলে কারখানাগুলো দীর্ঘসময় বন্ধ হওয়াতে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন এক অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে পতিত হয়। শ্রমিকরা যে সমস্যাগুলোর মধ্যে দিয়ে গেছে তা আমরা বিগত ১৮ মাসে দেখেছি। 

একটি বিষয় পরিষ্কার যে, বড় কোনো অর্থনৈতিক সঙ্কটে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দিতে এই তহবিল যথেষ্ট নয়। প্রথম কথা হলো, এই তহবিলে যে ১০ মিলিয়ন ডলার রয়েছে তা শ্রমিকদের সংখ্যার তুলনায় খুবই নগণ্য। কারণ আমাদের শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। সঙ্কটের সময় যখন সব শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তখন এই তহবিলের যে পরিমাণ তাতে প্রত্যেক শ্রমিক মাথাপিছু মাত্র ২.৫ ডলার করে সাহায্য পাবে। অধিকন্তু বর্তমান শ্রমিক কল্যাণ তহবিল থেকে কেবল আঘাত বা মৃত্যুজনিত কারণে শ্রমিক বা তাদের পরিবার আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকেন। 

কিন্তু বড় ধরনের সংকট, লকডাউন, বেকারত্ব, ছাটাইজনিত কারণে শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার উপক্রম হলে শ্রমিকদের সুরক্ষায় প্রয়োজন নিরাপত্তা বেষ্টনী। উদ্যোক্তা, ক্রেতা এবং শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সরকার

শ্রমিকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীর ব্যবস্থা করতে পারে। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে মোট রপ্তানি মূল্যের ০.৫% হারে শ্রমিকদের জন্য তৈরি

সুরক্ষা তহবিলে জমা করা যেতে পারে। এর ফলে তহবিলের আকার মিলিয়ন ডলারের পরিবর্তে বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে। যার মাধ্যমে শ্রমিকদের অর্থনৈতিক বিপর্যয়জনিত আপৎকালীন সহায়তা ও সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।

এই তহবিলের অর্থ কেবলমাত্র শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট করা রাখা হবে। আমি বিশ্বাস করি, এমন উদ্যোগের সঙ্গে ক্রেতারাও পাশে থাকবেন যদি সেই তহবিল স্বচ্ছতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে পরিচালিত হয়। পোশাক কেনার দিক থেকে অন্যান্য দেশের চেয়ে ক্রেতারা বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি বড় কারণ হবে শ্রমিকদের সুরক্ষার নিমিত্তে গঠিত এরকম একটি তহবিল, যদি তা

আমরা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করতে পারি। এর মাধ্যমে ক্রেতারাও স্বস্তি পাবেন যে তারা শ্রমিকদের সহায়তায় সত্যিকার অর্থে একটি ভালো কিছু করতে পারছেন।

এছাড়া আর কোনো বিকল্প রয়েছে কি? অতীতে আমরা দেখেছি পোশাক শ্রমিকদের সহায়তায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এরকম একটি উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু গঠিত হওয়ার পর থেকে বিগত ১২ মাসে এ উদ্যোগ তেমন একটা লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। আইএলও কনভেনশনের আলোকে ক্রেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি “সিভিয়ারেন্স গ্যারান্টি ফান্ড” তৈরির ব্যাপারে এনজিওদের কাছ থেকে একটি প্রস্তাবও এসেছে। 

আমাদের বলা হয়েছে, কোনো কারখানা যদি দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার জন্য বা অন্য কোনো কারণে শ্রমিক ছাটাই করে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের এই তহবিল থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এই তহবিল গঠনে উদ্দেশ্য। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক দুর্যোগ বা সঙ্কটের কারণে শ্রমিকরা বেকার হলে সে সঙ্কট থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে এই তহবিল ভূমিকা পালন করবে। এ তহবিল থেকে বেকারকালীন অথবা ছাঁটাইয়ের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের সহায়তা দেওয়া হবে, যা শ্রমিকদের জন্য সরকারের সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী কর্মসূচিকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য আমার প্রস্তাবনা ও এই ধরনের তহবিলের ধারণা ছাড়া এরকম আরো প্রস্তাবনা থাকতে পারে। তবে উভয়ক্ষেত্রেই কোনো অবস্থাতেই শ্রমিকরা অসহায় অবস্থায় পতিত না হয় এবং তারা তাদের বেতন ও আনুষাঙ্গিক পাওনাদি পায় তা নিশ্চিতে উৎপাদনকারী এবং ব্র্যান্ডগুলোর মাঝে একটি অবশ্য পালনীয় চুক্তি থাকতে হবে।

সঙ্কট বা দুর্যোগের সময় শ্রমিকদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়ে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ ও কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা করতে হবে। শ্রমিকদের সুরক্ষায় শিল্পের একটি দায়িত্ব রয়েছে। 

জাতিসংঘের গাইডিং

প্রিন্সিপালস অব বিজনেস এ্যন্ড হিউম্যান এবং ওইসিডি’র

গাইডলাইনস ফর রেসপনসিবল সাপ্লাই চেইনু ইন দ্যা গার্মেন্ট সেক্টর অনুযায়ী, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় ক্রেতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এসব কিছুর উদ্দেশ্য হলো এ শিল্পে নিয়োজিত সকল শ্রমিকরা যেন সুরক্ষিত থাকে।



মোস্তাফিজ উদ্দিন 

ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক,

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail