• রবিবার, ডিসেম্বর ০৫, ২০২১
  • সর্বশেষ আপডেট : ১০:২৩ সকাল

মানসিক আত্মনির্ভরশীলতা মনের সুস্থতার মূলমন্ত্র

  • প্রকাশিত ১২:৩৪ দুপুর অক্টোবর ১৬, ২০২১
সুস্বাস্থ্য-মানসিক চাপ
পিক্সাবে

অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। আপনি নিজেকে তখনই আত্মনির্ভরশীল হিসেবে দাবি করতে পারবেন, যখন আপনি মানসিকভাবে নিজের ওপর নির্ভরশীল

পৃথিবীতে প্রত্যেকটি মানুষ ভালোভাবে বেঁচে থাকতে চায়। সুখী জীবনযাপন প্রত্যেকটি মানুষের স্বপ্ন। তবে শুধু শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকাকেই কি বেঁচে থাকা বলা যায়? সুখময় জীবন নিয়ে বাঁচতে হলে প্রাত্যাহিক জীবনে একটি বিশেষ উপাদান প্রয়োজন। আর সেই বিশেষ উপাদান হচ্ছে একজন মানুষের মানসিক শান্তি বা মনের শান্তি। 

মানসিক শান্তি বলতে আপাতদৃষ্টিতে মানসিক স্থিতিশীলতাকেই বোঝায়। কিন্ত দুঃখজনক বিষয় এটাই যে, বেঁচে থাকার প্রয়োজনে প্রাত্যাহিক জীবনে নানাবিধ ভালো বা মন্দ ঘটনা, নানা বিষয়বস্তুর উপস্থিতিতে আমাদের মনের সেই স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই দেখা দেয় মনের অস্থিতিশীলতার চাপ, সেই অস্থিতিশীলতায় আমরা প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত হতে থাকি। ঠিক তখন থেকেই আমাদের জীবনে উঁকি দিতে থাকে যাবতীয় মানসিক অশান্তি।

বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করছি, সেখানে চারপাশে যেন স্বার্থপর মানুষেরই রাজত্ব। এমন নয় যে স্বার্থপরতা মানুষের মধ্যে আগে ছিল না। আগেও ছিল, তবে দিন দিন তা আরও বাড়ছে। এর মাঝেই কিছু মানুষের জন্যই আমরা বেঁচে থাকি, কিছু মানুষ আছে বলেই বেঁচে থাকাটা স্বার্থক মনে হয়, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই। আর এই বেঁচে থাকার জন্যই সবার আগে আমাদের সবাইকেই যার যার নিজস্ব জগতকে চিনতে হবে। নিজে ভালো না থাকলে কখনো অপরকে ভালো রাখা যায় না, ভালোবাসা যায় না। আর তাই প্রত্যেকটি মানুষের জন্যই নিজে ভালো থাকা, নিজেকে ভালোবাসা, নিজেকে সময় দেওয়া, নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া, নিজেকে বুঝতে শেখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

যদি আপনার সারাদিনের মেজাজ নির্ভর করে বিপরীত লিঙ্গের মোবাইল থেকে পাঠানো একটি “শুভ সকাল” লেখা ক্ষুদে বার্তার ওপর, রাতের ঘুম নির্ভর করে তার সঙ্গে ফোনে কথা বলার ওপর! বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নির্ভর করে একটি সাময়িক সম্পর্কের স্থায়িত্বের ওপর! ভালো থাকবেন নাকি ড্রাগস নিয়ে নষ্ট হয়ে যাবেন তা নির্ভর করে স্বল্প পরিচিত একজনের অবহেলার ওপর! তবে এ কেমন আত্মনির্ভরশীলতা? নিজেকে ভালোবাসতে শিখতে হবে। যে নিজেকে ভালোবাসতে পারে না, সে অন্যকে কীভাবে ভালোবাসবে? যে নিজের জীবনের মূল্য দিতে জানে না সে অন্যের মূল্যায়ন কীভাবে করবে?

অর্থনৈতিকভাবে আত্মনির্ভরশীল হওয়াটাই যথেষ্ট নয়। আপনি নিজেকে তখনই আত্মনির্ভরশীল হিসেবে দাবি করতে পারবেন, যখন আপনি মানসিকভাবে নিজের ওপর নির্ভরশীল। আপনার ভালোলাগা, খারাপ লাগা, ইচ্ছে, কৌতুহল শেয়ার করার জন্য বাধ্যতামূলক কাউকে লাগবে না। 

জীবনে চলার পথে যেকোন‌ো পরিস্থিতি মেনে নেওয়া এবং নিজেকে সেই পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেবার ক্ষমতা যার যত বেশি, সে তত বেশি সুখী। মানসিকভাবে কারো ওপর নির্ভর করা পৃথিবীর সবথেকে বড় অসহায়ত্ব-দাসত্ব। এই দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে আপনার নিজেকে অবশ্যই মুক্ত হতে হবে। যা আপনাকে ডি-মোটিভেট করবে জীবনের এগিয়ে যাওয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে। এমন একটা অবস্থা তৈরি করবে যে, কেন আপনি জীবনে অনেকদূর যেতে চান সেই কারণ পর্যন্ত খুঁজে পাবেন না। আমাদের ভালোলাগা-খারাপ লাগার অনুভূতিগুলো একান্তই আমাদের। কিন্তু সমস্যাটা হয় যখন আমাদের এই অনুভূতিগুলো অন্য কারও ওপর নির্ভর করে।

মানুষ নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। নিজের সাথে নিজের বোঝাপড়া যার যত বেশি, নিজের আবেগের ওপর যার নিয়ন্ত্রণ যত যুক্তিসম্পন্ন, ব্যক্তিজীবনে সে তত বেশি সুখী, পেশাগত জীবনেও সে ততটা সফল। কিছু মানুষ নিজের জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে যতটা না সময় ব্যয় করে, তার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে অন্যের জীবন নিয়ে বাজে সমালোচনা করার পেছনে! তাই জীবনের একটা পর্যায়ে এসব অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষকে জীবন থেকে সরিয়ে দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়। 

কিন্তু এই ব্যাপারটি বলা যতটাই সহজ, এটি করা তার চেয়েও কঠিন, কিছু ক্ষেত্রে তা হয়ত অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এটা করার জন্য প্রয়োজন মনের প্রবল ইচ্ছাশক্তি। আর সেই মানসিক শক্তি আসে পরিপূর্ণভাবে নিজের সাথে বোঝাপড়ার মাধ্যমে। 

আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনে নিজের স্বেচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের আগমন ঘটে। এদের মধ্যে হাতেগোনা কিছু মানুষ আমাদের জীবনের জন্য কিছুটা আশীর্বাদস্বরূপ হলেও বেশিরভাগ মানুষের আগমন জীবনকে পদে পদে ঝামেলা তৈরি করার জন্য! আপনি যদি মানসিক শান্তি আশা করেন তাহলে আপনাকে অবশ্যই এ ধরনের মানুষকে এড়িয়ে চলতে হবে। কেননা এদের জন্য আপনি হতাশায় ভুগতে পারেন এবং আপনার অনেক সাফল্যও হাতছাড়া হতে পারে। কারণ সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে দিন শেষে নিজের মানসিক শান্তি হবে না। তাই যারা আমাদের জীবনে সমস্যার কারণ, তাদের এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। 

পৃথিবীতে কেউ একা একেবারে নিজের মতো থাকতে পছন্দ করেন, সবকিছু তার পছন্দ অনুযায়ী হতে হবে। আবার কেউ অনেক বন্ধুবান্ধব নিয়ে থাকলে ভাবেন তিনি সুখে আছেন। আসলে মানসিক শান্তির ব্যাখ্যাটা একেকজনের কাছে একেক রকম। আমরা নিজেকে কতটুকু শান্তি দিতে চাই, এটা আদতে আমাদের নিজেদের ওপর নির্ভর করে। আমাদের জীবনে এমন অনেক কিছুই আছে, যা আমাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। তাই যা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তা নিয়ে কখনও আফসোস করা উচিৎ নয়। আমাদের সেসব বিষয় এড়িয়ে চলা উচিৎ, যা নিজেদের জীবনে আমরা গ্রহণ করব না। যেমন কাউকে নিয়ে সমালোচনা করা।

মানুষ কারও ব্যাপারে বাজে সমালোচনা কেন করে? যখন মানুষ তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুবই ইনসিকিউরড হয়, বাইরে তারা যতটাই কনফিডেন্ট ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করুক না কেন, ভেতরে ভেতরে ব্যক্তিত্বহীনতায় ভোগে। তখন তারা সাধারণত অন্যকে খাটো করে উপস্থাপন করার মানসিকতা মনে পোষণ করে চলে। এতে তারা নিজেদের অবস্থানটা লুকিয়ে চলতে পারে বলে তাদের ধারণা। উদাহরণস্বরূপ ছোটবেলায় যখন আমাদের পরীক্ষায় নাম্বার কম আসত, তখন আমরা সাধারণত বাসায় বলার চেষ্টা করতাম অমুক কম পেয়েছে তমুক কম পেয়েছে। এগুলো বলে আমরা আমাদের ব্যর্থতাটা কিছুটা হালকা করতে পারতাম বলে আমরা ভাবতাম। কিন্তু আদতে আসলে আমাদের অবস্থানটা যে কোথায় আমরা ঠিকই জানতাম। ঠিক তেমনই আমাদের আশপাশে যারা আমাদেরকে বাজে সমালোচনা করে কুৎসা রটিয়ে বেড়ায়, তাদের মানসিকতা ঠিক ওরকম হয়। পেছনে তারা যত কথাই বলুক না কেন, অন্ততপক্ষে তারা নিজেরা জানে তাদের নিজেদের আসল অবস্থানটা কোথায়।

যে মানুষটি আপনার সামনে অন্য কাউকে নিয়ে গীবত বা সমালোচনা করে, মনে রাখবেন সে আপনার ব্যাপারেও অন্যের কাছে একই কাজ করতে পারে। এজন্য এসব মানুষকে এড়িয়ে চলাই কাম্য। আবার কিছু মানুষ আছে যারা সব সময় নিজের মধ্যে নেগেটিভ বিষয় ধারণ করে চলে। এই জাতীয় লোকেরা কখনো আপনাকে লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারবে না; বরং আপনাকে সব সময় হতাশায় ফেলে দেবে। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে, যারা শুধু নিজের সমস্যার কথা বলতে ব্যস্ত। আপনারটা শোনার সময় বা আগ্রহ তাদের নেই। এদের থেকে চেষ্টা করতে হবে দূরে থাকতে। এরা আত্মকেন্দ্রিক মানুষ, এ ধরনের মানুষ কখনোই ভালো শ্রোতা হয় না। এরা কখনই আপনার কথা শুনবে না মন দিয়ে। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে সব সময়। দিন শেষে কোনো বিপদেও আপনি এদেরকে পাশে পাবেন না। তাই সুবিধাবাদী এই শ্রেণি থেকে নিজেকে সামলে চলতে হবে। এরা এমনভাবে আপনার সঙ্গে মিশবে যে আপনাকে তাদের আসল রূপ বুঝতে অনেক বেগ পেতে হবে। 

পরিশেষে আপনার জীবনটা শুধু আপনার নয়। আমরা প্রত্যেকেই পৃথিবীতে এসেছি পৃথিবীতে কিছু না কিছু দায়িত্ব পালন করার জন্য। পারিবারিক হোক বা সামাজিক প্রেক্ষাপট, আপনার অবশ্যই কিছু দায়িত্ব আছে। এখন আপনি যদি দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চান তবে আপনি যেতে পারেন। অবশ্যই সেক্ষেত্রে আপনাকে মানতে হবে যে, আপনি দায়িত্ব পালন থেকে পিছিয়ে গেছেন। আর দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়ে আপনি কখনই মানসিকভাবে ভালো বোধ করতে পারবেন না। আত্মকেন্দ্রিকতা মানসিকভাবে মানুষকে অবসাদগ্রস্ত করে দেয়। তাই সবার ভালো-মন্দ বিচার বিবেচনা করতে করতে যদি নিজেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে সমাজচ্যুত অথবা পরিবারচ্যুত হয়ে পড়েন তবে তা মানসিকভাবে আপনাকে কখনই স্বস্তি দেবে না।


ব্যারিস্টার জাহিদ রহমান, আইনজীবী। পেশাগত কারণে মানুষের সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ নিয়ে কাজ করতে হয় তাকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন তিনি।


প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রকাশিত লেখার জন্য ঢাকা ট্রিবিউন কোনো ধরনের দায় নেবে না।

50
Facebook 50
blogger sharing button blogger
buffer sharing button buffer
diaspora sharing button diaspora
digg sharing button digg
douban sharing button douban
email sharing button email
evernote sharing button evernote
flipboard sharing button flipboard
pocket sharing button getpocket
github sharing button github
gmail sharing button gmail
googlebookmarks sharing button googlebookmarks
hackernews sharing button hackernews
instapaper sharing button instapaper
line sharing button line
linkedin sharing button linkedin
livejournal sharing button livejournal
mailru sharing button mailru
medium sharing button medium
meneame sharing button meneame
messenger sharing button messenger
odnoklassniki sharing button odnoklassniki
pinterest sharing button pinterest
print sharing button print
qzone sharing button qzone
reddit sharing button reddit
refind sharing button refind
renren sharing button renren
skype sharing button skype
snapchat sharing button snapchat
surfingbird sharing button surfingbird
telegram sharing button telegram
tumblr sharing button tumblr
twitter sharing button twitter
vk sharing button vk
wechat sharing button wechat
weibo sharing button weibo
whatsapp sharing button whatsapp
wordpress sharing button wordpress
xing sharing button xing
yahoomail sharing button yahoomail